
সংগৃহীত ছবি
শেষ আপডেট: 16 December 2024 00:24
সুজিত রায় নন্দী
মহান বিজয় দিবস বাঙালি জাতির ইতিহাসে সর্বোচ্চ অর্জন, আত্মগৌরব ও অহংকারের দিন। এই বিজয় কিন্তু একদিনে আসেনি। স্বাধীনতাও হঠাৎ করে ঘোষণা হয়নি। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালি জাতি দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে এই বিজয় ছিনিয়ে আনে।
বাঙালি জাতির ইতিহাস হাজার বছরের নির্যাতন নিপীড়ন আর পরাধীনতার ইতিহাস। সেই ইতিহাসের পরিসমাপ্তি ঘটার কথা ছিল ৪৭-এর ব্রিটিশ ভারত বিভাজনের মধ্য দিয়ে। কিন্তু তা হল না। দ্বিজাতি- তত্ত্বের ষড়যন্ত্রের বেড়াজালে নিষ্পেষিত হল বাঙ্গালির স্বপ্ন। ব্রিটিশ ভারত আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা বঙ্গবন্ধু হতাশ হলেন না। শুধু নির্যাতনের হাত বদল হয়েছিল ব্রিটিশ থেকে পাকিস্তান।
পূর্ব বাংলাকে নিয়ে পাকিস্তান নামে একটি অসম রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। তখন থেকেই পাকিস্তান শাসক গোষ্ঠী বাঙালির ওপর চেপে বসে এবং শাসন, শোষণ ও নির্যাতনের স্টিম রোলার চালায়। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম এবং আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের হাত থেকে ভারতীয় উপমহাদেশ স্বাধীন হলেও এই ভুখণ্ডের বাঙালির স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার আসেনি। বঙ্গবন্ধু নতুনভাবে নিজেকে শাণিত করার লগ্নে বাংলায়, বাংলার মানুষের উপর অকৃত্রিম ভালবাসা আর দেশপ্রেমের মহা জাগ্রতিক শক্তি ছড়িয়ে দিলেন।
ধারাবাহিক আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জাতির পিতার বলিষ্ঠ ও আপোষহীন নেতৃত্বে বাঙালি জাতি বায়ান্ন’র ভাষা আন্দোলন, বাষট্টি’র শিক্ষা আন্দোলন, ছেষট্টি’র ৬-দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত হয়ে ওঠে। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লিগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। এই বিজয় বাঙালি জাতিকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে মুক্তি সংগ্রামের দিকে। জাতির পিতা অনুধাবন করেছিলেন স্বাধীনতা অর্জন ছাড়া বাঙালি জাতির ওপর অত্যাচার, নির্যাতন ও বঞ্চনার অবসান হবে না। তাই তিনি ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানের জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা দেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ মূলত সেদিন থেকেই শুরু হয় স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত অধ্যায়। বঙ্গবন্ধুর ডাকে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। চলে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালো রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আধুনিক অস্ত্রসস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বাঙালি জাতির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে। এরই প্রেক্ষাপটে ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। শুরু হয় রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ। ৭০-এর নির্বাচনে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে ১০ এপ্রিল গঠিত হয় মুজিব নগর সরকার। বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপ-রাষ্ট্রপ্রতি এবং তাজউদ্দিন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সাংবিধানিক সরকার গঠন করা হয়। এই সরকারের অধীনে পরিচালিত দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। এই বিজয় অর্জনে মধ্য দিয়ে বিশ্বের মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের।
মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহিদের আত্মত্যাগ আর দুই লাখ মা-বোনের ত্যাগ-তিতিক্ষায় এই বিজয় অর্জিত হয়। কোটি বাঙালির আত্মনিবেদন ও গৌরবগাঁথা গণবীরত্বে পরাধীনতার অভিশাপ থেকে মুক্তি পায় বাঙালি জাতি।
বাঙালির এই মুক্তিযুদ্ধে পাশে দাঁড়ায় প্রতিবেশী দেশ ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়নসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রগতিশীল রাষ্ট্রের সরকার ও মুক্তিকামী মানুষ। বাঙালি জাতির এই অর্জন বিশ্ব ইতিহাসে অবিস্মরণীয় ও মহান গৌরবের।
গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। স্মরণ করি জাতীয় চার নেতা, ত্রিশ লাখ শহিদ এবং দুই লাখ নির্যাতিত মা-বোনকে, যাঁদের অসামান্য আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীন বাংলাদেশ, তাদের প্রতিও শ্রদ্ধা।
বহু ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সকলে মিলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রিয় মাতৃভূমিকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলায় পরিণত করতে হবে। মহান বিজয় দিবসে এটাই প্রত্যাশা। ব্যক্তি মুজিবকে হত্যা করা গেলেও আদর্শিক মুজিবকে হত্যা করা যাবে না। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ চিরন্তন। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ একে অপরের পরিপূরক।
কবি অন্নদাশঙ্কর রায়ের কবিতার সেই লাইনগুলি স্মরণ করি--
'যতদিন রবে পদ্মা যমুনা
গৌরী মেঘনা বহমান,
ততকাল রবে কীর্তি তোমার
শেখ মুজিবুর রহমান
দিকে দিকে আজ অশ্রুগঙ্গা
রক্তগঙ্গা বহমান
তবু নাই ভয় হবে হবে জয়
জয় মুজিবুর রহমান।' জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।
লেখক বাংলাদেশ আওয়ামী লিগের সাংগঠনিক সম্পাদক। মতামত ব্যক্তিগত।