যুদ্ধের পরিস্থিতি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে দেশের পর্যটন ব্যবসার দেশের সরকারের আর্থিক সহায়তার আর্জি জানানো ছাড়া আর কোনও উপায় থাকবে না।

শেষ আপডেট: 19 March 2026 19:13
ইরানের সঙ্গে ইজরায়েল ও আমেরিকার সংঘাত থামার কোনও ইঙ্গিত নেই এখনও। তার জেরে পশ্চিম এশিয়ায় তেল ও গ্যাসের বাণিজ্যে বিপুল ধাক্কা, সেই সঙ্গে শেয়ার বাজারেও ধস, সব মিলিয়ে আর পাঁচটা ব্যবসার মতোই প্রভাব ফেলেছে ভারতের পর্যটন শিল্পেও।
বিদেশ যাওয়া কিংবা বিদেশী নাগরিকদের এ দেশে ভ্রমণ বাতিল হওয়ায় মুখ থুবড়ে পড়েছে বহু পর্যটন সংস্থা। পশ্চিমবঙ্গ-সহ কয়েকটি রাজ্যে আসন্ন নির্বাচনের জন্যও ধাক্কা খাচ্ছে দেশের অভ্যন্তরের পর্যটন ব্যবসা। যুদ্ধের ধাক্কায় করোনাকালের ভয়াবহ স্মৃতির সিঁদুরে মেঘ দেখছেন এই ব্যবসায় যুক্ত অনেকেই।
ভারতে বিদেশী পর্যটকদের আনাগোনার বিষয়টা যে সব সংস্থা দেখভাল করে তাদের অন্যতম সংগঠনটি হল, ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অব ট্যুর অপারেটর্স (আয়াটো, IATO)। তাদের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট প্রণব সরকারের বক্তব্য, সাধারণত বিদেশীরা অক্টোবর-পরের বছরের মার্চ পর্যন্ত ভারতে আসেন বেশি। রমজান-ইদের সময়েও ইউরোপ, কানাডা, পশ্চিম এশিয়া থেকে অনেকে আসেন। এ বারে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ব্যবসা ভালই চলেছিল। কিন্তু মার্চ থেকে পুরোটাই প্রায় বন্ধ। অনেকেরই হাতছাড়া হয়েছে ঈদের ছুটি উপলক্ষে ভারতে আসার সুযোগ। এ সবের বুকিং অনেক আগে থেকে, এমনকী সাত-আট মাস আগেই হয়ে যায়। আবার এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বরের যে বুকিং এই সময়ে শুরু হয়, সে সবও অনিশ্চয়তার জেরে এখন বন্ধ।
তিনি জানান, এই সময়ের ভ্রমণ পরিকল্পনা বাতিল হলেও হোটেল বা অন্যায্য বুকিংয়ের টাকা ফেরত পাওয়া সহজ নয়। ফলে তাঁদের মতো পর্যটন ব্যবসায়দের বাড়তি আর্থিক বোঝা কতদিন টানতে হয়, সেটাই আশঙ্কা।
ভারতে যাঁরা আসবেন, তাঁদের ক্ষেত্রে বিমান যোগাযোগ চালু থাকা মূল বিষয়। যুদ্ধের জেরে সেটাই এখন কার্যত থমকে যাওয়ায় বিদেশী পর্যটকদের ভ্রমণ পরিকল্পনায় প্রভাব পড়েছে। তার জেরে সংস্থাগুলির ব্যবসা সরাসরি ধাক্কা খেয়েছে, জানান আয়াটো-র প্রেসিডেন্ট রবি গোঁসাই। তিনি জানাচ্ছেন, এই সময়ের সহায়ক আবহাওয়া ও বারতের বিভিন্ন পর্যটন সার্কিটের সাংস্কৃতিক উসব টানে বিদেশী পর্যটকদেরও। কিন্তু এ বারে পর্যটন সংস্থাগুলিকে প্রায় শেষ মুহূর্তের ভ্রমণ পরিকল্পনা বাতিল করতে হচ্ছে। এই বিপর্যয় আরও চললে আগামী মাসগুলির বুকিংও ধাক্কা খাবে।
তাঁদের হিসেবে, এই ব্যবসার ৭০-৭৫%-ই দেখভাল করেন তাঁদের সদস্যরা। এই সময়ে এখনই সার্বিক আর্তিক ক্ষতির হিসাব করা সম্ভব না হলেও আয়াটো-কর্তার দাবি, এই অবস্থা বেশি দিন চললে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ব্যবসা হারাবেন তাঁরা।
