ইকোনমিক সার্ভের মতে, এ ধরনের নগদ সহায়তার বদলে সময়বদ্ধ, শর্তসাপেক্ষ ও ফলাফলভিত্তিক সহায়তা মানবসম্পদ গঠনে বেশি কার্যকর এবং রাজকোষের উপর দীর্ঘমেয়াদি চাপও তাতে কমতে পারে।

ছবি - দ্য ওয়াল
শেষ আপডেট: 30 January 2026 11:38
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে’ (lakhir bhandar) আসলে অলক্ষ্মীর অশনিসংকেত লুকিয়ে রয়েছে বলে দ্ব্যর্থহীন ভাবে সতর্ক করল আর্থিক সমীক্ষা (Economic survey 2026)। অনেকের মতে, এই সতর্কবার্তা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে প্রায় সব রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জন্যও প্রযোজ্য।
কিন্তু কেন এই অশনিংসকেত। সমীক্ষার যুক্তি কী?
গত বিধানসভা ভোটের ইস্তাহারে ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ (lakhir bhandar) প্রকল্প চালু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অনেক রাজনৈতিক পণ্ডিত মনে করেন, ওটাই ছিল মমতার তুরুপের তাস। তার পর থেকে রাজ্যে রাজ্যে এ ধরনের প্রকল্প সংক্রামক হয়ে গেছে। একদা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এ ধরনের প্রকল্পকে খয়রাতি বা রেবড়ি কিংবা ভোট কেনার অস্ত্র বলে সমালোচনা করলেও, পরে তাঁর দলই ঠ্যালায় পড়ে এই স্রোতে গা ভাসিয়েছে। যার সর্বশেষ নমুনা দেখা গেছে বিহার ভোটের মুখে। মুখ্যমন্ত্রী মহিলা রোজগার যোজনার (mukhyamantri mahila rojgar yojana) নামে বিহার নির্বাচনের আগে ১ কোটি ২০ লক্ষ মহিলার অ্যাকাউন্টে সরাসরি ১০ হাজার টাকা করে পাঠিয়েছে নীতীশ-বিজেপির সরকার। প্রধানমন্ত্রী মোদী সেই প্রকল্পের উদ্বোধন করেছেন ঘটা করে।
কিন্তু ইকোনমিক সার্ভের মতে, বিভিন্ন রাজ্যে চালু হওয়া তথাকথিত ‘ফ্রিবি’ বা নিঃশর্ত নগদ সহায়তা প্রকল্পগুলি ভবিষ্যতে পুঁজি খাতে বিনিয়োগ (Capital Expenditure) কমিয়ে দিতে পারে। এবং এই খয়রাতি রাজ্য অর্থনীতিকে ঠেলে দিতে পারে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির দিকে।
রবিবার ১ ফ্রেব্রুয়ারি সংসদে বাজেট (Budget 2026) ঘোষণা হবে। তার আগে বৃহস্পতিবার সংসদে আর্থিক সমীক্ষা পেশ করেছেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। সেই সমীক্ষায় জানানো হয়েছে, ২০২৫–২৬ আর্থিক বছরে নিঃশর্ত নগদ সহায়তা প্রকল্পে মোট ব্যয় পৌঁছতে পারে প্রায় ১.৭ লক্ষ কোটি টাকায়। এই প্রকল্পগুলির বড় অংশই মহিলা উপভোক্তাদের জন্য তৈরি হয়েছে। গত কয়েক বছরে এমন প্রকল্প চালু করা রাজ্যের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে এবং তাদের প্রায় অর্ধেকই বর্তমানে রাজস্ব ঘাটতিতে ভুগছে।
ইকোনমিক সার্ভের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রাজ্যগুলির মোট রাজস্ব ব্যয়ের বড় অংশ এখন বেতন, পেনশন, সুদ, ভর্তুকি ও নগদ সহায়তার মতো ‘কমিটেড এক্সপেন্ডিচার’-এ আটকে যাচ্ছে। এর ফলে পরিকাঠামো, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের মতো উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের সুযোগ ক্রমশ সঙ্কুচিত হচ্ছে।
আর্থিক সমীক্ষা অবশ্য স্বীকার করেছে, নগদ সহায়তা প্রকল্পগুলি স্বল্পমেয়াদে দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারগুলিকে তাৎক্ষণিক সহায়তা দেয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে এবং বড় আকারে এই প্রকল্প চলতে থাকলে তা মধ্যমেয়াদি বৃদ্ধির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে—বিশেষত এর ফলে যখন কর্মসংস্থান, দক্ষতা বৃদ্ধি ও মানবসম্পদে বিনিয়োগ ধাক্কা খায়, তখন বিপর্যয় অনিবার্য।
আরও উদ্বেগের বিষয় হিসেবে সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে, বহু রাজ্যেই এই ধরনের প্রকল্পে ‘সানসেট ক্লজ’, নিয়মিত পর্যালোচনা বা নির্দিষ্ট ‘এক্সিট মেকানিজম’ নেই। অর্থাৎ বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে যে এটা একটা ফাঁদের মতো, এর ফলে ভবিষ্যতে বাজেট পুনর্বিন্যাস করা কঠিন হয়ে উঠছে।
সমীক্ষা জোর দিয়ে জানিয়েছে, তারা যে কথা বলছে কা কল্যাণমূলক ব্যয়ের বিরোধিতা নয়। বরং রাজ্য বাজেটে অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণ জরুরি। ইকোনমিক সার্ভের মতে, এ ধরনের নগদ সহায়তার বদলে সময়বদ্ধ, শর্তসাপেক্ষ ও ফলাফলভিত্তিক সহায়তা মানবসম্পদ গঠনে বেশি কার্যকর এবং রাজকোষের উপর দীর্ঘমেয়াদি চাপও তাতে কমতে পারে।
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, আর্থিক সমীক্ষা কত বড় সত্যি কথা বলছে তা বাংলার অবস্থা দেখলেই বোঝা যায়। খয়রাতির প্রকল্প চালাতে গিয়ে পরিকাঠামো, মানবসম্পদ উন্নয়নে পুঁজি বিনিয়োগ করা যাচ্ছে না। তাতে রাজ্য আরও পিছিয়ে যাচ্ছে। আর রাজস্ব ঘাটতি সত্ত্বেও বল্গাহীন ভাবে আর্থিক সহায়তার মতো প্রকল্প চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। এতে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে যে বড় ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে তার দেওয়াল লিখন স্পষ্ট।
বড় কথা হল, এই সব প্রকল্প সত্যিই ফাঁদ হয়ে উঠেছে। প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতির পরিবেশে এই খয়রাতি বন্ধের ঝুঁকি কেউ নেবে না। বরং ক্রমশই তা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেবে। যার খেসারত দিতে হবে গোটা রাজ্যকে।