আজ ভারতে সোনার দামে ফের বড় পতন। ডলারের শক্তিশালী অবস্থান, ফেডের নীতির ইঙ্গিত ও বিশ্ববাজারের স্থিতির প্রভাবে বিনিয়োগকারীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ।
.jpeg.webp)
ছবি (AI)
শেষ আপডেট: 29 October 2025 15:12
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আজও সোনার দামে বড় পতন দেখা গেছে, যা বিনিয়োগকারীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। গত কয়েকদিন ধরে মূল্যবান এই ধাতুর দাম টানা নিম্নমুখী। উৎসবের মরসুমের আগে এই ধারাবাহিক দরপতন ঘিরে আশঙ্কা বাড়ছে ব্যবসায়ীদের মধ্যেও, কারণ এটি ক্রেতাদের সিদ্ধান্তকেও প্রভাবিত করতে পারে।
সোনার দামে টানা পতন
দেশের বাজারে সোনার দাম গত কয়েক সপ্তাহ ধরে নিম্নমুখী। এক সময় রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছনো সোনার দামে এখন বড় পতন দেখা যাচ্ছে। এই দরপতনে সাধারণ ক্রেতারা কিছুটা স্বস্তি পেলেও, যারা সম্প্রতি চড়া দামে সোনা কিনেছিলেন, তারা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ২৮ অক্টোবর, ২০২৫ তারিখে কলকাতায় ২৪ ক্যারেট সোনার প্রতি ১০ গ্রামের দাম কমে দাঁড়িয়েছে ১,২০,৮২০ টাকা — একদিনে প্রায় ২,৪৬০ টাকা কম। ২২ ক্যারেট সোনার দামও ২,২৫০ টাকা হ্রাস পেয়ে হয়েছে ১,১০,৭৫০ টাকা। দীপাবলির পর থেকেই এই নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অনেকে এটিকে “স্বাভাবিক সংশোধন” হিসেবে দেখছেন, যা দীর্ঘ ঊর্ধ্বগতির পর সাধারণ বাজারচিত্র।
সোনার দাম কমছে কেন?
এই পতনের পেছনে রয়েছে একাধিক আন্তর্জাতিক ও দেশীয় কারণ। প্রথমত, মার্কিন ডলারের শক্তিশালী অবস্থান। আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার লেনদেন ডলারে হয়, ফলে ডলার শক্তিশালী হলে অন্যান্য মুদ্রার তুলনায় সোনার দাম কমে যায়। দ্বিতীয়ত, মার্কিন-চিন বাণিজ্য সম্পর্কের উন্নতির আশায় বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদ (gold hedge) থেকে সরে গিয়ে শেয়ারে বিনিয়োগ করছেন। এছাড়াও, তেলের দাম কমা এবং মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার কমানোর ইঙ্গিতও প্রভাব ফেলেছে। উচ্চ সুদের হারে বিনিয়োগকারীরা বন্ডের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন, ফলে সোনার চাহিদা হ্রাস পাচ্ছে।
বিনিয়োগকারীদের উপর প্রভাব
সোনার এই দরপতনে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। যারা চড়া দামে কিনেছিলেন, তারা চিন্তিত। অন্যদিকে, যারা সঠিক সময়ের অপেক্ষায় ছিলেন, তারা এটিকে সুযোগ হিসেবে দেখছেন।
বাজার বিশেষজ্ঞদের মতামত
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পতন সাময়িক। উৎসব-পরবর্তী সময়ে চাহিদা কমে দাম হ্রাস পেলেও শীঘ্রই তা বাড়তে পারে। এসএস ওয়েলথস্ট্রিটের সুগন্ধা সচদেবার অনুমান, “দাম কিছুটা কমার পর প্রতি ১০ গ্রামে ১.৪৫ থেকে ১.৫০ লক্ষ টাকায় ফিরে যেতে পারে।”
তবে অন্য একটি অংশ মনে করছে, দাম আরও ১০-১৫% পর্যন্ত কমতে পারে। অক্ষয় কাম্বোজের মতে, “আগামী সপ্তাহই নির্ণায়ক — ট্রাম্প-শি বৈঠকের ফলাফল এবং ফেডের নীতিগত সিদ্ধান্ত সোনার বাজারের দিক নির্ধারণ করবে।”
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলির ভূমিকা বিশ্বব্যাপী সোনার বাজারে গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক (RBI) সাম্প্রতিক ত্রৈমাসিকে ১৮.৫ টন সোনা কিনেছে— যা প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে সোনার প্রতি আস্থা নির্দেশ করে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলির এই ক্রমবর্ধমান ক্রয় ভবিষ্যতে সোনার দামের পুনরুত্থান ঘটাতে পারে। অন্যদিকে, মার্কিন ফেড, ইউরোপীয় ও জাপান ব্যাংকের সুদের হারের সিদ্ধান্ত সরাসরি সোনার দামে প্রভাব ফেলবে। সাধারণত সুদের হার বাড়লে সোনার আবেদন কমে, কারণ এতে সুদ আয় হয় না।
উৎসবের মরসুমে সোনার চাহিদা
ভারতের সংস্কৃতিতে সোনা শুধু ধাতু নয়— এটি ঐতিহ্য ও বিশ্বাসের প্রতীক। ধনতেরাস ও দীপাবলিতে সোনা কেনাকে শুভ মনে করা হয়। অল ইন্ডিয়া জেম অ্যান্ড জুয়েলারি কাউন্সিল জানিয়েছে, এবারের উৎসবে প্রায় ৫০-৬০ টন সোনা বিক্রি হয়েছে। তবে উৎসব শেষে চাহিদা কিছুটা কমেছে, যা সাম্প্রতিক দরপতনের একটি কারণ। কিন্তু এই কম দামে এখন অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার সোনা কেনার সুযোগ পাচ্ছে, বিশেষ করে আসন্ন বিবাহ মরসুমের আগে।
সাধারণ মানুষের উপর প্রভাব
সোনার দামের পতন সাধারণ ক্রেতাদের জন্য স্বস্তির। এক মাস আগেও যাঁরা উচ্চ দামের কারণে পিছিয়ে ছিলেন, তারা এখন আবার বাজারে ফিরছেন। তবে সোনা কিনতে গেলে ৩% জিএসটি ও গয়না তৈরির মজুরি যোগ হয়— যা চূড়ান্ত দামে প্রভাব ফেলে। তাই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, ক্রেতাদের এই অতিরিক্ত খরচ মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।