পর্যটন পরিকল্পনা পুরোপুরি বাতিল করলে যেমন আর্থিক বোঝা বাড়বে সংস্থাগুলির, তেমনই আন্তর্জাতিক মহলেও ভারতীয় পর্যটন ব্যবসার সম্পর্কে বিশ্বাস ধাক্কা খেতে পারে। গোটা বিষয়টি বাইরের পরিস্থিতির জন্য হলেও আস্থার উপর ধাক্কা খাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন তাঁরা। তাই ভ্রমণ পরিকল্পনা বাতিলের ক্ষেত্রে কড়া চার্জ নেওয়ার মনোভাবের বদলে তাঁরা বিকল্প নানা পদক্ষেপ নিচ্ছেন।
তিনি জানান, যেমন, পর্যটকদের ভ্রমণসূচির সময়-তারিখ বদলের প্রস্তাব দিয়ে একটা ক্রেডিট-নোট দেওয়ার কথা বলছেন। যা আগামী ৯-১২ মাস পর্যন্ত বৈধ থাকবে। অর্থাৎ, সেই সময়ের মধ্যে পরেও পর্যটক এই পরিকল্পনা করতে পারবেন। এর ফলে তাঁর আর্থিক ক্ষতিও হবে না, আস্থাও ফিরবে ভারতীয় পর্যটন শিল্পের উপরে।
পশ্চিম এশিয়া যুদ্ধের কবলে পড়ায় সেখানে ও তার প্রভাব পড়া বিদেশী পর্যটকেরা এখন ভারেত আসতে পারছেন না। আয়াটো-র সদস্যরা তাই বিকল্প দেশের পর্যটকদের বাজার ধরতে চাইছেন। অন্যান্য দেশের নাগরিকদেরও ভারতে আসার আগ্রহ বাড়ছে। রবি জানান, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, পূর্ব ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া এবং অন্যান্য দেশের বিকল্প বাজার ধরার উপরে জোর দিচ্ছেন তাঁরা।
এ তো গেল বিদেশী পর্যটকদের কথা। ভারতীয় পর্যটকদের বিদেশে যাওয়া কিংবা দেশের বাজারে ঘোরার অবস্থাটা ঠিক কী রকম? ট্র্যাভেল এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়া (টাই, TAAI) পূর্বাঞ্চলের চেয়ারম্যান অঞ্জনি ধানুকা জানান, যুদ্ধ ও তার জেরে রান্নার গ্যাসের জোগান ব্যাহত হওয়ায় দেশের মধ্যে ব্যবসাও কার্যত অর্ধেক ধাক্কা খেয়েছে। আর বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে তো প্রায় সবটাই বন্ধ। আমেরিকা বা ইউরোপ যাওয়ার কথা ছিল কলকাতা-সহ পূর্বাঞ্চলের যে সব পর্যটকের, তাঁদের প্রায় সকলেই পরিকল্পনা বাতিল করতে বলেছেন। সেই সঙ্গে রাজ্যের ভোট, শেয়ার বাজারে ধস, এ সবও আগ্রহী পর্যটকের ভ্রমণ পরিকল্পনা আপাতত স্থগিত বা বাতিল করতে বাধ্য করছে।
টাইয়ের প্রেসিডেন্ট সুনীল কুমার জানান, গোটা দেশেই একই অবস্থা। তাঁদের ২০০০-এরও বেশি সদস্য সংস্থার ব্যবসা ধাক্কা খেয়েছে। অনেকেই যাঁরা বাইরে ঘোরার পরিকল্পনা করেছিলেন, তাঁদের আপাতত দেশের পর্যটনস্থানগুলিকেই বিকল্প হিসাবে বেছে নিতে বলছেন তাঁরা।
যুদ্ধের পরিস্থিতি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে দেশের পর্যটন ব্যবসার দেশের সরকারের আর্থিক সহায়তার আর্জি জানানো ছাড়া আর কোনও উপায় থাকবে না বলে মনে করেন রবি। সে ক্ষেত্রে আর্থিক ত্রাণ প্রকল্প (relief package) দেওয়া কিংবা কার্যকরী মূলধন (working capital) সহজলভ্য করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলে পরবর্তীকালে ভারতের হয়ে আরও বেশি প্রচার চালানো জরুরি হয়ে উঠবে, মত তাঁর।