বাংলাদেশের জন্ম কোনও আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি ছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, অসীম আত্মত্যাগ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার ফসল।

শেষ আপডেট: 16 December 2025 10:03
বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ ও মহান বিজয় দিবস—এগুলো কোনও বিচ্ছিন্ন শব্দ নয়; এগুলো ইতিহাসের এক মহাকাব্যিক ও অবিচ্ছেদ্য সত্ত্বা। একটি ছাড়া অন্যটির অস্তিত্ব কল্পনাতীত। বঙ্গবন্ধু ছাড়া বাংলাদেশের জন্ম অসম্ভব, বাংলাদেশ ছাড়া মহান বিজয় দিবস অর্থহীন, আর মহান বিজয় দিবস ছাড়া বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অর্জিত মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণতা অনুধাবন অসম্পূর্ণ।
বাংলাদেশের জন্ম কোনও আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি ছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, অসীম আত্মত্যাগ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার ফসল। ভাষা আন্দোলন থেকে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ছয় দফা থেকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ—এই দীর্ঘ পথচলার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন ইতিহাসের মহানায়ক, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি, আত্মপরিচয় ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে নেতৃত্বে রূপ দিয়েছিলেন।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাঙালি জাতি অর্জন করে হাজার বছরের কাঙ্ক্ষিত বিজয়। এই বিজয় কেবল ভৌগোলিক স্বাধীনতা নয়; এটি ছিল ভাষা, সংস্কৃতি, আত্মমর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের বিজয়। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ ছিল স্বাধীনতার দিকনির্দেশক অগ্নিঝরা ঘোষণা। তাঁর আপসহীন নেতৃত্ব ও জনগণের প্রতি অগাধ বিশ্বাসই বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ করে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুপ্রাণিত করেছিল।

কিন্তু স্বাধীনতার চুয়ান্ন বছর পর আজ বাংলাদেশ এক গভীর আদর্শিক সংকটের মুখোমুখি। স্বাধীনতাবিরোধী চক্র—রাজাকার, আলবদর ও তাদের উত্তরসূরিরা—পরিকল্পিতভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করছে। বঙ্গবন্ধুর অবদানকে ধ্বংস করা, মুক্তিযোদ্ধাদের অবমাননা, জাতীয় সংগীত ও জাতীয় পতাকার মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এগুলো রাষ্ট্রীয় চেতনাকে ধ্বংস করার সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। ইতিহাস বিকৃতি আজ সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্রে পরিণত হয়েছে, যার মাধ্যমে পুরো মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর মব সন্ত্রাস চালানো হচ্ছে। নিষিদ্ধ করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে।
বঙ্গবন্ধুকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশকে বোঝার চেষ্টা করা নদী ছাড়া মোহনার ব্যাখ্যার মতোই বিপজ্জনক। পাঠ্যবই, গণমাধ্যম ও সামাজিক পরিসরে যখন সত্য আড়াল করা হয়, তখন নতুন প্রজন্ম ধীরে ধীরে তার শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে—যা জাতির ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তোলে।
মহান বিজয় দিবস তাই কেবল আনুষ্ঠানিক উৎসব নয়; এটি আত্মত্যাগ, রক্ত ও অদম্য সাহসের স্মারক। এটি শপথের দিন—মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রক্ষা, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ এবং স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকার শপথ। কারণ বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ, বাংলাদেশ মানেই মুক্তিযুদ্ধ, আর মুক্তিযুদ্ধ মানেই মহান বিজয় দিবসের অমর চেতনা।
আজ আরও স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান—ইউনুস, স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার ও পাকিস্তানি অপশক্তির যোগসাজশে নিষিদ্ধ জঙ্গি শক্তিকে ব্যবহার করে বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনা মুছে ফেলার গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। লক্ষ্য একটাই—বাংলাদেশকে দুর্বল ও জঙ্গি-প্রবণ রাষ্ট্রে পরিণত করা এবং বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যার মাধ্যমে সেই পথ সুগম করা। কিন্তু আল্লাহ পাক শেখ হাসিনাকে রক্ষা করেছেন। ইতিহাস সাক্ষী—দেশ ও জাতি বিরোধী চক্রান্তকারীদের পতন অনিবার্য, আর বাংলার জনগণ সবসময়ই এসব অপশক্তিকে প্রতিহত করেছে।
বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা নন; তিনি সাহস, সততা ও আদর্শের প্রতীক। চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি জাতিকে স্বপ্ন দেখান এবং তা বাস্তবায়নে নিরলস পরিশ্রম করেন। জনগণের আবেগ ও অনুভূতিকে বেয়নেট দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে আওয়ামী লিগকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে চায়। তারা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার, গণমতকে বিভ্রান্ত করার এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে অচল করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এটি কেবল রাজনৈতিক ছল নয়; এটি মূলত ইতিহাসের, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের এবং গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে পরিচালিত সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে পরিণত করতে হলে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই শান্তি মানবতা সাম্য ও সম্প্রতি বজায় রাখাই হবে মহান বিজয় দিবসের শপথ।
লেখক
সাংগঠনিক সম্পাদক
বাংলাদেশ আওয়ামী লিগ
মতামত ব্যক্তিগত