ঋতুপর্ণর মৃত্যুদিন এলেই তাঁকে আহা উহুঃ বলে সবাই কাঁদতে বসেন আজকাল। অথচ ঋতুপর্ণ ঘোষের জীবদ্দশায় ঋতুপর্ণ নামটা সমাজের কাছে বিদ্রুপ, টিটকিরি আর গালাগালি হয়েই থেকে গিয়েছিল।

সমলিঙ্গের ভালবাসা। গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 30 May 2025 20:43
'তোমার ঠোঁট আমার ঠোঁট ছুঁলো
যদিও এ প্রথমবার নয়,
চুম্বন তো আগেও বহুবার
এবার ঠোঁটে মিলেছে আশ্রয়... '
'সমপ্রেম' আজও সমাজের চোখে অপরাধমূলক কাজ। আজও আমজনতার চোখে, বিপরীত লিঙ্গে বিয়ে করলেই মানুষ ভাল থাকবে কিন্তু সমলিঙ্গে বিয়ে ভাল থাকার কোনও চাবিকাঠি হতে পারে না, । সমাজ বুঝিয়ে দেয়, সমলিঙ্গে ভালবাসা মানেই তোমার চাহিদা ভুল। আবার কোনও মানুষের একা থাকাও সমাজের চোখে অসীম কৌতুহলের কারণ। বুড়ো বয়সে কে দেখবে সেটার সমাধান বিয়ে নয়, যা আমাদের সিস্টেমের সমস্যা। বহু মানুষ হয়তো বিয়ে করতেই পারতেন! কিন্তু আমাদের দেশ কী সমপ্রেমের বিয়ের উপযোগী সমাজ, পরিস্থিতি, আইন দিচ্ছে? কিন্তু একজন এই সমালোচনা, ছিছিক্কার, কটুক্তির বিরুদ্ধে প্রথম পথ হেঁটেছিলেন এই কলকাতা শহরে, তিনি ঋতুপর্ণ ঘোষ।

ঋতুপর্ণর মৃত্যুদিন এলেই তাঁকে আহা উহুঃ বলে সবাই কাঁদতে বসেন আজকাল। অথচ ঋতুপর্ণ ঘোষের জীবদ্দশায় ঋতুপর্ণ নামটা সমাজের কাছে বিদ্রুপ, টিটকিরি আর গালাগালি হয়েই থেকে গিয়েছিল। একজন ছেলেকে নারীসুলভ বা পুরুষসুলভ বলে কী দাগিয়ে দেওয়া যায়? যারা মান নির্ধারণ করছেন তারা কী সব দিক থেকে নিখুঁত? কে কতটা ভাল মানুষ সেটাই তো বিচার্য বিষয় হওয়া উচিত। আবার তাঁদের অঙ্গভঙ্গি ভেঙালেই তাঁদের গুণগুলো পাওয়া যায় না।
সমলিঙ্গের ভালবাসার ভাল দিক থেকে, মন্দ দিক দুইই দেখিয়েছিলেন ঋতুপর্ণ। ভালবেসে বুকে মাথা রাখা আবার, ভালবেসে ঠকে যাওয়া। ২০১০ সালে কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের পরিচালনায় ঋতুপর্ণ ঘোষ প্রথম অভিনয় করেন 'আরেকটি প্রেমের গল্প' সিনেমায়। পুরুষ নয়, নারী সেজে এক রূপান্তরকামী সাংবাদিক অভিরূপের চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি।

ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত এই ছবিতে এক উভকামী পুরুষের চরিত্রে সাহসী অভিনয় করেছিলেন। আর সেটা স্বয়ং ঋতুপর্ণ ঘোষের বিপরীতে। কৌশিক শুধু নয়, এমন পার্টনারের চরিত্রে ইন্দ্রণীলকে গড়ে নিয়েছিলেন ঋতুপর্ণ। ইন্দ্রনীলের চরিত্রের নাম ছিল বাসু। যে বিবাহিত কিন্তু অভিরূপের শয্যাসঙ্গী, সংসারসঙ্গী। এমন সম্পর্কে ভাল লাগার সঙ্গে, কতখানি কষ্ট থাকে তা পর্দায় তুলে ধরেন কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়।
ইন্দ্রনীল কিন্তু ঋতুপর্ণকে ঋতু বলেই তখন ডাকতেন। ঋতুদা নয়। আজও হয়তো তাই।
ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন 'সেই সময় আমি মুম্বইতে কাজ করছিলাম বলে রোজ কলকাতায় আসতে পারতাম না। ফোনেই দেড় দু ঘন্টা চলত আমার সঙ্গে ঋতুর ওয়ার্কশপ। বলতে দ্বিধা নেই মুম্বইতে মডেলিং করতে গিয়ে আমি হোমোফোবিক ছিলাম। কিন্তু ঋতুই আমায় প্রথম হোমোএমপ্যাথেটিক বানিয়েছিল। থার্ড জেন্ডার মানুষের মনের গভীরতা বুঝিয়েছিল। ঋতুর সঙ্গে কথা বলতে বলতে আমি 'বাসু' চরিত্রটা আত্মস্থ করেছিলাম। এমন একজন মানুষ চলে গেল, যে কোন বিষয়ে জাজমেন্টাল ছিল না। আমি খেতে ভালবাসি বলে ওঁর বাড়ি গেলেই মাংস, পোলাও, ইলিশ মাছ রাঁধিয়ে রাখত। আমি খেতে ভালবাসি বলে 'হ্যাংলা'ও বলত।'

ঋতুপর্ণর সঙ্গে ইন্দ্রনীলের রিয়েল জীবনের নির্ভৃত আলাপচারিতা যেন ফুটে উঠেছিল পর্দায়। সমাজের টিটকিরি, বিদ্রুপের ভয় এই দুই অভিনেতা করেননি। ইন্দ্রনীল আরও জানাচ্ছেন
'এই ছবির দুই তিন জায়গায় আমার আর ঋতুর ওষ্ঠ চুম্বনের দৃশ্য ছিল। কিন্তু আমি ঋতুকে গোড়াতেই বলে দিয়েছিলাম ঠোঁটে চুমু খেতে পারব না। ছেলে বলে নয়। আমি কোনও নায়িকাকে চুমু খেতেও খুব একটা স্বচ্ছন্দবোধ করি না। ঋতু আমাকে বলেছিল চুমু খাবার দৃশ্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ,কিন্তু কখনও জোর করেনি।
আমরা দু তিনটে ঘনিষ্ঠ দৃশ্য শ্যুট করেছিলাম কিন্তু ঋতু বলেছিল আমার লজ্জা লাগছে। আমি ঋতুকে বলেছিলাম, তোমায় কিছু করতে হবে না। শুধু শুয়ে থাকবে। যা করার আমি করে দেব। খ্যাকখ্যাক করে হেসেছিল ঋতু'।

২০১০ থেকে ২০২৫। ১৫ বছর কেটে গেছে। এখন দু'জন সমপ্রেমী খোলা রাস্তায় রামধনু মিছিলে চুমু খান। কিন্তু গেরস্থ জীবনে সমলিঙ্গে সংসার বা চুম্বন আজও অপরাধ। তবু আজও যেটুকু বাঙালি সমাজ এগিয়েছে তা ঋতুপর্ণ ঘোষের জন্য। ঋতুপর্ণ মরে প্রমাণ করলেন, তিনি কত নিরুচ্চার ভালবাসার প্রতিবাদ ছিলেন। ঋতু বদলায়, তবু ঋতুপর্ণ আসে না।