অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের বৈঠকে আচমকা ভূল স্বীকার করে প্রতিশ্রুতি দিলেন বিএনপি নেতা তারেক রহমান। কেন হঠাৎ সেনা-প্রীতি দেখাচ্ছেন তিনি? রাজনৈতিক কৌশল না কি অন্য কিছু, উত্তর খুঁজছে রাজনৈতিক মহল।

বিএনপির কার্যনির্বাহী চেয়ারম্যান তারেক জিয়া
শেষ আপডেট: 10 December 2025 12:38
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাংলাদেশে সেনা বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত শতাধিক কর্তার সঙ্গে বৈঠক করেছেন বিএনপির কার্যনির্বাহী চেয়ারম্যান তারেক জিয়া। মঙ্গলবার রাতে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে লন্ডন থেকে ভার্চুয়াল মাধ্যমে যুক্ত হয়ে তারেক জিয়া অবসরপ্রাপ্ত অফিসারদের সুখ-দুঃখের কথা শোনেন। সকলের সামনেই এক অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্তার কাছে তারেক তাঁর অতীত কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চান, দুঃখপপ্রকাশ করেন। বারে বারে উল্লেখ করেন বিএনপি এবং তাঁদের পরিবারের সঙ্গে সেনা বাহিনীর আন্তরিক ও মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্কের কথা। স্মরণ করেন, সেনাকুঞ্জেই কেটেছে তাঁর শৈশব, কৈশোর।
সেই অনুষ্ঠানেই তিনি জানান, গত ২১ নভেম্বর ঢাকার সেনাকুঞ্জের অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে থেকেই তাঁর মা খালেদা জিয়া অসুস্থ ছিলেন। সেনা দিবসের অনুষ্ঠান বলেই চিকিৎসকদের আপত্তি অগ্রাহ্য করে তিনি সেখানে যান। দু’দিন পর গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তারেক বলেন, মা মনের জোরে সেনাকুঞ্জের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন। এর থেকেই বোঝা যায়, জিয়া পরিবার সেনা বাহিনীকে কী চোখে দেখে। ভার্চুয়াল বৈঠকে তারেক আশ্বাস দেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে সেনার কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত অফিসাদের সুযোগ সুবিধা অনেক বৃদ্ধি করা হবে।
তারেক জিয়ার হঠাৎ করে সেনা বাহিনী এবং অবসরপ্রাপ্ত সেনাদের খুশি করার এই চেষ্টার পিঠনে অনেকেই তাঁর দেশের ফেরার সম্ভাবনার অঙ্ক মিলিয়ে দেখছেন। আজ বুধবার বিকালে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নির্ঘণ্ট প্রকাশ করার কথা। তারেক জিয়ার এই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা। প্রার্থী তালিকায় তাঁর নাম আছে। কিন্তু এখনও তিনি দেশে ফেরেননি। এমনকী মা খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়লেও তারেক লন্ডনেই আছেন।
মঙ্গলবার রাতে তাঁর অবসরপ্রাপ্ত সেনা অফিসারদের সঙ্গে বৈঠক এবং তাঁদের খুশি করার চেষ্টার মধ্যে অনেকেই তারেকের দেশের ফেরার সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন। মঙ্গলবারের সভায় সেই অফিসারদেরই ডাকা হয়েছিল যারা ২০০৮ সালে তারেক লন্ডনে চিকিৎসা করাতে যাওয়ার সময় বাংলাদেশ সেনা বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। সেই সময় সেনা বাহিনীর সঙ্গে তারেক-সহ জিয়া পরিবারের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল। দেশ ছাড়ার পর আর রাজনীতি করবেন না বলে সেনা বাহিনীর কাছে তিনি মুচলেকা দিয়ে দেশ ছাড়েন বলে একাধিক মহলের দাবি। দুর্নীতির মামলায় তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাঁকে গ্রেফতারের পর সেনা হেফাজতে তাঁর উপর শারীরির ও মানসিক নির্যাতন হয় বলে অভিযোগ। এই অভিযোগ নিয়ে সেনা বাহিনী তারেকের উপর বেজায় চটে আছে। বিএনপি সূত্রের খবর, বিক্ষুব্ধ সেনাকর্তারা এখন বাহিনীতে না থাকলেও তারেক তাঁদের দিক থেকে অমঙ্গলের আশঙ্কা করছেন। বাংলাদেশে তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে বিএনপি নেতা নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না।

রাজনৈতিক মহলের খবর, দেশে ফিরতে তারেকের আইনি বাধা না থাকলেও তিনি আসলে অবসরপ্রাপ্ত সেনাদের নিয়েই বেশি চিন্তিত। এখন অবসর জীবনে থাকা সেই অফিসারদের অনেকের সঙ্গেই তারেকের সম্পর্ক ব্যক্তিগত রেষারেষিতে গিয়ে পৌঁছেছিল। মনে করা হচ্ছে বিএনপি নেতা সেই ক্ষতে মলম দিতেই এই বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল।
বৈঠকে তারেক জিয়া একজন অফিসারের কাছে প্রকাশ্যেই দুঃখপ্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘স্ক্রিনে এখানে আমি একজনকে দেখতে চাইছি। এটা একান্ত পার্সোনাল ব্যাপার। তারপরেও আমি একটু এখানে উল্লেখ করতে চাইছি। আমাদের সামনে এখানে আম্মার (খালেদা জিয়া) সময় উনি ডিজি এসএসএফ ছিলেন রুমি সাহেব। রুমি সাহেব উপস্থিত আছেন।’ তখন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের সারিতে থাকা সৈয়দ ফাতেমী আহমেদ রুমি জবাব দেন, ‘জি আছি।’
তারেক বলেন, ‘রুমি সাহেব আপনার নিশ্চয় মনে আছে যে একটা মিছিল হয়েছিল একবার, সেই পুরান ঢাকা থেকে আমিন বাজারে এবং পুরা মিছিলটা আমি হেঁটে এসেছিলাম, আম্মাও (খালেদা জিয়া) ছিলেন সেই মিছিলে। তো সেই মিছিলে অনেক ভিড় হট্টগোল। আপনি আমাকে একটা কোনও কিছু বলেছিলেন। আই অ্যাম ভেরি সরি, আমি সেদিন আপনার সঙ্গে একটু রূঢ় ব্যবহার করেছিলাম। সবকিছু মিলে আই অ্যাম ভেরি সরি ফর দ্যাট। আমি অনেক দিন চেষ্টা করেছি আপনাকে রিচ করার জন্য। আই রিকোয়েস্ট মাই অ্যাপোলজি। আমি সুযোগ পাইনি। আজকে সুযোগ পেয়েছি। আই অ্যাম রিয়েলি সরি ফর দ্যাট।’
এ সময় জবাবে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল সৈয়দ ফাতেমী আহমেদ রুমি বলেন, ‘আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ থাকব। যেটা বলেছেন থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ, আই উইল রিমেম্বার ইট।’ যদিও সেনা সূত্রের খবর, সৈয়দ ফাতেমী আহমেদ রুমি বিএনপির ঘনিষ্ঠ অফিসার হিসাবেই বাহিনীতে পরিচিত ছিলেন। তাঁদের পরিবারও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। রুমি সাহেবের ভাই অথবা দাদা বিএনপি-র এমপি ছিলন। অনেকেই মনে করছেন, এমন একজন অফিসারকে তারেকের খুঁজে না পাওয়ার কথা নয়। আসলে সকলের সামনে ভুল স্বীকার এবং ভালমানুষি করবেন বলেই মঙ্গলবার রাতের বৈঠকে তারেক ওই অফিসারের উদ্দেশে এসব কথা বলেন। তাঁর আসল উদ্দেশ্য সেনাবাহিনীর বর্তমান ও অবসরপ্রাপ্তদের খুশি করা।