মাঠ ময়দানে রাজনীতিতে আওয়ামী লিগ সেভাবে না থাকায় এবং তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকার কেড়ে নেওয়ায় হিন্দু ভোটারদের মন পেতে ঝাঁপিয়েছে জামায়াতে ইসলামি ও বিএনপি। তবে তুলনামূলকভাবে জামাত বেশি সক্রিয়।

কৃষ্ণ নন্দী
শেষ আপডেট: 4 December 2025 10:43
বাংলাদেশে (Bangladesh) যে সংসদীয় আসনগুলিতে হিন্দুদের ভোটে হার-জিত নির্ধারিত হয়, খুলনা-১ (Khulna-1) তার মধ্যে অন্যতম। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এখানে কৃষ্ণ নন্দীকে (Krishna Nandi) প্রার্থী করল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামি (Jamat)। এই প্রথম উগ্র ইসলামিক মতাদর্শে বিশ্বাসী দলটি একজন সংখ্যালঘুকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী করল। কৃষ্ণ নন্দী অবশ্য বহুদিন ধরেই জামাতের সঙ্গে যুক্ত। ডুমুরিয়া উপজেলা জামায়াতের হিন্দু কমিটির সভাপতি।
খুলনা-১ আসনটি আওয়ামী লিগের (Awami League) শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। একবার মাত্র সেখানে বিএনপি প্রার্থী (BNP Candidate) জয়ী হয়েছিলেন। ১৯৯৬ সালের ওই কেন্দ্রে বিজয়ী হন আওয়ামী লিগের সভাপতি শেখ হাসিনা। মাস দুই আগে শেখ হাসিনা ভার্চুয়াল মাধ্যমে দলের বিজয়া সম্মিলনীর একাধিক অনুষ্ঠানে অংশ নেন। সেই তালিকায় প্রথম দুটি নাম ছিল দাকোপ ও বটিয়াঘাটা। এই দুই এলাকার ভার্চুয়াল সভায় দলের হিন্দু-কর্মী সমর্থকেরা সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় যোগদান করেন। দাকোপ ও বটিয়াঘাটার হিন্দু জনগোষ্ঠীর সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণেই খুলনা এক আসনটি আওয়ামী লিগের শক্ত ঘাঁটি।
মাঠ ময়দানে রাজনীতিতে আওয়ামী লিগ সেভাবে না থাকায় এবং তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকার কেড়ে নেওয়ায় হিন্দু ভোটারদের (Hindu Voters) মন পেতে ঝাঁপিয়েছে জামায়াতে ইসলামি ও বিএনপি। তবে তুলনামূলকভাবে জামাত (Jamat) বেশি সক্রিয়। ঢাকা সহ একাধিক শহরে দলটি হিন্দুদের নিয়ে সভা সমিতি করেছে। মনে করা হচ্ছে হিন্দু সম্প্রদায়কে বার্তা দিতেই খুলনা-১ আসনে কৃষ্ণ নন্দীকে প্রার্থী করল দল।
জামায়াতে ইসলামি প্রথমে ওই কেন্দ্রে দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতা মাওলানা আবু ইউসুফকে প্রার্থী করেছিল। এখন প্রার্থী বদলে কৃষ্ণ নন্দীকে টিকিট দেওয়া হয়েছে। জামায়াতে ইসলামির আমির শফিকুর রহমান খুলনায় গিয়ে দুজনকে মুখোমুখি বসিয়ে নতুন প্রার্থী বদলের বিষয়টি চূড়ান্ত করে দিয়ে যান। কৃষ্ণ নন্দীর কথায়, 'বুধবার জামায়াতের আমির আমাদের দুজনকে বুকে বুক মিলিয়ে দিয়ে গেছেন। ইউসুফ ভাই নিজেই আমার জন্য প্রচারে নেমেছেন। তাছাড়া জামায়াতের মধ্যে আমাকে প্রার্থী করা নিয়ে কোনও দ্বন্দ্ব নেই।’

বাংলাদেশের জামাতের প্রথম হিন্দুপ্রার্থী কে এই কৃষ্ণ নন্দী?
