আর্থিক সমীক্ষা ২০২৫–২৬ (Economic Survey 2025–26) স্পষ্ট করে জানিয়েছে—গিগ কর্মীদের বড় অংশ এখনও প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে রয়ে গিয়েছেন।

শেষ আপডেট: 29 January 2026 21:58
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারতের দ্রুত বেড়ে ওঠা গিগ অর্থনীতি (Gig Economy) বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করলেও, সেখানে আয়ের নিশ্চয়তা নেই। উল্টে আর্থিক নিরাপত্তার অভাবের সঙ্গে রয়েছে ঋণ পাওয়ার জটিলতা। আর্থিক সমীক্ষা ২০২৫–২৬ (Economic Survey 2025–26) স্পষ্ট করে জানিয়েছে—গিগ কর্মীদের বড় অংশ এখনও প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে রয়ে গিয়েছেন।
রবিবার সাধারণ বাজেট (budget 2026) পেশ হবে। তার আগে বৃহস্পতিবার সংসদে আর্থিক সমীক্ষা পেশ হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, গত চার বছরে ভারতে গিগ কর্মীর সংখ্যা ৫৫ শতাংশ বেড়ে ৭৭ লক্ষ (FY21) থেকে ১ কোটি ২০ লক্ষে (FY25) পৌঁছেছে। বর্তমানে দেশের মোট শ্রমশক্তির ২ শতাংশেরও বেশি মানুষ গিগ অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত। আগামী ২০২৯–৩০ সালের মধ্যে কৃষি-বহির্ভূত কর্মসংস্থানের প্রায় ৬.৭ শতাংশ এই গিগ খাত থেকেই আসতে পারে বলে পূর্বাভাস সমীক্ষার।
কোথায় বেশি গিগ কর্মী?
গিগ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে ই-কমার্স ও লজিস্টিকস ক্ষেত্রই সবচেয়ে বড় নিয়োগকারী। ই-কমার্সে যুক্ত প্রায় ৩৭ লক্ষ কর্মী। লজিস্টিকসে কাজ করছেন প্রায় ১৫ লক্ষ কর্মী। এছাড়া দক্ষতার ভিত্তিতেও এই ক্ষেত্রে স্পষ্ট বিভাজনের কথা বলেছে সমীক্ষা। ২০৩০ সালের মধ্যে উচ্চ দক্ষ কর্মী হবেন প্রায় ২৭.৫ শতাংশ। কম দক্ষ কর্মী থাকবেন প্রায় ৩৩.৮ শতাংশ।
আয়ের অনিশ্চয়তা ও ঋণ সংকট
সমীক্ষার সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হল গিগ কর্মীদের আয়ের স্থায়িত্ব নেই। বেশিরভাগ গিগ কর্মীরই নিয়মিত বেতন বা নির্দিষ্ট আয়ের প্রমাণ নেই। ফলে ব্যাঙ্ক বা এনবিএফসি-র কাছে তাঁদের ক্রেডিট প্রোফাইল বলে কিছু নেই। অর্থাৎ ঋণযোগ্যতা যাচাই করাই কঠিন হয়ে পড়ে। এর ফলেই বহু কর্মী বাধ্য হচ্ছেন উচ্চ সুদের ঘরোয়া ঋণের দিকে ঝুঁকতে।
সমীক্ষা বলছে, প্রায় ৪০ শতাংশ গিগ কর্মীর মাসিক আয় ১৫ হাজার টাকারও কম। এই অনিশ্চিত আয়ের কারণেই গাড়ি, বাড়ি বা ছোট ব্যবসার জন্য ঋণ পাওয়াও কার্যত অসম্ভব হয়ে উঠছে।
অ্যালগরিদমের নিয়ন্ত্রণে কাজ
আর্থিক সমস্যার পাশাপাশি সমীক্ষা আরও একটি বড় ঝুঁকির কথা তুলে ধরেছে। তা হল, অ্যালগরিদম-নির্ভর প্ল্যাটফর্ম নিয়ন্ত্রণ। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলিতে কাজ বণ্টন, পারফরম্যান্স মূল্যায়ন, মজুরি নির্ধারণ ইত্যাদি সবই হচ্ছে অ্যালগরিদমের মাধ্যমে। এতে স্বচ্ছতার অভাব, পক্ষপাতিত্বের আশঙ্কা এবং কর্মীদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তি। অনিশ্চিত আয়, দীর্ঘ সময় কাজ এবং অ্যাপের মাধ্যমে সারাক্ষণ নজরদারির চাপ গিগ কর্মীদের উপর বাড়ছে।
কমছে বেস পে, বাড়ছে চাপ
সমীক্ষার প্রেক্ষাপটে উল্লেখযোগ্য যে, সম্প্রতি খাদ্য ও গ্রসারি ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মগুলিতে আগে যেখানে প্রতি অর্ডারে বেস পে ছিল প্রায় ৬০ টাকা, এখন তা নেমে এসেছে প্রায় ১৫ টাকায়। উৎসব বা পিক আওয়ার ইনসেনটিভ দিয়ে সাময়িক স্বস্তি মিললেও, কর্মীদের অভিযোগ—এর আড়ালে প্রকৃত আয় ক্রমশ সঙ্কুচিত হচ্ছে।
শ্রম সুরক্ষা ও বাজেটের দিকে তাকিয়ে গিগ কর্মীরা
গিগ কর্মী সংগঠনগুলির দাবি, ইনসেনটিভ নয়—ন্যূনতম মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা এবং স্পষ্ট শ্রম আইন ছাড়া এই ক্ষেত্র টেকসই হবে না। অনেক নেতার মতে, বর্তমান পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বাধ্যতামূলক শ্রমের মতো অবস্থার দিকেই এগোচ্ছে।
ইকোনমিক সার্ভে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—গিগ অর্থনীতি ভারতের কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ হলেও, কর্মীদের আয়, ঋণ ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না করলে এই বৃদ্ধির ভিতটাই দুর্বল থেকে যাবে। এখন নজর আগামী বাজেটের (Budget 2026) দিকে—সরকার এই ‘নতুন শ্রমশক্তি’র জন্য কী ব্যবস্থা নেয়, সেটাই দেখার।