
'মানিকবাবুর মেঘ' ছবির দৃশ্যে চন্দন সেন।
শেষ আপডেট: 4 July 2024 16:00
দ্য ওয়াল ব্যুরো: 'মেঘ দেখসেন'?
'কী দেখছেন?'
'মেঘ... মেঘ...।'
'একটা মেঘ নাকি ওকে চব্বিশ ঘন্টা ফলো করসে...'।
সাদা-কালো মন্তাজ। ছাতা মাথায় একটি লোক। কাঠফাটা রোদ। সাদা-কালোর সীমিত বুনোটেও রোদের আতাসটা বোঝা যায়। রেললাইন, গলি রাস্তা, বড় রাস্তার মোড়, আবর্জনা ফেলা মাঠ, সর্বত্র লোকটি ছুটে বেড়ায়। ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে থাকে আকাশের দিকে। খোঁজার চেষ্টা করে কিছু। পায় কি? ঠাহর হয় না। এক টুকরো মেঘ দেখে বোঝার চেষ্টা করতে থাকে...।
পরিচালক অভিনন্দন বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম ছবি। নাম, 'মানিকবাবুর মেঘ'। মানিকবাবু এই ছবিতে একা। কোনও একাকীত্বের প্রতীকমানতার বাহক নন। স্রেফ একা। মনে পড়তে পারে নিকোলাই গোগোলের সেই অবিস্মরণীয় গল্প। 'দ্য ওভারকোট'। আকাকি আকাকিয়েভিচ। কিন্তু মানিকবাবুর সঙ্গে মেঘের কী সম্পর্ক? কেন একটা মেঘ মানিকবাবুকে 'ফলো' করে চব্বিশ ঘন্টা?
উত্তরগুলো পেতে গেলে ছবিটা দেখতে হবে। 'মানিকবাবুর মেঘ'। তৈরি হয়েছিল ২০২১ সালে। গল্প আরও আগে লেখা। অভিনন্দন বললেন, ২০১৬ সালের গল্প। গ্রীষ্মের দুপুরে অফিস থেকে ফিরতে গিয়ে অভিনন্দন খেয়াল করেছিলেন, কোনও এক মুহূর্তে তাঁর সঙ্গী কেবল একটি মেঘ। দুনিয়ার নানা অসহ বাস্তবের সামনে এক গ্রীষ্মের দুপুরে কেবল একটি মেঘকে দেখে গল্পটা দানা বেঁধেছিল মনে। যদিও, অভিনন্দনের বক্তব্য, তিনি আদতে গল্পই বলতে চাননি। বেরিয়ে আসতে চেয়েছেন গল্প বলার দায় থেকে। চেয়েছেন, ফিল্মই হয়ে উঠবে গল্প। তার নিজের ভাষায়। তার নিজের চরিত্রে। যে চরিত্রে নিজেকে নিংড়ে দিয়েছেন মঞ্চের বিশিষ্ট অভিনেতা চন্দন সেন। সংলাপ কম। 'লার্জার দ্যান লাইফ' উপাদান নেই। স্রেফ একটি মানুষ, তার প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা। সাদা-কালো ফ্রেমে প্রকৃতির আদি রূপের কাছে নিরীহ আত্মসমর্পণ।
এ' ছবির নিবেদক অনির্বাণ ভট্টাচার্য। শুরুতে অবশ্য জানতেন না। ২০২২ সালে কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানো হয়েছিল এই ছবি। এশিয়া বিভাগে পুরস্কার পায়। তারপর সারা পৃথিবীর আটত্রিশটি ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে দেখানো হয়েছে এই ছবি। চোদ্দটি পুরস্কার জিতেছে। তালিনের ব্ল্যাক নাইটস চলচ্চিত্র উৎসবে যখন ছবিটি দেখানো হচ্ছে, নিবেদক অনির্বাণ তখন 'মিসেস চ্যাটার্জি ভার্সেস নরওয়ে' ছবির কাজে সেখানেই ছিলেন। জানতে পারেন ছবির কথা। জানতে পারেন, ছবির প্রযোজনা করেছেন বৌদ্ধায়ন মুখোপাধ্যায়। পরে, মস্কোয় ছবিটির জন্য পুরস্কার পান চন্দনবাবু। অনির্বাণ ছবিটি দেখতে চান। বৌদ্ধায়ন পাঠিয়ে দেন ছবিটি। দেখে চমৎকৃত হয়ে যান অভিনেতা। নিজেই যোগাযোগ করেন পরিচালক অভিনন্দনের সঙ্গে।
এ' ছবির চুম্বক, এর গল্প বা গল্প না থাকা। জীবনের সহজ কিছু দৃশ্যকে তুলে এনেছেন অভিনন্দন। বৌদ্ধায়ন মুখোপাধ্যায়ের ছবি 'তিনকাহন'-এর স্ক্রিপ্ট লেখা দিয়ে তাঁর হাতেখড়ি হয়েছিল। পরে প্রায় দুই বছর ধরে 'মানিকবাবুর মেঘ' ছবির স্ক্রিপ্ট লিখেছেন। আগাগোড়া পাশে ছিলেন বৌদ্ধায়ন ও মোনালিসা মুখোপাধ্যায়। পড়াশোনা করেছেন মেঘ ও মানুষের গল্প নিয়ে। কালিদাস থেকে রবার্ট ফ্রস্ট, রবীন্দ্রনাথ থেকে জন কিটস, সর্বত্র খতিয়ে দেখেছেন। চন্দনের দৃশ্যায়নের সঙ্গে সঙ্গত দিতে এনেছেন ক্লাসিকাল যন্ত্রসঙ্গীত। ছবিতে চন্দনের সঙ্গে রয়েছেন ব্রাত্য বসু, দেবেশ রায়চৌধুরী, নিমাই ঘোষ, অরুণ গুহঠাকুরতা।
এত প্রশংসিত হওয়ার পরেও ছবিটিকে দেশ জুড়ে রিলিজ করাতে পারেননি অভিনন্দন। অবশেষে, ১২ জুলাই, কলকাতা, মুম্বই, বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ, নয়ডা ও গুরুগ্রামে ছবিটি মুক্তি পেতে চলেছে। আইনক্স ও পিভিআরে দেখানো হবে ছবিটি। অনির্বাণ যেমন বলেছেন, এই ছবি তাঁর কাছে একটা গাছের ছায়ার মত। যে ছায়ায় বসলে ফিনফিনে হাওয়া দেয়। মনে হয়, একটা সংলাপ তৈরি হল প্রকৃতি ও মানুষের। দর্শকও তেমনটাই অনুভব করতে পারবেন, জানাচ্ছেন নির্মাতারা।