মাঝ বয়সি এই ব্যক্তি পেশায় ব্যবসায়ী। তিনি খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর গ্রামের বাসিন্দা। ওই গ্রামে তাঁর জন্মস্থান। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে (MukhiJuddo) পাকিস্তানি সেনার (Pakistan Army) হিন্দু নিধনের এক কালো অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে চুকনগরের নাম। এই গ্রামে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ১২ হাজার হিন্দু বাসিন্দাকে নির্বিচারে হত্যা করেছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। বাংলাদেশের প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসির মামুনের 'চুকনগরের হত্যাকাণ্ড' বইটিতে চোখ বোলালে কসাইও চোখের জল ধরে রাখতে পারবে না। শত শত মানুষের সঙ্গে কথা বলে তিনি হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেছেন।
খুলনা জেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইটে চুকনগরকে 'বদ্ধভূমি' হিসেবে উল্লেখ করে লেখা হয়েছে, 'বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধই নয়, পৃথিবীর ইতিহাসে জঘন্যতম যেসব গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে, সেগুলির মধ্যে একটি চুকনগর গণহত্যা। ১৯৭১ সালের ২০ মে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে খুলনার ডুমুরিয়ার ছোট শহর চুকনগরে পাকিস্তানি বর্বর সেনারা নির্মম এ হত্যাকান্ড ঘটায়। অতর্কিত এ হামলা চালিয়ে মুক্তিকামী ১০-১২ হাজার মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করে তারা। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনারা যে নির্মম অত্যাচার, নিরযাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, তারও এক নীরব সাক্ষী হয়ে আছে আজকের চুকনগর। ওই দিন যাদের হত্যা করা হয়েছে, তাদের বেশিরভাগ পুরুষ হলেও বহু নারী ও শিশুকেও হত্যা করে পাকিস্তানি সেনারা।
পাকিস্তানি বাহিনীর অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে দক্ষিণাঞ্চলের জনগোষ্ঠী বাঁচার তাগিদে ভারতে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়। মে মাসের মাঝামাঝি সময় বৃহত্তর খুলনার বাগেরহাট, রামপাল, মোড়েলগঞ্জ, কচুয়া, শরণখোলা, মংলা, দাকোপ, বটিয়াঘাটার মানুষ ভারতে যেতে ট্রান্সলেট হিসেবে চুকনগরকে বেছে নিয়েছিলেন। খবর পেয়ে পাচ্ছেন না সেখানে গিয়ে হত্যাকাণ্ড চালায়। বলা হয় পাকিস্তানিদের খবর দিয়েছিল জামায়াতে ইসলামি ও তাদের সহযোগী সংগঠন রাজাকার, আল বদর ও আল-শামসের নেতারা। স্বাধীনতার যুদ্ধের বিরোধিতা করে জামায়াতে ইসলামি সরাসরি পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল। তারা পাক সেনাদের হয়েও যুদ্ধ সহযোগিতা করে। আজ পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামি তাদের সেই কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চায়নি। সেই চুকনগরের ভূমিপুত্র কৃষ্ণ নন্দী জামায়াতে ইসলামির প্রাপ্তি হওয়ায় খুলনা এক আসন নিয়ে বাড়তি কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
কৃষ্ণ নন্দী ২০০৫ থেকে জামায়াতে ইসলামির সঙ্গে যুক্ত। তাঁর বক্তব্য, 'জামাত একটি নীতিনিষ্ঠ, পরিছন্ন রাজনৈতিক দল।' দলটি হিন্দু বিরোধী নয় বলেও কৃষ্ণ নন্দীর দাবি। জানা গিয়েছে, স্থানীয় এই ব্যবসায়ী একসময় আওয়ামী লিগে ছিলেন। এলাকার নেতৃত্বের সঙ্গে গোলমালের জেরে ২০০৫ সালে তিনি জামায়াতে ইসলামিতে যোগ দেন।