ঢুলুবাবু বলতেন 'আমার ছবি দেখে অশিক্ষিতরাও শিক্ষিত হয়ে সিনেমা হল থেকে বেরোবে।'

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 18 June 2025 19:16
এক সময় বাঙালিদের সারা সপ্তাহের বিনোদন বলতে ছিল রোববারের বাংলা ছবি। 'আহ্বান', 'অগ্নীশ্বর', 'মৌচাক', 'ধন্যি মেয়ে', 'পিতাপুত্র'- এইসব ছবি দেখে মুগ্ধ হয়ে যেত দর্শক। ছবির পরিচালক হলেন অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়। স্টুডিও পাড়ায় যিনি 'ঢুলুদা' নামেই জনপ্রিয় ছিলেন। আজ সেই লেজেন্ডারি পরিচালক অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের জন্মদিন। ১৯১৯ সালের এই দিনেই জন্মেছিলেন তিনি। ঢুলুবাবু বলতেন 'আমার ছবি দেখে অশিক্ষিতরাও শিক্ষিত হয়ে সিনেমা হল থেকে বেরোবে।'
দর্শককে অনাবিল আনন্দ দিতেই ছবি তৈরি করতেন তিনি। পুরস্কারের কথা ভাবতেন না, ভাবতেন না সমালোচনার কথা। এখানেই তাঁর বিশেষত্ব। সত্যচরণ মুখোপাধ্যায়ের কনিষ্ঠ পুত্র অরবিন্দ। ছয় ছেলের বড় হলেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক বনফুল ,বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়। বিহারের কাটিহার জেলার মণিহারি গ্রামে জন্ম। কাটিহারেই ম্যাট্রিকুলেশন পাস করার পরে অরবিন্দবাবু ১৯৩৯ সালে পড়াশোনা করতে আসেন শান্তিনিকেতনে। রবীন্দ্রনাথের স্নেহ ও সাহচর্যও পান তিনি।

এর পরে তিনি চিকিৎসাবিদ্যা পড়তে ভর্তি হন বাঁকুড়া মেডিক্যাল কলেজে। তবে ডাক্তারি পড়া অসমাপ্ত রেখে চতুর্থ বর্ষের শেষে তিনি চলে আসেন কলকাতায়। যোগ দেন সুখ্যাত চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠান ‘নিউ থিয়েটার্স স্টুডিও’য়। অগ্রদূতের বিভূতি লাহার সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন ‘পথে হল দেরী’, ’ত্রিযামা’র মতো ছবিতে। খুব কাছ থেকেই জীবনের শুরুতে পান ছবি বিশ্বাস, ছায়া দেবী, উত্তম, সুচিত্রাদের। শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, পশুপতি চট্টোপাধ্যায়, বিমল রায়দের মতো পরিচালকের সহকারী হিসেবেও কাজ করেছেন। প্রথম ছবি ‘কিছুক্ষণ’ করে চমকে দিয়েছিলেন অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়। অরুন্ধতী দেবী ও অসীম কুমার অভিনীত ছবিটি নির্বাচিত হয় রাষ্ট্রপতি পুরস্কারের জন্য। রেলস্টেশনে কয়েক ঘণ্টার গল্প। কিন্তু 'কিছুক্ষণ' হারিয়ে গেল চর্চা থেকে।
দ্বিতীয় ছবি ‘আহ্বান’-এ অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় তাঁর জাত চিনিয়ে দিয়েছিলেন। বাংলা চলচ্চিত্র জগৎ বুঝে গিয়েছিল, এক অনন্য প্রতিভাবান পরিচালকের আগমন ঘটল। শুধু সফল পরিচালকই নন, অরবিন্দবাবু ছিলেন দক্ষ চিত্রনাট্যকারও।
শক্তি সামন্তের অনুরোধে হিন্দি ছবি ‘অমর প্রেম’-এর চিত্রনাট্যও লিখেছিলেন তিনি। রাজেশ খান্না-শর্মিলা ঠাকুর অভিনীত যে ছবি ছিল আসলে অরবিন্দর উত্তম-সাবিত্রী অভিনীত ‘নিশিপদ্ম’র রিমেক। এই ছবির চিত্রনাট্যের জন্য ‘ফিল্মফেয়ার’ পুরস্কারও পান তিনি। যার ফলে একের পর এক ডাক আসতে থাকে বলিউড থেকে। কিন্তু বাংলা ছবিকে ভালোবেসে, বাংলার দর্শককে ভালোবেসে সেসব অফার ফিরিয়ে দেন তিনি। ছোট দুঃখ, সুখ নিয়ে যেমন ছবি তৈরি করতেন, তেমনই ছোট ছোটর সুখ নিয়ে অল্পতে খুশি থাকার মন্ত্রটি তিনি জানতেন।

