আজ ২০ অক্টোবর, সোনার দামে বড় পরিবর্তন। জেনে নিন ২২ ও ২৪ ক্যারেট সোনার সর্বশেষ বাজার দর, উৎসবের কেনাকাটায় প্রভাব ফেলতে পারে এই তথ্য।

শেষ আপডেট: 20 October 2025 12:22
দ্য ওয়াল ব্যুরোঃ উৎসবের মরসুম মানেই আনন্দের ঢেউ— ধনতেরাস থেকে দীপাবলি, শুভ দিনে সোনা কেনা যেন ভারতের এক চিরন্তন প্রথা। তবে প্রশ্ন এখন একটাই— উৎসবের আগে সোনার দাম কি সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেবে, নাকি আরও চড়বে? সারা দেশের মতো কলকাতাতেও প্রতিদিন ওঠানামা করছে সোনার বাজার। এই দামি ধাতুর দরে পরিবর্তন ক্রেতা ও ব্যবসায়ী— উভয়ের মনেই কৌতূহল বাড়াচ্ছে। তাই আজকের দিনে ২৪ ক্যারেট ও ২২ ক্যারেট সোনার দাম কত, তা জানা একান্তই প্রয়োজন।
উৎসবের মরসুমে চড়া সোনার বাজার
উৎসবের মরসুমে দেশের বাজারে সোনার দাম পৌঁছেছে রেকর্ড উচ্চতায়। এই দাম বিনিয়োগকারী ও ক্রেতা— দুই পক্ষকেই ভাবিয়ে তুলেছে। দীপাবলি ও ধনতেরাসের মতো শুভ অনুষ্ঠানে সোনা কেনা ঐতিহ্য হলেও, এ বছরের দাম অনেকের সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।কলকাতায় সোনার দাম নতুন রেকর্ড গড়েছে। দিল্লিতেও ধনতেরাসের দিনে প্রতি ১০ গ্রামে ২৪০০ টাকা কমে দাম দাঁড়িয়েছিল ১,৩২,৪০০ টাকায়। বর্তমানে সেখানে ২৪ ক্যারেট সোনার দাম প্রতি ১০ গ্রামে ₹১,৩১,০১০ এবং ২২ ক্যারেট সোনার দাম ₹১,২০,১০০।
গত এক বছরে সোনার দাম বেড়েছে প্রায় ৬৩%, আর রূপার দাম ৭২%। বিশ্ববাজারে স্পট সোনার দর প্রতি আউন্সে $৪৩০০ অতিক্রম করেছে— যা প্রায় দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। স্থানীয়ভাবে প্রতি ১০ গ্রামে দাম ১.৩২ লক্ষ টাকা ছুঁয়েছে। তবুও উৎসবের সময়ে সোনা ও রূপার খুচরা চাহিদা শক্তিশালী রয়ে গেছে।
সোনার দামে উর্ধ্বগতির কারণ
সোনার এই লাগামছাড়া দাম বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে একাধিক আন্তর্জাতিক ও দেশীয় কারণ।
আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র–চীন উত্তেজনা, ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে সোনার দিকে ঝুঁকছেন।
দুর্বল ডলার ও সুদের হার নীতি
ডলারের প্রতি আস্থা কমে যাওয়া এবং মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা সোনার দাম আরও বাড়াচ্ছে। দুর্বল ডলারের কারণে অন্যান্য মুদ্রাভিত্তিক বিনিয়োগকারীরা সোনা তুলনামূলক সস্তায় কিনতে পারছেন, ফলে চাহিদা বাড়ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঞ্চয় বৃদ্ধি
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল জানাচ্ছে, গত তিন বছর ধরে বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলি প্রতি বছর ১০০০ টনেরও বেশি সোনা কিনছে। ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কও (RBI) ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে সোনা মজুত বাড়াচ্ছে।
সীমিত উৎপাদন ও সরবরাহ সংকট
খনিতে উৎপাদন হ্রাস এবং বাজারে সোনার সীমিত সরবরাহও দামের উত্থান ঘটাচ্ছে। উৎসবের সময়ে চাহিদা বাড়লেও পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় দাম আরও চড়ছে।
ক্রেতাদের মনোভাব ও কেনাকাটার নতুন ধারা
সোনার আকাশছোঁয়া দামেও ভারতীয়দের এই ধাতুর প্রতি ভালোবাসা কমেনি। ধনতেরাস ও দীপাবলিতে গয়নার দোকানগুলোতে এখনও ভিড় লেগেই আছে। তবে ক্রেতাদের কেনাকাটার ধরনে এসেছে কিছু নতুন প্রবণতা।
হালকা গয়নার প্রতি ঝোঁক: ক্রেতারা এখন বাজেট বাঁচাতে হালকা ওজনের গয়না কিনছেন— যা দেখতে জমকালো হলেও সোনার পরিমাণ কম। যেমন ২৫০ মিলিগ্রাম বা ২৫ মিলিগ্রামের সোনার কয়েনের বিক্রি বাড়ছে।
