বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতীয় অর্থনীতির ভিত্তি দৃঢ় হলেও বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতা ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে।

ভারতের শেয়ার বাজারে ঐতিহাসিক মুহূর্ত
শেষ আপডেট: 6 October 2025 13:08
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আজ ভারতের শেয়ার বাজারে তৈরি হল এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। দেশের প্রধান শেয়ার সূচক সেনসেক্স (Sensex) প্রথমবারের মতো ৮০ হাজার পয়েন্টের গণ্ডি অতিক্রম করেছে — যা ভারতীয় অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগকারীদের আস্থার এক প্রতীকী চিহ্ন। এই সাফল্য বাজারে নতুন আশার সঞ্চার করেছে এবং ভারতের আর্থিক শক্তির এক দৃঢ় বার্তা দিয়েছে।
ঐতিহাসিক মাইলফলক ও তাৎপর্য
১৯৮৬ সালে সূচকটি চালু হওয়ার পর সেনসেক্স ভারতের অর্থনৈতিক গতিপ্রকৃতির এক প্রতীক হয়ে উঠেছে। ১৯৭৯ সালে মাত্র ১০০ পয়েন্ট দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল এই সূচক। এরপর ধাপে ধাপে ১৯৯০ সালে ১,০০০ পয়েন্ট, ১৯৯৯ সালে ৫,০০০, ২০০৬ সালে ১০,০০০, ২০২১ সালে ৫০,০০০— আর এবার ২০২৫ সালে ছুঁলো ৮০,০০০ পয়েন্টের ঐতিহাসিক মাইলফলক।
অক্টোবর মাসের শুরুতে পরপর আট দিন পতনের পর বাজার আবার ঘুরে দাঁড়ায় এবং সেনসেক্স ৮১,২০৭.১৭ পয়েন্টে বন্ধ হয়। এটি শুধু সংখ্যাগত উত্থান নয়, বরং ভারতের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক শক্তি ও বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রতিফলন।
বাজারের ঊর্ধ্বগতির মূল কারণ
এই ঐতিহাসিক উত্থানের পেছনে রয়েছে একাধিক ইতিবাচক উপাদান -
অর্থনৈতিক বৃদ্ধি: রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (RBI) ২০২৬ অর্থবছরের জন্য জিডিপি বৃদ্ধির পূর্বাভাস ৬.৫% থেকে বাড়িয়ে ৬.৮% করেছে।
কর্পোরেট আয় বৃদ্ধি: ২০২৫-২৬ সালে কর্পোরেট আয় ১৩% এবং ২০২৬-২৭ সালে ১৬% বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সরকারি নীতি: জিএসটি সংস্কার, কর ছাড় এবং মুদ্রানীতির নমনীয়তা অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রেখেছে।
পরিকাঠামোতে বিনিয়োগ: সরকারি প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়ায় বেসরকারি খাতও নতুন প্রকল্পে ঝুঁকছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরেই বেসরকারি বিনিয়োগ বেড়েছে ১৬.৯%।
দেশীয় বিনিয়োগ: ভারতীয় পরিবার ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের (DIIs) অংশগ্রহণ বাজারকে শক্তিশালী করেছে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ভূমিকা
যদিও ২০২৫ সালে বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীরা (FPIs) কিছু পুঁজি তুলে নিয়েছেন — সেপ্টেম্বরেই ২.৭ বিলিয়ন ডলার — তবুও দেশীয় বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় ভূমিকা বাজারের ভারসাম্য বজায় রেখেছে। উচ্চ মূল্যায়ন, মার্কিন নীতির প্রভাব এবং টাকার অবমূল্যায়ন এই পুঁজি প্রত্যাহারের মূল কারণ।
বিশ্লেষকদের মতে, কর্পোরেট আয় বৃদ্ধি এবং ভারত-মার্কিন বাণিজ্য সম্পর্কের উন্নতি হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আবারও ভারতীয় বাজারে ফিরবেন।
অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব
বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান মরগান স্ট্যানলি জানিয়েছে, আগামী দশকে বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ চালাবে ভারত। ২০২৭ সালের মধ্যে ভারত জাপান ও জার্মানিকে ছাড়িয়ে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হতে পারে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ায় কর্পোরেট আয়ও বাড়ছে — যা শেয়ারের দাম বৃদ্ধিতে সহায়ক। ব্যাংকিং, ফাইনান্সিয়াল সার্ভিসেস এবং অটোমোবাইল সেক্টর সেনসেক্সের এই উত্থানে প্রধান ভূমিকা রাখছে।
রিজার্ভ ব্যাঙ্ক গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রা জানিয়েছেন, মূল্যস্ফীতি ২.৬%-এ নামানো হয়েছে, খাদ্যের দামও কমছে, ফলে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে।
বিনিয়োগকারীদের জন্য সতর্ক বার্তা
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতীয় অর্থনীতির ভিত্তি দৃঢ় হলেও বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতা ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি একটি বড় সুযোগ — বিশেষত সেই সব কোম্পানি যেগুলি অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও সরকারি নীতির সুবিধা পাচ্ছে।
স্বল্পমেয়াদী বিনিয়োগকারীদের উচিত বাজারের অস্থিরতার ঝুঁকি বুঝে পদক্ষেপ নেওয়া।
জিওজিৎ ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেসের চিফ ইনভেস্টমেন্ট স্ট্র্যাটেজিস্ট ভি কে বিজয়কুমার বলেন,“বাজারের যাত্রা অস্থির হবে। স্বল্পমেয়াদে ওঠানামা বিনিয়োগকারীদের মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে।”