আর জল্পনা নয়, লন্ডনে মহম্মদ ইউনুস ও তারেক জিয়ার বৈঠক হচ্ছে (Md Yunus & Tarek Zia would be in London) । ১৩ জুন শুক্রবার ইউনুস লন্ডন থেকে দেশের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে তারেকের সঙ্গে তাঁর কথা হবে।

শেষ আপডেট: 10 June 2025 13:27
আর জল্পনা নয়, লন্ডনে মহম্মদ ইউনুস ও তারেক জিয়ার বৈঠক হচ্ছে (Md Yunus & Tarek Zia would be in London) । ১৩ জুন শুক্রবার ইউনুস লন্ডন থেকে দেশের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে তারেকের সঙ্গে তাঁর কথা হবে।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী (Bangladesh interim government) সরকার গোড়ায় এই বৈঠকের বিষয়টি আড়াল করার চেষ্টা করলেও পরে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম (Shafiqul Alam, Press Secretary to Yunus) বলেছেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা এবং বিএনপির কার্যনির্বাহী চেয়ারম্যানের (BNP’s working chairman) বৈঠক হলে ভালই হয়।’ এরপরই সরকারি মহল থেকে নিশ্চিত করা হয় দু’জনের বৈঠক হতে যাচ্ছে। সরকারের তরফেই বৈঠকটির ব্যাপারে আগ্রহ দেখানো হয় হলে খবর।
ইতিমধ্যে এই বৈঠক নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির উত্তাপ চড়তে শুরু করেছে। সব দলেই বৈঠকটি নিয়ে কৌতূহল তুঙ্গে। তবে নানা সুত্রে জানা যাচ্ছে, বিএনপি নেতৃত্ব বৈঠকের পরিণতি নিয়ে চিন্তিত। একাধিক নেতা ইউনুস-তারেক বৈঠক চাননি। মনে করা হচ্ছে, তারেক জিয়ার দেশের ফেরার বিষয়টিকে হাতিয়ার করে সরকার প্রবল চাপ প্রয়োগ করে বিএনপি-র কার্যনির্বাহী চেয়ারম্যানের উপর। দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত তারেক চিকিৎসার জন্য দেড় দশক আগে দেশ ছেড়ে লন্ডনে যাওয়ার সময় মুচলেকা দেন আর রাজনীতিতে ফিরবেন না। তখন থেকে লন্ডনে রাজনৈতিক নির্বাসনে আছেন তিনি। মুচলেকাকে হাতিয়ার করে সরকার তারেকের প্রত্যাবর্তন দিতে পারে। ফলে ইউনুসের সঙ্গে বৈঠকের প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত ফেরানো সম্ভব হয়নি বিএনপির কার্যনির্বাহী চেয়ারম্যানের।
১৩ জুনের একান্ত বৈঠকের সিদ্ধান্ত তাঁর অংশ নেওয়া উচিত হবে কি না সে বিষয়ে সোমবার রাতে ভার্চুয়াল মাধ্যমে ঢাকায় স্থায়ী কমিটির সদস্যদে জরুরি বৈঠকে ডেকে মতামত চান তারেক জিয়া। নেতারা নানা শর্ত ও সতর্কতার বিষয়ে তারেককে পরামর্শ দেন। তাঁদের বক্তব্য, প্রধান উপদেষ্টার মতো ব্যক্তির আমন্ত্রণ ফেরানো ঠিক হবে না। তবে তাঁর অন্যায্য প্রস্তাবে যেন সায় না দেন তারেক। বিএনপি শর্ত দিয়েছে বৈঠকে নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান যেন না থাকেন। খালেদা জিয়ার দল খলিলুরকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। সরকারি সুত্রের খবর, বিএনপি-র দাবি মতো খলিলুর বৈঠকে থাকবেন না, জানিয়েছে প্রধান উপদেষ্টার অফিস।
লন্ডনে কী বিষয়ে আলোচনা হবে ইউনুস-তারেকের? জানা যাচ্ছে মূল আলোচ্য দুটি। এক. নির্বাচনে জামাত ও এনসিপি’র সঙ্গে বিএনপি’র আসন সমঝোতা। দুই. জুলাই সনদ। এই দুটি ইউনুসের অগ্রাধিকার। অন্যদিকে, তারেক জিয়া চলতি বছরের ডিসেম্বরে ভোটের দাবিতে অনড় থাকবেন। সরকার আগামী বছর এপ্রিলে ভোট চাইছে। লক্ষণীয়, তারেকের সঙ্গে নির্বাচন নিয়ে আলোচনার কথা থাকলেও ইউনুস ভোটের সম্ভাব্য সময় সম্পর্কে তারেকের অভিমত শোনার তাগিদ দেখাননি। কুরবানির ইদের আগের দিন জাতির উদ্দেশে ভাষণে জানিয়ে দিয়েছেন, ভোট হবে এপ্রিলের গোড়ায়। তাৎপর্যপূর্ণ হল, এই সময় ভোট চেয়েছিল জামাতে ইসলামি।
বৈঠকে বিশদ আলোচনায় কোন কোন বিষয় আসতে পারে? জামাত ও ইউনুসের অনুগামী নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির সঙ্গে বিএনপি-র প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ বোঝাপড়া চান ইউনুস। জামাত ও এনসিপি-র একক শক্তিতে জাতীয় সংসদে তেমন একটা আসন পাওয়ার সম্ভাবনা কম। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ইসলামিক দলগুলিকে নিয়ে বোঝাপড়া গড়ে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছে জামাত ও এনসিপি। যাতে সংসদে তারা প্রধান বিরোধী শিবির হতে পারে। বিএনপি সম্মানজনক সংখ্যায় আসন ছেড়ে দিলে তবেই তা সম্ভব। জামাত-এনসিপি-র হয়ে দৌত্য করবেন ইউনুস। জামাত বিএনপির পুরনো বন্ধু। ২০০১-থেকে ২০০৬ পর্যন্ত দুই দল সরকার চালিয়েছে। সদ্য তৈরি দল এনসিপি-র বকলমে নেতা মহম্মদ ইউনুস।
