'রিক্তা' ছবিতে ছায়া দেবী আর অহীন চৌধুরীর অভিনয় দেখে এক সংসার ভাঙা দম্পতি আবার একসঙ্গে থাকা শুরু করেছিলেন। পরিচালকের কাছে যা ছিল শ্রেষ্ঠ পুরস্কার।

বাংলা ছবির কনক । গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 3 June 2025 15:20
ছায়া যার নাম, সে অন্যদের যেমন বটবৃক্ষ হয়ে ছায়া দিয়েছিলেন, তেমন নিজেও নিজেকে ছায়া দিয়েছিলেন যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে। এই সারসত্য অত দিন আগেই প্রমাণ করে গিয়েছেন চলচ্চিত্রের আইকনিক মা ছায়া দেবী, আজও যাঁর জীবনকাহিনি অনেক নারীদের কাছে আদর্শ।
ছায়া দেবী। যাঁর আসল নাম কনকবালা গঙ্গোপাধ্যায়। ডাক নাম কনক। বাংলা ছবিতে খাঁটি সোনার মতোই ফসল ফলিয়েছিলেন তিনি। তাঁর মনটাও ছিল নিখাদ সোনা। ১৯১৪ সালের ৩ জুন ভাগলপুরে কনকের জন্ম।

অভিজাত পরিবার। কনকরা দুই ভাই-বোন। কনকবালা গাঙ্গুলি আর ছোট ভাই ললিত মোহন গাঙ্গুলি। শিক্ষিত পরিবার হলেও মাত্র ৯ বছর বয়সে আদরের দুলালীকে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। তখন তিনি বিয়ের মানেই বুঝতেন না। নববধূ কনককে স্বামী স্পষ্ট জানিয়ে দেন তাঁর সংসারে মন নেই। নাবালিকা স্ত্রীকে ফেলে তিনি ওড়িশা চলে যান শিক্ষকতা করতে। স্ত্রী দায়িত্ব কিছুই স্বামী পালন করলেন না, বিয়ে করে মেয়েটিকে ফেলে দিয়ে গেলেন। কনক পালিয়ে চলে এলেন ভাগলপুরে পিসির বাড়ি। কয়েক দিন পর কিশোরী কনক বাবা মায়ের সঙ্গে চলে আসেন কলকাতায় উত্তর কলকাতার ১০ নম্বর মদন ঘোষ লেনের বাড়িতে।। বাবা পড়াশোনা শুরু করালেন মেয়ের। প্রাথমিক লেখাপড়ার সঙ্গে চলত শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিক্ষা। পাশের বাড়ি ১১ নম্বর মদন ঘোষ লেন সঙ্গীতাচার্য কৃষ্ণচন্দ্র দের বাড়ি। সেখানেই শুরু হল কনকের সঙ্গীতশিক্ষা। সঙ্গে সহপাঠী মানা অর্থাৎ কিংবদন্তী মান্না দে। মানা আর ছায়া দু'জনেই প্রাণের বন্ধু হয়ে ওঠেন। নৃত্যগুরু শম্ভু মহারাজের কাছেও উচ্চাঙ্গ নৃত্যের তালিম নিতেন কনক। এই ভাবেই মা সরস্বতীর আর্শীবাদধন্যা কনক আরও খাঁটি সোনা হয়ে উঠলেন চারুবিদ্যায়।

দক্ষতার জোরেই রুপোলি পর্দায় সুযোগ পান কনক। বাড়ি থেকে বাধা দেয়নি কেউ। কনকের নতুন নাম রাখা হল ছায়া দেবী। নতুন নামেই তাঁকে চিনল জগত। বাপের বাড়ি গঙ্গোপাধ্যায় পরিবারের সূত্রে দাদামণি অশোক কুমার, কিশোর কুমাররা ছিলেন ছায়া দেবীর আত্মীয়। খুব কাছের সম্পর্ক। তখন অশোক কুমারও তরুণ অভিনেতা। কিশোরী ছায়াও প্রথম দাঁড়ালেন ক্যামেরার সামনে, ছবির নাম ‘পথের শেষে’। পরিচালক জ্যোতিষ মুখোপাধ্যায়। ঐ ছবিতেই ছায়াকে দেখে মুগ্ধ হলেন খ্যাতনামা পরিচালক দেবকী কুমার বসু। পরপর তাঁর দুটি ছবিতে মুখ্য চরিত্রে সাইন করালেন ছায়াকে। 'বিদ্যাপতি' এবং ‘সোনার সংসার’। দেবকী বসুকে শিক্ষক রূপে পেয়ে ছায়া দেবী অভিনয় ক্ষমতার সেরা পাঠ পেয়ে গেলেন। 'সোনার সংসার' ছবিতে রমার চরিত্র। 'বিদ্যাপতি'তে রানি লক্ষ্মীর চরিত্রে সমগ্র ভারতকে বশ করলেন ছায়া দেবী। তাঁর পারিশ্রমিক এক লাফে পাহাড়ে।
এর পর অহীন্দ্র চৌধুরী-ছায়া দেবী অভিনীত সুশীল মজুমদারের যুগান্তকারী ছবি ‘রিক্তা’ বড় হিট করল। এই ছবিতে অহীন্দ্রের স্ত্রী করুণার ভূমিকায় অভিনয় করেন ছায়া। রিক্তাতে ছায়া দেবী প্লেব্যাক গানও করেন। গানও হিট হয় এ ছবির। এই ছবিতে ছোট্ট ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন 'পথের পাঁচালী' র চুণীবালা দেবী। তখন চুণীবালাকে কেউ চিনত না। সুশীল মজুমদার বলেছিলেন তাঁর 'রিক্তা' ছবিতে ছায়া দেবী আর অহীন চৌধুরীর অভিনয় দেখে এক সংসার ভাঙা দম্পতি আবার একসঙ্গে থাকা শুরু করেছিলেন। পরিচালকের কাছে যা ছিল শ্রেষ্ঠ পুরস্কার।

