সেনসেক্স ও নিফটির বড় পতনে ভারতীয় পুঁজিবাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।

ছবি- এআই নির্মিত
শেষ আপডেট: 6 August 2025 14:16
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আজ সকালে ভারতীয় শেয়ার মার্কেটে চরম অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। অপ্রত্যাশিতভাবে সেনসেক্স এবং নিফটি, দুই প্রধান সূচকই বড় ধরনের পতনের শিকার হয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে বাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা চলার পর হঠাৎ এমন বড়সড় পতন দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়েও প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। শুধু বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিই নয়, এই পতনের সুদূরপ্রসারী প্রভাব গোটা দেশের অর্থনীতিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতি: রেকর্ড পতন
১লা আগস্ট ২০২৫, তারিখে মুম্বই স্টক এক্সচেঞ্জের সেনসেক্স ৭৫০ পয়েন্টের বেশি এবং ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের নিফটি ২০০ পয়েন্টের বেশি কমে লেনদেন শুরু করে। মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যেই বাজার থেকে প্রায় ৫ লক্ষ কোটি টাকা হাওয়া হয়ে যায়। ২৯শে জুলাই, ২০২৫-এর পর থেকে বাজার মূলধনে ৮.৬৭ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি কমেছে। এই ধসের প্রভাব শুধু প্রধান সূচকে সীমাবদ্ধ থাকেনি—মিডক্যাপ ও স্মলক্যাপ শেয়ারেও প্রবল পতন দেখা গেছে।
বিএসই স্মলক্যাপ ৪০০ পয়েন্ট এবং নিফটি স্মলক্যাপ ৬০০ পয়েন্টের বেশি কমেছে। বিএসই-তে লেনদেন হওয়া ৩০৮৫টি শেয়ারের মধ্যে ২০৩৩টি শেয়ারের দাম কমেছে, এবং মাত্র ৮৮৭টি শেয়ারে লাভ হয়েছে। ২৬শে জুলাই সেনসেক্স ৭২১.০৮ পয়েন্ট কমে ৮১,৪৬৩.০৯ অঙ্কে এবং নিফটি ২২৫.১০ পয়েন্ট কমে ২৪,৮৩৭-এ এসে দাঁড়িয়েছে। আর্থিক, তথ্যপ্রযুক্তি এবং তেল ও গ্যাস খাতের শেয়ার এই পতনে মুখ্য ভূমিকা রেখেছে।
| তারিখ | সেনসেক্স পতন | নিফটি পতন | বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি |
|---|---|---|---|
| ১ আগস্ট ২০২৫ | ৭৫০+ পয়েন্ট | ২০০+ পয়েন্ট | ~৫ লক্ষ কোটি (১৫ মিনিটে) |
| ৩১ জুলাই ২০২৫ | ~৩০০ পয়েন্ট (০.৩৬%) | ৮৬.৭০ পয়েন্ট (০.৩৫%) | তথ্য নেই |
| ২৫-২৬ জুলাই ২০২৫ | ১২৬৩.৫৫ পয়েন্ট | ২২৫.১০ পয়েন্ট | ~৮.৬৭ লক্ষ কোটি |
| ২২ মে ২০২৫ | ১১০০+ পয়েন্ট | নিফটি ২৪,৫০০-এর নিচে | ~২ লক্ষ কোটি |
| ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ | ৪২৪.৯০ পয়েন্ট | ১১৭.২৫ পয়েন্ট | তথ্য নেই |
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই পতনের পেছনে একাধিক আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ কারণ রয়েছে:
মার্কিন শুল্ক নীতি ও বাণিজ্য উত্তেজনা: ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের উপর ২৫% শুল্ক আরোপের ঘোষণা করেছেন, যা ১ আগস্ট থেকে কার্যকর হওয়ার কথা। রাশিয়া থেকে তেল কেনা নিয়েও ভারতের উপর শাস্তিমূলক পদক্ষেপের হুমকি এসেছে। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চাপ বেড়েছে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিক্রি: বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ভারতের বাজার থেকে শেয়ার বিক্রি করে চলেছেন। ৩১ জুলাই দিনে তারা ৫৫৮৮.