এক ভিন্ন প্রেক্ষাপটে এ বছর ১৭ মার্চ তাঁর জন্মের ১০৬ বছর পূর্তি হবে। এই দিনটিকে কেন্দ্র করে দেশে হবে না কোনও সভা-সমাবেশ, গণমাধ্যমে প্রচারিত হবে না কোনও অনুষ্ঠান। আর কেউ যদি এমন কিছু করার চেষ্ঠা করেন তা হলে তাঁকে নির্ঘাত যেতে হবে কারাগারে।

বাংলাদেশের জাতির পিতা তথা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
শেষ আপডেট: 16 March 2026 23:53
অভিভক্ত বাংলায় ব্রিটিশ বিরোধী যে আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল গত শতকের ত্রিশের দশকে সে আন্দোলনে একজন রাজপথের সৈনিক হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন ১৯২০ সালে অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুর জেলার টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম নেওয়া কলকাতার ইসলামিয়া কলেজের পড়ুয়া তরুণ ছাত্র শেখ মুজিবুর রহমান। যিনি আজ বিশ্বের বাঙালির কাছে হাজার বছরের অন্যতম বাঙালি, বাংলাদেশের জাতির পিতা তথা বঙ্গবন্ধু হিসেবে পরিচিত।
এক ভিন্ন প্রেক্ষাপটে এ বছর ১৭ মার্চ তাঁর জন্মের ১০৬ বছর পূর্তি হবে। এই দিনটিকে কেন্দ্র করে দেশে হবে না কোনও সভা-সমাবেশ, গণমাধ্যমে প্রচারিত হবে না কোনও অনুষ্ঠান। আর কেউ যদি এমন কিছু করার চেষ্ঠা করেন তা হলে তাঁকে নির্ঘাত যেতে হবে কারাগারে।
হাইস্কুল পাশ করার পর শেখ মুজিবকে ১৯৪২ সালে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে (বর্তমানে মৌলানা আজাদ কলেজ) পডার জন্য ওই শহরে পাঠানো হয। সেখানে তাঁর দিনগুলি তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যত গঠন করে। তিনি মুসলিম লিগ এবং কংগ্রেস উভয় রাজনীতিবিদদের সংস্পর্শে আসেন। এটা এমন একটা সময় যখন ভারতে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এবং মহাত্মা গান্ধীর আন্দোলন জোরদার হচ্ছিল। আর অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ইউরোপকে তছনছ করে দিচ্ছিল।
মুজিবের প্রাথমিক রাজনৈতিক জীবন নেতাজি, গান্ধী, এ কে ফজলুল হক, হোসেন সোহরাওয়ার্দী, শরৎ চন্দ্র বসু এবং আবুল হাশিমের মতো রাজনীতিবিদদের দ্বারা প্রভাবিত ছিল। তিনি কলকাতা যাওয়ার আগেই নেতাজি ব্রিটিশদের ফাঁকি দিয়ে জার্মানি চলে গিয়েছিলেন।
১৯৪৩ সালে ব্রিটিশ সরকারের ত্রুটিপূর্ণ নীতির কারণে বাংলায় একটি ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয় যাতে প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষ অনাহারে মারা যান। এই দূর্ভিক্ষের জন্য বিভিন্ন গবেষক ব্রিটেনের যুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী চার্চিলকে দায়ী করেন।
স্কুল জীবন থেকেই মুজিব একজন ভাল সংগঠক ছিলেন। তিনি দ্রুততার সঙ্গে কলকাতা ও গোপালগঞ্জের ক্ষুধার্ত মানুষদের সাহায্যের জন্য ত্রাণ দল গঠন করেছিলেন। এই সময় অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী (বর্তমানে মুখ্যমন্ত্রী বলা হয়) ছিলেন মুসলিম লিগের খাজা নাজিম উদ্দিন। হোসেন শহীদ সোহরাওর্দী ছিলেন খাদ্যমন্ত্রী। দুর্ভিক্ষের সময় মুজিবের মানবিক কাজ তাঁকে সোহরাওয়ার্দির কাছাকাছি নিয়ে আসে। সোহরাওয়ার্দি পরবর্তীতে শেখ মুজিবের রাজনৈতিক গুরুতে পরিণত হন।
১৯৪৮ সাল। সে বছর মার্চ মাসের ২১ তারিখ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল জিন্নাহর ঢাকা সফর মুজিবের রাজনীতির দৃষ্টিভঙ্গি চিরতরে বদলে দেয়। জিন্নাহ নিজে উর্দুর একটি শব্দও বলতে পারতেন না। কিন্তু রমনার রেসকোর্সে এক জনসভায় বক্তৃতা দিতে গিয়ে ইংরেজিতে বলেছিলেন যে উর্দু পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে। এই ঘোষণাই ছিল অখণ্ড পাকিস্তানের কফিনে প্রথম পেরেক। সাধারণ জনগণ এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জিন্নাহর জন্য এক বিশেষ সমাবর্তেনে তিনি একই কথা উচ্চারণ করলে বিশ্ববিদ্যালয়ে উপস্থিত শিক্ষার্থীরা এই অপরিনামদর্শী বক্তব্যের প্রতিবাদ জানায়। সেই সমার্বতনে উপস্থিত ছিলেন মুজিব।