ইউনুস-তারেক দ্বিতীয় আলোচ্য জুলাই ঘোষণাপত্র ও জুলাই সনদ। এরমধ্যে জুলাই ঘোষণাপত্র হল গত বছর সংঘঠিত তথাকথিত গণ অভ্যুত্থানের লক্ষ্য ও কর্মসূচি, যা অভ্যুত্থানের আগে ঘোষিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অভ্যুত্থান কোনও ঘোষণা দিয়ে হয়নি। কোটা বিরোধী আন্দোলন হাসিনা হটাও আন্দোলনে পরিণত হয় আচমকাই।
জুলাই ঘোষণাপত্রে কী থাকতে পারে? মনে করা হচ্ছে হাসিনা ও তাঁর তৎকালীন সরকারকে ফ্যাসিস্ট আখ্যা সেই সরকারকে উৎখাতের আহ্বান জানিয়ে মানুষকে পথে নামতে বলা হবে। ব্যাক ডেটে এই ঘোষণাপত্র জারি করা হবে। সেই ঘোষণাপত্রকে সংশোধিত নতুন সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি তুলেছে এনসিপি-জামাত।
ঘটনা হল, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১-এর ১০ এপ্রিল স্বাধীন বাংলা সরকারের জারি করা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি ২০১১ সাল থেকে বাংলাদেশের সংবিধানের অংশ। শেখ হাসিনার সরকার সংসদে সংবিধান সংশোধন প্রস্তাব এনে তা সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করেন। এনসিপি ও জামাত ৫ অগাস্টের গণঅভ্যুত্থানকে দ্বিতীয় স্বাধীনতা দিবস বলে ঘোষণা করেছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে একটি দেশের কি দুটি স্বাধীনতা দিবস থাকতে পারে। স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রের পর কীভাবে জুলাই ঘোষণাপত্র সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। খালেদা জিয়া, তারেক জিয়া-সহ গোটা বিএনপি পরিবারের সামনে এই প্রশ্ন রীতিমতো রাজনৈতিক সংকট হিসাবে দেখা দিয়েছে যে তারা জুলাই ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করে ’৭১-এর স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের অবমানমা মেনে নেবে কিনা।
অন্যদিকে, জুলাই সনদ হল নতুন সংবিধানে যে সব বিষয়কে জাতীয় নাগরিক পার্টি এবং জামাত অন্তর্ভুক্ত করতে চায়। সংবিধান সংশোধন কমিশন বাংলাদেশের ১৯৭২-এ চালু হওয়া বর্তমান সংবিধানের মূল চার ঘোষণা—জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতান্ত্রিক থেকে প্রথম তিনটি ছেঁটে ফেলার সুপারিশ করেছে। এছাড়া দেশটির সাংবিধানিক নাম ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ কথাটিও বাদ দিয়ে গণতন্ত্রী বাংলাদেশে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ বিদ্যামান সংবিধানে আল্লাহ-র পরই দেশবাসী তথা জনগণের যে প্রতি আস্থার যে উল্লেখ আছে তা রাখার পক্ষপাতী নয় কমিশন।
কমিশনের সুপারিশের অনেকগুলির সঙ্গেই বিএনপি-র দ্বিমত আছে। তারেক জিয়ার সঙ্গে বৈঠকে মহম্মদ ইউনুস বিএনপি-র কার্যনির্বাহী চেয়ারম্যানকে এই বিষয়গুলিতেই রাজি করানোর চেষ্টা চালাবেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলের অনেকেই মনে করছেন, বিএনপি-র এখন শাঁখের করাতের অবস্থা। সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে দল। কারণ, ইউনুসের প্রস্তাবের বিরোধিতা করলে বিএনপিকে স্বৈরাচারি বলার পাশাপাশি তাদের নেতা-কর্মীদেরও জেলে পোরা অসম্ভব নয়। অন্যদিকে, প্রস্তাবে রাজি হলে বিএনপি তাদের রাজনৈতিককেই অস্বীকার করবে। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের আলোকেই যুদ্ধে অংশ নেন বিএনপি-র প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। বিএনপি এমনও দাবি করে তিনিই স্বাধীনতার ঘোষক। যদিও তথ্য উপাত্য থেকে স্পষ্ট স্বাধীনকার ডাক দেন শেখ মুজিবুর রহমান। সেনা অফিসার জিয়াউর রহমান বার্তাটি পাঠ করেছিলেন মাত্র। সে সব পুরনো বিতর্ক ছাপিয়ে বিএনপির এখন না ঘরকা না ঘটকা অবস্থা। ইউনুস-তারেক বৈঠক বিএনপির অতীত ও ভবিষ্যৎ দুই-ই ওলটপালট করে দিতে পারে। সেক্ষেত্রে নির্বাচনের জন্য অনন্ত কাল অপেক্ষা করতে হতে পারে বিএনপিকে।