৯১ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেছেন। গত ৯টি ট্রেডিং সেশনে মোট বিক্রির পরিমাণ প্রায় ২৭,০০০ কোটি টাকা।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক দুর্বলতা: যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ ও ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ, বন্ড বাজারে চাপ এবং এশিয়ার অন্যান্য শেয়ারবাজারেও পতনের প্রবণতা ভারতের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি: রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা এবং ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বৃদ্ধি ভারতের আমদানি খাতে চাপ ফেলছে। এতে বাণিজ্য ঘাটতি ও মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা বেড়েছে।
উচ্চ সুদের হার: ব্যাংক গুলি ১১% পর্যন্ত সুদ দিচ্ছে, যা বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বাজার থেকে সরিয়ে ব্যাংকে সঞ্চয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
লাভ বুকিং ও ফলাফলের হতাশা: সেনসেক্স ও নিফটির আগের বৃদ্ধি থেকে লাভ তুলতে অনেকেই শেয়ার বিক্রি করছেন। পাশাপাশি, প্রথম ত্রৈমাসিকের কোম্পানিগুলোর আর্থিক ফলাফল প্রত্যাশা পূরণ করেনি।
চীনের বাজারে আকর্ষণ: চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর নতুন নীতির ফলে হংকংয়ের বাজার ৩% বেড়েছে, যা ভারতের বাজার থেকে অর্থ সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
মার্জিন লোনের চাপ: অনেক বিনিয়োগকারী যাঁরা ঋণে শেয়ার কিনেছেন, তাদের বাধ্যতামূলক বিক্রিতে অংশ নিতে হচ্ছে, যা বাজারে আরও ধস নামাচ্ছে।
বিনিয়োগকারীদের অবস্থা: মাত্র ১৫ মিনিটের লেনদেনে ৫ লক্ষ কোটি টাকার ক্ষতি এবং দু'দিনে প্রায় ৮.৬৭ লক্ষ কোটি টাকার সম্পদ হ্রাস বিনিয়োগকারীদের মধ্যে গভীর আঘাত দিয়েছে। বহু ব্যক্তি তাদের পুঁজির অর্ধেক হারিয়ে ফেলেছেন। অনেকেই পুঁজিবাজার থেকে অর্থ তুলে নিচ্ছেন, নতুন লগ্নিও কমে গেছে।
একজন অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারী বলেন, "ভালো কোম্পানির শেয়ারেও এমন ধস আগে কখনও দেখিনি। ১০০ টাকার শেয়ার ৩০-৪০ টাকায় নেমে যাচ্ছে। কমিশন এর কোনও জবাব দিতে পারছে না।"
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস
ক্যাপিটালমাইন্ড-এর দীপক শেনয় মনে করেন, ১-২% পতন নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। ভারতের অর্থনীতি এখনও শক্তিশালী। তবে জিওজিত-এর আনন্দ জেমস ও বাজার বিশ্লেষক আশিস নন্দী বলছেন, দুর্বলতা স্পষ্ট এবং পতন অব্যাহত থাকতে পারে। এঞ্জেল ওয়ান-এর আমার দেও সিং মনে করেন, এখনো ভারতের বাজার শক্তিশালী, বিশেষ করে অটো ও NBFC খাতে লগ্নির সুযোগ রয়েছে।
অর্থনীতির উপর প্রভাব ও করণীয়
শুধু বিনিয়োগকারীদের নয়, দেশের অর্থনীতির উপরও এই অস্থিরতা নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাজারে বিদেশি লগ্নি কমে যাচ্ছে, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা দিশেহারা। বাজারে স্বচ্ছতা, কার্যকর হস্তক্ষেপ, নিয়ন্ত্রক সংস্থার জবাবদিহিতা এবং উচ্চ সুদের চাপ কমানোর প্রয়োজনীয়তা আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।
মিডওয়ে সিকিউরিটিজের এমডি আশিকুর রহমান মনে করেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত ছিল ধাপে ধাপে পদক্ষেপ নেওয়া। বাজারের আস্থা ফেরাতে এখন সরকার, বিএসইসি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সম্মিলিত হস্তক্ষেপ ছাড়া উপায় নেই।