তিনি খুব ভাল করেই জানতেন যে পাকিস্তানি শাসকদের বিভিন্ন ধরণের অন্যায় নীতি ও সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এই ধরনের বিক্ষিপ্ত প্রতিবাদ কোনও উদ্দেশ্য সাধন করবে না। প্রতিবাদকে একটি সংগঠিত আন্দোলনে পরিণত করার জন্য তাদের একটি সংগঠনের প্রয়োজন হবে। তাঁর হাতেই ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্র লিগের জন্ম হয় (পরে মুসলিম শব্দটি বাদ দেওয়া হয়)। ছাত্রনেতা হিসেবে এটিই ছিল পূর্ব বাংলায় মুজিবের রাজনীতিতে প্রথম পদক্ষেপ। পরের বছর, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লিগ (পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লিগ নামে নামকরণ করা হয়) প্রতিষ্ঠিত হয়। আওয়ামী মুসলিম লিগ প্রতিষ্ঠায় মুজিব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তিনি অবিভক্ত পাকিস্তানের ২৪ বছরের ১৩ বছর কারাগারে কাটিয়েছেন স্রেফ বাঙালিদের স্বার্থের পক্ষে কথা বলার জন্য। পাকিস্তানের সামরিক শাসকরা আওয়ামী লিগকে একাধিকবার নিষিদ্ধ করেছিল। এটিই একমাত্র দল যা পাকিস্তানের ‘ঐক্যে’র জন্য সবসময় হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
মুজিব দুটি পৃথক সময়ে মৃত্যু’র মুখোমুখি হন। একবার ১৯৬৯ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময় আর দ্বিতীয়বার ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়। ১৯৬৯ সালে এক তীব্র গণ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে শেখ মুজিব কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর ছাত্র জনতা আর দেশের মানুষের কাছ থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি লাভ করেন। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লিগের এক অভূতপূর্ব বিজয়ের পর নানা ঘটনা প্রবাহের প্রেক্ষাপটে শুরু হয় পাকিস্তানে বিরুদ্ধে এক ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ যার সফল সমাপ্তি ঘটে ১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর। দেশের জন্য এই যুদ্ধের নিজের জীবন উৎসর্গ করেন ত্রিশ লক্ষ মানুষ। এই প্রেক্ষাপটে মুজিব একটি নতুন জাতির পিতা হিসাবে জনগনের স্বীকৃতি লাভ করেন। তিনি হয়ে ওঠেন মুক্তিকামী বিশ্বের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।
স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁর প্রতিষ্ঠিত দেশে মুজিব বেঁচে ছিলেন সাড়ে তিন বছর। ১৯৭৫ সালের ১৫ অগস্টের রাতে মুজিবকে পাকিস্তানপন্থী একদল সেনা সদ্যসের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে নিজ বাসভবনে স্বপরিবারে জীবন দিতে হয়। যে দেশটির জন্য বঙ্গবন্ধু আজীবন ক্লান্তিহীন সংগ্রাম করেছেন সেই দেশে তিনি মাত্র পাঁচ বছর বেঁচে ছিলেন। তাঁর জীবদ্দশায় শেখ মুজিব শুধু এই উপমহাদেশের ইতিহাস ও ভূগোল পরিবর্তনই দেখেননি, তিনি তাঁর অংশ ছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন একজন সত্যিকারের নেতা যার দূরদৃষ্টি ছিল। ইতিহাস মনে রাখে শুধু নায়কদের, ভুলে যায় খলনায়কদের। আমেরিকান সাহিত্যের অধ্যাপক জোসেফ ক্যাম্পবেল লিখেছেন: 'একজন নায়ক হলেন এমন একজন মানুষ যিনি নিজের জীবনকে নিজের চেয়ে বড় কিছুর জন্য উৎসর্গ করেছেন।' এই জাতির ইতিহাসে মুজিবের অবদানের মূল্যায়ন করলে এর চেয়ে সত্য কথা আর কিছু হতে পারে না।
এ বছর জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে নিয়ে হয়তো তাঁর সৃষ্ট এই দেশে তেমন কিছু হবে না। কিন্তু তিনি ইতিহাসের বরপূত্র হিসেবে হাজার বছর বেঁচে থাকবেন এই দেশের মানুষের হৃদয়ে। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু ।
লেখক রাজনৈতিক বিশ্লেষক। মতামত ব্যক্তিগত।