১৯৬০ সালে 'বীণা চিত্রম' সংস্থা নতুন করে কপিরাইট কিনে প্রিন্ট করিয়েছিল 'রিক্তা' ছবিটির। ১৯৬০ সালে রি-রিলিজ হয় 'রিক্তা' তখন ছায়া দেবীর স্বকন্ঠে গানগুলো সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় প্লে ব্যাক করেন। তাই এখন 'রিক্তা' দেখলে দেখা যাবে ছায়া দেবীর লিপে সন্ধ্যা মুখার্জ্জী গাইছেন। এ সময়ে কিছু দিন বেতার জগতেও ছায়া দেবীকে প্রথিতযশা গায়িকা হিসেবে পাওয়া যায়।
পরবর্তী অধ্যায়ে কিছুদিন অবসরের পর ফের সিনেমায় ফেরা, সুশীল মজুমদারের 'অভয়ের বিয়ে'তে নায়িকা হয়ে। 'বন্দিতা', 'ধাত্রীদেবতা', 'বার্মার পথে'। এই সময় থেকেই বদলাতে থাকল চলচ্চিত্র মহল, এল নতুন যুগ নতুন নির্মান পদ্ধতি। বায়োস্কোপ যুগ থেকে ফিল্ম যুগ। ছায়া দেবী তখন চরিত্রাভিনেত্রী। কিন্তু তাঁর দাপট ম্লান হয়নি কোনও নতুন নায়ক-নায়িকার উপস্থিতিতে। নায়িকা হয়ে এলেন মঞ্জু দে, অনুভা গুপ্ত, ভারতী দেবী, সন্ধ্যারানীরা। এর পর এল উত্তম-সুচিত্রা যুগ। যে যুগ থেকে ছায়াছবির আইকনিক মা হয়ে ওঠেন ছায়া দেবী।
এই সময়ে ছবি বিশ্বাস আর ছায়া দেবী জুটি ছিল অকৃত্রিম। যাঁরা একসময় নায়ক-নায়িকা ছিলেন, তাঁরাই পরে উত্তম-সুচিত্রার বাবা-মা র চরিত্রে বাঁধা ধরা হয়ে গেলেন এই সময় থেকে। সঙ্গে পাহাড়ী সান্যালও।

উত্তম-সুচিত্রা জুটির পাশাপাশি সুচিত্রা-ছায়া, অর্থাৎ মা-মেয়ে জুটিও অনবদ্য। ‘সপ্তপদী’র রিনা ব্রাউন, রিনার অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান পরিচয় তো আসলে ‘আই’-এর গর্ভে জন্মের ইতিহাস। আই মানে মারাঠিতে মা। স্বদেশী গর্ভে ঔপনিবেশিক সত্তার বীজ। সেই কাহিনির ‘আই’ চরিত্রে ছায়া দেবী।
ঠিক তার উল্টো আবার 'সাত পাকে বাঁধা'। মেয়ে অর্চনার সংসার গুছিয়ে দিতে গিয়ে আরও তার ক্ষতি ডেকে আনেন মা। এ ঘটনা তো আজও ঘটে। বহু মা আজও অনধিকার চর্চা করেন মেয়ের সংসারে। অর্চনার মাও তাই করেছেন। মেয়ে জামাইয়ের নামে বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলা থেকে মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে টেলিফোন বসানো পর্যন্ত। শেষ অবধি ভাঙন। আবার যদি দেখি 'বিপাশা', উত্তম-সুচিত্রা জুটির অন্যতম সেরা সিনেমা, তার শেষ দৃশ্যে সুচিত্রার শাশুড়ি মা, যিনি স্বামী বঞ্চনায় অসতী অবৈধ মাতৃত্বের অপরাধে নিরুদ্দেশ ছিলেন, তাঁকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে সাধিকা রূপে। কী স্নিগ্ধ সেই ছায়া দেবী!
'মেঘ কালো' বা 'হার মানা হার'-এ আবার ছায়া দেবী অত্যাচারিনী। নিজের আখের গোছানো জেঠিমা তিনি।

