নার্গিস ছিলেন তাঁর যুগেরই উপমা। নম্রতা ও বিদ্রোহের একেবারে যথাযথ সংমিশ্রণ ঘটেছিল তাঁর প্রতিভায়।

নার্গিস দত্ত। গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 3 June 2025 12:06
দেবিকা রানি যে কাজ শুরু করেছিলেন, তা সম্পূর্ণ করেছিলেন নার্গিস। চলচ্চিত্রে এক নতুন সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছিলেন নার্গিস দত্ত। ইন্ডাস্ট্রির সামন্ততন্ত্রের অন্দরমহল থেকে মুক্তির ময়দানে এসে দাঁড়িয়েছিলেন ছায়াছবির নায়িকা। নম্রতা ও বিদ্রোহের একেবারে যথাযথ সংমিশ্রণ ঘটেছিল তাঁর প্রতিভায়। নার্গিস ছিলেন তাঁর যুগেরই উপমা। মধুবালা, মীনাকুমারী, ওয়াহিদা রেহমান, কামিনী কৌশল, নূতনরা থাকলেও পাঁচের দশকের শ্রেষ্ঠ সম্রাজ্ঞীর মুকুট নার্গিসের মাথাতেই উঠবে। সেইসময়ের বম্বে পাড়ার রূপ সম্রাজ্ঞী ছিলেন মধুবালা। এমনকি রাজ কাপুরের খাসমহলে নার্গিসকে সরিয়ে জায়গা নিলেন বৈজয়ন্তীমালা, যাঁর মতো লোভনীয় দেহতরঙ্গের অধিকারী নার্গিস ছিলেন না। প্রথাবর্হিভূত রূপ তাঁর ছিল সন্দেহ নেই, কিন্তু নার্গিস প্রমাণ করলেন তারকা তৈরি হয় দেহসৌষ্ঠবের অতিরিক্ত কিছু মাত্রা যোগেই।
তবে আজকের গল্প প্রথম জীবনের নার্গিসকে নিয়ে। তখন তিনি এক উঠতি অভিনেত্রী। কিন্তু নার্গিসের রূপের পূর্ণিমার আলো ছড়িয়ে পড়েছিল সব মহলে।

নার্গিসের বয়স তখন উনিশ। বোম্বাইয়ের রাজ্যপাল প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর বোম্বাই সফর উপলক্ষে রাজভবনের লনে গার্ডেন পার্টির আয়োজন করেছেন। কাউন্সিলর আখতার হোসেন ও তাঁর পত্নীর নামে পাঠানো নিমন্ত্রণ পত্রটি ভুল করে চলে এসেছে নার্গিসের দাদা আখতার হোসেনের ঠিকানায়। যাকে বলে নাম বিভ্রাট। সেই চিঠি পেয়ে নার্গিস তো দারুণ উত্তেজিত। পীড়াপিড়ি করে দাদাকে রাজি করালেন সেখানে যেতে, নিজেও জুটে গেলেন দাদার সঙ্গে। কিন্তু সেখানেই আসল গল্প।
নিমন্ত্রণ পত্রে তো লেখা ছিল কাউন্সিলর আখতার হোসেন ও তাঁর পত্নীর নাম। এদিকে নার্গিসের দাদার নাম মিললেও নার্গিসের নাম তো মিলছে না। দুষ্টু বুদ্ধি বার করলেন তিনি। ছদ্মবেশের আশ্রয় নিলেন নার্গিস। দাদার সঙ্গে যেতে মিসেস হোসেন সেজে নার্গিস চলে গেলেন পার্টিতে। তখন তাঁর পরিচয় মিসেস হোসেন।

কাউন্সিলর পরিচিত কিন্তু তাঁর বউ তো জনপ্রিয় মুখ নন। শুধু মিসেস হোসেন নামটি ধার নিলেই নার্গিসের কার্যসিদ্ধি হয়ে যাবে। তিনি তাই করলেন।
সাধ মিটেছিল নার্গিসের। পার্টিতে নেহরুর সাক্ষাৎ নার্গিস পেয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, নেহরুর সুবিখ্যাত চঞ্চল চোখ ঠিক খুঁজে বার করেছিল আকর্ষণীয়া মেয়েটিকে। এমনকি পরদিন রাজভবনে তিনি নার্গিসকে লাঞ্চে নিমন্ত্রণও করেন। এক উঠতি অভিনেত্রী চিরকালের মতো চোখে পড়ে গেলেন নেহরুর। তবে স্নেহের চোখেই নার্গিসকে দেখতেন নেহরু। প্রোটোকল বিশেষজ্ঞদের চোখ তো কপালে। তখন নার্গিস চেনা মুখ অভিনেত্রী। প্রোটোকল বিশেষজ্ঞরা বুঝতেই পারলেন না সিনেমার অভিনেত্রী এই অনুষ্ঠানে জুটলেন কী ভাবে? নায়িকাকে কেউ তো নিমন্ত্রণ করেনি।
তদন্তের হুকুম দিলেন তাঁরা। তারপরেই তাঁরা বুঝতে পারলেন ভুল ঠিকানায় নিমন্ত্রণ পত্র পাঠানো হয়েছিল। এ ভুল তো তাঁদেরই। তাই তড়িঘড়ি হুকুম তুলেও নিলেন তাঁরা।

নেহরু কিন্তু ভোলেননি নার্গিসকে। তারপর থেকে বোম্বাইয়ে এলে নার্গিসের সঙ্গে লাঞ্চ খাওয়া রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল তাঁর। নেহরুর অটোগ্রাফ নিজের কাছে সযতনে রেখে দিয়েছিলেন নার্গিস। আজীবন দু'জনের সুসম্পর্ক বজায় ছিল।