সেনাবাহিনীর তৎকালীন ফাইলেও তারেক জিয়া সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুতর সমস্ত মন্তব্য রয়েছে। বর্তমান সেনাপ্রধান তাঁর উত্তরসূরীদের এই মূল্যায়ন তথা অবস্থানকে উপেক্ষা করতে চাইছেন না।
.jpg.webp)
ফাইল ছবি
শেষ আপডেট: 2 December 2025 10:29
সোমবার গভীর রাত থেকে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়েছে (Khaleda Zia Health Condition)। রবিবার থেকেই ভেন্টিলেশনে আছেন তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী (Bangladesh Ex PM)। ঢাকার এভার কেয়ার হাসপাতালে গত ২৩ নভেম্বর থেকে চিকিৎসাধীন বিএনপি (BNP) চেয়ারপারসন খালেদা। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর জন্য সরকারি নিরাপত্তার ব্যবস্থা প্রথম দিন থেকেই করা হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা আগে থেকেই সরকারি নিরাপত্তা পান।
এছাড়াও 'চেয়ারপারসন সিকিউরিটি' নামে বিএনপি'র একটি নিরাপত্তা উইং আছে। সেটির সদস্যরা বেসরকারি নিরাপত্তা এজেন্সির লোক। তারপরও সোমবার রাতে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে ভিভিআইপি বা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বলে ঘোষণার পাশাপাশি তাঁকে এসএসএফের নিরাপত্তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এসএসএফ বা স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে নিরাপত্তা দিয়ে থাকে। বর্তমানে তাঁরা প্রধান উপদেষ্টা নিরাপত্তায় নিয়োজিত।
সোমবার রাত থেকে এভার কেয়ার হাসপাতালে এসএসএফের কমান্ডোরা খালেদা জিয়ার (Khaleda Zia) নিরাপত্তার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তিনি এখন প্রধান উপদেষ্টার সমান নিরাপত্তা পাবেন। বাংলাদেশে এসএসএফ-কেই সবচেয়ে পেশাদার নিরাপত্তা বাহিনী বলে গণ্য করা হয়।
খালেদার নিরাপত্তা নিয়ে সোমবার রাতে অন্তর্বর্তী সরকার সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর থেকেই জল্পনা শুরু হয়েছে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে কেন এই বিশেষ মর্যাদা দিচ্ছে ইউনুস সরকার (Yunuss Govt)? এই সিদ্ধান্তের পেছনে তাদের বিশেষ কৌশলটি কী? অন্তর্বর্তী সরকার কি অন্য কোন বিষয়ে ভারসাম্য রক্ষা বা ব্যালান্স করার পথে হাঁটতেই এই দৃষ্টান্ত নিয়েছে?
প্রশ্নটি বাড়তি মাত্রা পেয়েছে তারেক জিয়া (Tarik Zia) দেশে ফিরতে না পারায়। লন্ডনের রাজনৈতিক আশ্রয় থাকা বিএনপির কার্যনির্বাহী চেয়ারপারসন তারেক মায়ের এমন সংকটময় মুহূর্তেও এখনও পর্যন্ত দেশে ফেরেননি। এই বিষয়ে শনিবার সকালে তারেকের ফেসবুক পোস্ট ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তোলপাড় শুরু হয়েছে। খালেদা পুত্র তথা বিএনপি'র সেকেন্ড ইন কমান্ড তাঁর পোস্টে লেখেন, দেশে ফেরা তাঁর একক সিদ্ধান্তের উপর নির্ভরশীল নয়।
এরপর থেকেই প্রশ্ন ঘুরতে শুরু করেছে, কে বা কাদের আপত্তিতে বিএনপি নেতা লন্ডনের নির্বাসন জীবন কাটিয়ে ফিরতে পারছেন না? বিশেষ করে মা খালেদা যখন মৃত্যুমুখে পতিত তখন কারা তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে আপত্তি তুলেছে, এই বিষয়টি নিয়ে জোর জল্পনা চলছে। বিএনপি তৃণমূলের নেতাকর্মীরা এই পরিস্থিতিতে প্রবল ক্ষুব্ধ। তাছাড়া তারেক এবং দলের ঘোষণা অনুযায়ী নভেম্বরেই বিএনপি'র কার্যনির্বাহী চেয়ারম্যানের দেশে ফিরে আসার কথা ছিল। কিন্তু তিনি ফেরেননি।
বিএনপির একাধিক সূত্র থেকে দাবি করা হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকার তারেকের দেশে ফেরা নিয়ে আপত্তি নেই বলে ঘোষণা করলেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনী মনে করছে তারেক জিয়া বাংলাদেশ এখনও নিরাপদ নন। তাঁকে নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব সেনাবাহিনী নিজেদের কাঁধে তুলে নিতে নারাজ।
দুর্নীতির মামলায় (CorruptionCase) সাজাপ্রাপ্ত তারেক ২০০৮ এ জামিনে মুক্ত হয়ে লন্ডন যাওয়ার আগে রাজনীতি করবেন না বলে মুচলেকা দেন, এমন প্রচার আছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে। মুচলেকাটি তিনি সেনাবাহিনীকে দিয়েছিলেন বলে একাধিক সূত্রের খবর। এখন সেনাবাহিনী সেই কারণেই বিএনপি নেতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এবং রাজনীতিতে অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়া নিয়ে দ্বিধায় আছে।
তারেকের আর এক সমস্যা হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ২০০৮ সালে তিনি দেশত্যাগের সময় বাংলাদেশের তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত এক গোপন বার্তায় বিএনপি'র এই নেতা সম্পর্কে ভয়ংকর রিপোর্ট দেন। তাতে তিনি তারেককে দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা এবং বাংলাদেশের সিন্ডিকেট রাজ, চাঁদাবাজির প্রধান কারিগর বলে উল্লেখ করেন। বিএনপি নেতাকে যাতে কোনদিনই আমেরিকায় প্রবেশের ভিসা না দেওয়া হয় সেই মর্মেও তখন সুপারিশ করেন ঢাকার মার্কিন রাষ্ট্রদূত। মনে করা হচ্ছে আমেরিকার আপত্তি উড়িয়ে তারেককে দেখে ফেরার অনুমতি দিতে নারাজ সেনাবাহিনী। কারণ ২০০৮ এ বিএনপি'র এই নেতা জামিনে মুক্ত হয়ে দেশ ছাড়ার সময় ক্ষমতায় ছিল সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার।
সেনাবাহিনীর তৎকালীন ফাইলেও তারেক জিয়া সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুতর সমস্ত মন্তব্য রয়েছে। বর্তমান সেনাপ্রধান তাঁর উত্তরসূরীদের এই মূল্যায়ন তথা অবস্থানকে উপেক্ষা করতে চাইছেন না। তাছাড়া মা খালেদা প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তারেক বাংলাদেশের সমান্তরাল প্রশাসন চালিয়েছেন বলে অভিযোগ। সেই সময় তাঁর অঙ্গুলি হেলনে বহু সেনা কর্মকর্তা অকালে চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন, অনেকে পদোন্নতি পাননি। অনেকেই মনে করছেন তারেকের নিরাপত্তা ঝুঁকির সেটাও একটা কারণ।
এই পরিস্থিতিতে বিএনপি নেতা কর্মীদের ক্ষোভ প্রশমনে ইউনুস সরকার খালেদা জিয়াকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে মনে করা হচ্ছে। সেই লক্ষ্যেই মুমূর্ষু সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে ভিভিআইপি ঘোষণা করে দেশের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা প্রদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।