একবার দোকানে চাল কিনতে গিয়েছেন ঢুলুবাবু , দু’হাতে পাঁচ কেজি, পাঁচ কেজি দশ কেজির দুটো থলে। দোকান থেকে রিকশায় উঠেছেন, যথাসময়ে বাড়িও পৌঁছলেন। রিকশা থেকে নেমে তিনি রিকশাওয়ালাকে টাকা দিতে যাবেন, রিকশাওয়ালা হঠাৎ বলে উঠলেন, 'আমি আজ আপনার থেকে টাকা নিতে পারব না বাবু। '
অরবিন্দবাবু বুঝে উঠতে পারলেন না কারণ। রিকশাচালক বললেন, 'বাবু, আমি জানি আপনি কে। আপনি অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়। আপনার পরিচালিত ‘অগ্নীশ্বর’ কাল আমি দেখেছি। উত্তম কুমারের বিশাল ভক্ত আমি। কিন্তু ওই মানুষটার এমন রূপ আগে কখনও দেখিনি। আপনার জন্যই তা সম্ভব হল। কাল ‘অগ্নীশ্বর’ দেখতে বসে খুব কেঁদেছি। আজ কিছুতেই আপনার থেকে টাকা নিতে পারব না।'
একথা শুনে অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় ওই রিকশাওয়ালা ভদ্রলোককে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, তিনি তাঁর আসল পুরস্কার পেয়ে গিয়েছেন। একজন রিকশাওয়ালার ভালবাসাও কিন্তু সেদিন তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে ফেলে দেননি তিনি। এটাই হলেন অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়।
'এক্সট্রা'দের জীবন নিয়ে করলেন অন্য ধারার ছবি ‘নকল সোনা’,যাতে আবার উত্তম, হেমন্ত, শ্যামল, সৌমিত্র, অপর্ণারা গেস্ট অ্যাপিয়ারেন্সও দেন। অরবিন্দবাবু তৈরি করেছেন কমেডি ছবি ‘মৌচাক’, 'ধন্যি মেয়ে’। নতুন মুখ মিঠুন চক্রবর্তী ও দেবশ্রী রায়কে নায়ক-নায়িকা করে তৈরি করেছেন ‘নদী থেকে সাগর’। মিঠুনের প্রথম বাংলা ছবি এটি এবং দেবশ্রীরও নায়িকা রূপে ডেবিউ ছবি এটিই। শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়েরও নায়ক রূপে প্রথম ছবি অরবিন্দবাবুর হাত ধরেই, 'শীলা'। বম্বের 'ববি' ছবির গায়ক শৈলেন্দ্র সিংকে নায়ক করে বানালেন বাংলা ছবি 'অজস্র ধন্যবাদ'।

অরবিন্দবাবু নতুনদের সবসময় উৎসাহ দিতেন। এখনকার নায়ক জিৎ তাঁর বাড়িতে গিয়ে প্রণাম করেছিলেন। শেষ দিকে ছবি না করলেও নতুনদের নিয়ে কাজ করার তাঁর আগ্রহ ছিল। ২০১৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি, ৯৬ বছর বয়সে প্রয়াত হন কিংবদন্তি পরিচালক। তবে অরবিন্দবাবুর শিল্পমূল্যর বিচার হয়নি তেমন করে। রিক্সাওয়ালা থেকে বিদেশের কর্পোরেট অফিসার পর্যন্ত যাঁর ছবি আগ্রহ নিয়ে দেখতেন, তাঁর ছবির সম্পূর্ণ লিস্টই নেই উইকিপিডিয়ায়। অথচ অনেক খারাপ মানের পরিচালকদের ছবির লম্বা লিস্ট মেলে সেখানে।