বিনিয়োগের দিকে ঝোঁক: অনেকেই এখন গয়নার বদলে সোনার বার, কয়েন, ইটিএফ (Exchange Traded Funds) বা ডিজিটাল গোল্ডে বিনিয়োগ করছেন। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, গয়নার চাহিদা ৮০% থেকে নেমে এসেছে ৬৪%-এ, আর বিনিয়োগের চাহিদা ১৯% থেকে বেড়ে ৩৫%-এ পৌঁছেছে।
বাজার বিশ্লেষণ: ব্যাঙ্ক অব বরোদার মুখ্য অর্থনীতিবিদ মদন সবনবিশের মতে, উচ্চবিত্ত শ্রেণি সোনা কেনা চালিয়ে গেলেও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলির পক্ষে তা কঠিন হচ্ছে। অনেকেই দাম কমার অপেক্ষায় কেনাকাটা স্থগিত রেখেছেন।
ফোমো প্রভাব: কিছু ক্রেতা মনে করছেন, দাম আরও বাড়তে পারে, তাই এখনই সোনা কিনে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।
বিনিয়োগ হিসেবে সোনার নতুন গুরুত্ব
বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে সোনা কেবল গয়না নয়— এক নির্ভরযোগ্য বিনিয়োগ মাধ্যম। শেয়ারবাজারের অস্থিরতা ও ডলারের দুর্বলতায় বিনিয়োগকারীরা ক্রমে সোনার দিকে ঝুঁকছেন।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের মতে, ২০২৫ সালে ভারতের মোট সোনার ব্যবহার কিছুটা কমলেও বিনিয়োগের চাহিদা বিপুল বৃদ্ধি পাবে। গোল্ড ইটিএফ ও ডিজিটাল গোল্ডে বিনিয়োগ সেপ্টেম্বর মাসে রেকর্ড গড়েছে— এই খাতে বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় ৭০%।
“বিশ্বজুড়ে স্পট সোনার দাম প্রতি আউন্সে $৪৩০০ ছুঁয়েছে— যা গত দুই দশকে সর্বোচ্চ। স্থানীয় বাজারে প্রতি ১০ গ্রামে ১.৩২ লক্ষ টাকায় পৌঁছেছে। দুর্বল ডলার, কম সুদের হার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্রয় বৃদ্ধি— এই তিন কারণ সোনাকে আরও শক্তিশালী করছে।”
ভারতীয় পরিবারগুলোর হাতে প্রায় $৩.৮ ট্রিলিয়ন মূল্যের সোনা রয়েছে— যা দেশের মোট জিডিপির ৮৮.৮%। ফলে সোনা আজ অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রতীকও বটে।
সোনার চোরাচালান ও তার প্রভাব
দামের রেকর্ড বৃদ্ধি ও বৈধ সরবরাহ সংকটের কারণে উৎসবের মরসুমে ভারতে স্বর্ণ চোরাচালান আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। সরকারি ও শিল্প মহল জানিয়েছে, পাচারকারীরা দ্রুত ও বেশি মুনাফায় সোনা বিক্রি করতে পারছে।
আমদানি শুল্ক ১৫% থেকে ৬%-এ নামানোর পর কিছুটা হ্রাস দেখা গেলেও সাম্প্রতিক সময়ে তা আবার বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজস্ব গোয়েন্দা অধিদপ্তর (DRE) ও কাস্টমস বিভাগ একাধিক বিমানবন্দরে পাচারের চেষ্টা ব্যর্থ করেছে। কালোবাজারে প্রতি কেজি সোনা বিক্রিতে পাচারকারীরা ১১.৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত লাভ করছে— কারণ তারা শুল্ক ও বিক্রয় কর এড়িয়ে যাচ্ছে। এই চোরাচালান সরকারের রাজস্ব ক্ষতি করছে এবং বৈধ বাজারের ভারসাম্য নষ্ট করছে। অনেক ব্যাংক সীমিত মজুতের কারণে সোনার ওপর প্রিমিয়াম বাড়াচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎসবের পর সাময়িকভাবে দাম কিছুটা কমলেও, দীর্ঘমেয়াদে সোনার দাম আরও বাড়ার সম্ভাবনা প্রবল। গোল্ডম্যান স্যাকস এবং ব্যাংক অব আমেরিকা গ্লোবাল রিসার্চের পূর্বাভাস— ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ প্রতি আউন্স সোনার দাম $৫,০০০ ছুঁতে পারে। তাদের মতে, সুদের হার কমানো ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্রয় বৃদ্ধি সোনার বাজারকে আরও শক্তিশালী করবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে, আজকের সোনার দাম কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতি, ভূ-রাজনীতি এবং ভারতীয় সংস্কৃতির এক প্রতিচ্ছবি।