নীহাররঞ্জন গুপ্তর কলমে অসিত সেনের কালজয়ী ছবি 'উত্তর ফাল্গুনি'। জীবনের দুর্বিপাকে দেবযানীকে হতে হয়েছিল পান্নাবাঈ। কিন্তু কন্যা সুপর্ণার গায়ে কলঙ্কের আঁচ সে লাগতে দেয়নি।সেই দেবযানীকে আত্মহত্যার থেকে বাঁচিয়ে জীবনের আলো দেখান যে বাঈজী, সেই দাপুটে চরিত্রে ছায়া দেবী অসাধারণ। নাচ-গানের তালিম দিয়ে দেবযানীকে করে তোলেন পান্নাবাঈ। 'মমতা'তেও হিন্দি-উর্দু নিখুঁত উচ্চারণে ছায়া দেবী সাবলীল।
'গল্প হলেও সত্যি'র মুখরা বড় বউ, 'আপনজন'-এর ঠাকুমা আনন্দময়ী, 'হারমোনিয়াম'-এর ছায়া দেবীর স্বকন্ঠে গান ও মুজরো নাচের দাপট, কিংবা 'নির্জন সৈকতে'র সেই পুরী ভ্রমণের বিধবারা। অসাধারণ সব চরিত্র ছায়া দেবীকে দিয়েছিলেন তপন সিনহা। আবার তপন সিনহার স্ত্রী অরুন্ধতী দেবীর 'পদীপিসির বর্মীবাক্স'তেও নামভূমিকায় ছিলেন ছায়া দেবী। অজানা তথ্য হল, তপন সিনহা ছায়া দেবীর প্রিয় পরিচালক হলেও, তিনি পছন্দ করতেন না সত্যজিৎ রায়, তরুণ মজুমদারদের। কারণ সত্যজিতের ছবিতে ছায়া দেবীর জায়গা হয়নি, তরুণ মজুমদারের 'কুহেলি' ছবিতে এক বৃদ্ধা আয়ার চরিত্রে ছায়া দেবীকে শুধুমাত্র দেখা গিয়েছিল।

ছায়া দেবীর নিজের কোনও সন্তান ছিল না। কারণ বিয়েতে আর এগোননি কোনও দিন। ইচ্ছেও ছিল না। ছায়া দেবীর মা ছায়া দেবীর সঙ্গেই তাঁর শেষ দিন অবধি থাকতেন ঐ মদন ঘোষ লেনের বাড়িতে। ছায়া দেবী শ্যুটিং এ বেরোনোর সময় রোজ বলে বেরোতেন 'মা আসছি।' এক ভাইঝি ঝুমুর গাঙ্গুলি ছায়া দেবীর দেখাশোনা করতেন। আর দিল্লিতে ভাই ললিতমোহন গাঙ্গুলির কাছে গেলে ভাই-ভাইপোরা মাথায় করে রাখতেন। এই ঝুমুরকে ছায়া দেবী সিনেমাতেও নামিয়েছিলেন।
কনকের প্রিয় খাবার দাবার ছিল উত্তর কলকাতার কচুরি, সিঙাড়া, জিলিপি, আলুর চপ আর কালাকান্দ মিষ্টি। আর ছায়া দেবী নাকি খুব খৈনিও খেতেন! ভাগলপুরের মানুষ, খৈনি তো পছন্দের হবেই। 'কেউ সিগারেট খায়, মদ খায়-- সেসব নিয়ে লজ্জা নেই, আর খৈনি খেলেই লজ্জা!' এই বলে আবার বকেও দিতেন।
ছায়া দেবীর অভিনয় জীবনের পঞ্চাশ বছর উদযাপন করবে বলে ইন্টারভিউ নিতে ক্যামেরা নিয়ে অনেকে এসেছিলেন ছায়া দেবীর বাড়িতে। দেখাই করেননি ছায়া দেবী। মিডিয়া পছন্দই করতেন না। কোন আগ্রহও ছিল না নিজের প্রচারে। নিজের পাওয়া পুরস্কার ছুড়ে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলেন এদিক ওদিক।
সেরিব্রাল অ্যাট্যাক হয়েছিল ছায়ার। শ্যামবাজারের ড্রিমল্যান্ড হসপিটালে ভর্তি করা হয়। ছিলেন পাঁচ দিন। ভোর ৩.৩০ ২৬ এপ্রিল, ২০০১, কনক চিরতরে চলে গেলেন। কিন্তু বাংলা ছবির মায়ের আসন থেকে তাঁর প্রস্থান কোনদিনও সম্ভব নয়।
'যমুনা'তে যাই গো আমি, যাই গো যমুনায়, আহা! ছল করে জল আনতে আমি...