বাংলাদেশে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে (Bangladesh Election ) প্রথমবারের মতো একজন হিন্দুকে প্রার্থী করেছে জামায়াতে ইসলামী

প্রথমবারের মতো একজন হিন্দুকে প্রার্থী করেছে জামায়াতে ইসলামী
শেষ আপডেট: 12 January 2026 20:43
বাংলাদেশে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে (Bangladesh Election) প্রথমবারের মতো একজন হিন্দুকে প্রার্থী করেছে জামায়াতে ইসলামী (Jamaat Islami)। হিন্দু বহুল খুলনা-১ আসন থেকে কট্টর ইসলামপন্থী দলটির টিকিটে লড়াই করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী কৃষ্ণ নন্দী (Krishna Nandi)। তিনি জামাতের ডুমুরিয়া উপজেলায় হিন্দু কমিটির সভাপতি। এবারই প্রথম ভোটের লড়াইয়ে নেমেছেন। তাঁর বাবা ছিলেন মুসলিম লিগের (Muslim leauge) স্থানীয় নেতা।
প্রচারে কী বলছেন তিনি? সোমবার সন্ধ্যায় টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলে প্রচার থামিয়ে কৃষ্ণ নন্দী বলেন, ‘আমার স্লোগান একটাই, হরে কৃষ্ণ হরি বোল, দাঁড়িপাল্লা টেনে তোল।’ কৃষ্ণ নন্দী আত্মবিশ্বাসী, তাঁর জয় নিশ্চিত। হিন্দু-মুসলিম (Hindu-Muslim) নির্বিশেষে সব ধর্মের মানুষ তাঁকে সমর্থন করবেন। দাঁড়িপাল্লা জামাতের নির্বাচনী প্রতীক।
জামায়াতের সভা-সমিতি, মিটিং-মিছিলে এতদিন শুধু ‘নারায়ে তাকবীর’ স্লোগান শোনা যেত। এই আরবি কথাটির অর্থ হল, ‘উচ্চস্বরে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা।’ কৃষ্ণ নন্দী বলেন, ‘আমাদের দলের মুসলিম নেতারা নারায়ে তাকবীর বলছেন। আমি বলছি, হরে কৃষ্ণ হরি বোল।’ যদিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও-তে জামাতের মুসলিম নেতাদেরও বলতে শোনা যাচ্ছে, ‘হরে কৃষ্ণ হরে রাম,’ ‘হরে কৃষ্ণ হরি বোল’ ইত্যাদি স্লোগান।
নির্বাচনের দিন যত এগিয়ে আসছে, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু, বিশেষ করে হিন্দুদের উপর নিপীড়ন, নির্যাতনের ঘটনা ততই বেড়ে চলেছে। গত মাসে ১০জন হিন্দু ধর্মীয় বিদ্বেষের কারণে খুন হয়েছেন। বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া, জমি-ব্যবসা দখল, ধর্ষণ-গণ ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটেছে ৫২টি। এই সব হিংসাত্মক ঘটনায় বিএনপি (BNP) এবং জামাত, দুই দলেরই নাম জড়িয়েছে। তবে জামাতের দিকেই আঙুল উঠেছে বেশি।
যদিও ওই দলের নেতারা দাবি করছেন, বাংলাদেশে হিন্দুদের (Bangladesh Hindus) যদি কোনও দল সুরক্ষা দিয়ে থাকে তবে তা জামায়াতে ইসলামী। গত বছরের দুর্গাপুজো নিয়ে জামাত নেতাদের দাবি, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর কোনও পর বছর এত শান্তিপূর্ণভাবে পুজো উদযাপনের নজির নেই। আর সেটা সম্ভব হয়েছে জামায়াতে ইসলামীর শক্ত অবস্থানের কারণে। দলের লোকজন পুজোর দিনগুলি সতর্ক অবস্থান নিয়েছিল যাতে কোনও অশান্তি না হয়।
বাংলাদেশে হিন্দদের সিংহভাগ আওয়ামী লিগের সমর্থক। একাংশ বিএনপি-কে ভোট দেয়। এবার নির্বাচনী ময়দানে আওয়ামী লিগ না থাকায় সংখ্যালঘু, বিশেষ করে হিন্দুরা কাকে ভোট দেবে তা নিয়ে জোর চর্চা আছে। সংখ্যালঘু এলাকায় জামাত তাই স্লোগান তুলেছে, ‘সব মার্কা দেখা শেষ, দাঁড়িপাল্লার বাংলাদেশ।’ কৃষ্ণ নন্দীর হয়ে প্রচার করে গিয়েছেন জামাতের দুই শীর্ষ নেতা শফিকুর রহমান এবং মিঞাঁ গোলাম পারওয়ার।
জামায়াতে ইসলামী এবার সংখ্যালঘু বিশেষ করে হিন্দুদের সমর্থন পেতে মরিয়া কেন? আসলে দেশের তৃতীয় বৃহত্তম দল হলেও জামাত ভোটের ময়দানে এতকাল তেমন একটা সুবিধা করতে পারেনি। একার শক্তিতে তারা সর্বোচ্চ ১৮টি আসন পেয়েছিল ১৯৯১ সালের নির্বাচনে। স্বৈরশাসক হুসেইন মহম্মদ এরশাদের সরকারের বিরুদ্ধে গণ আন্দোলনে আওয়ামী লিগ ও বিএনপি-র সঙ্গে আন্দোলনে ছিল জামাতও। ভোটের বাক্সে তার প্রভাব পড়লেও পাঁচ বছর পর ১৯৯৬ সালের ভোটে তাদের আসন কমে হয় তিন। খালেদা জিয়ার সরকারকে সমর্থন করায় জামাতের আসন ১৮ থেকে কমে তিনে নেমে গিয়েছিল বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। দলটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন পায় ২০০১-এর নির্বাচনে। সেই নির্বাচনে তারা ১৭টি আসন পেলেও সেবার বিএনপি-র সঙ্গে জামতের জোট হয়েছিল। ২০০৮ সালে ১৭ থেকে তাদের প্রাপ্ত আসন কমে হয় দুই। হাসিনা জমানার নির্বাচনগুলিতে জামাত অংশ নেয়নি।
এবার আওয়ামী লিগ নির্বাচনী ময়দানে না থাকার পূর্ণ সুযোগ তুলতে চাইছে বিএনপি-ও। তারা সাধারই আওয়ামী লিগ সমর্থকদের নিরাপত্তার আশ্বাস দিচ্ছে। সংখ্যালঘুদেরও অভয় দিচ্ছে খালেদা জিয়ার দল। গত সপ্তাহে বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতাদের সঙ্গে তারেক জিয়া প্রায় দেড় ঘণ্টা বৈঠক করেছেন। সংখ্যালঘু নেতাদের কথা মনযোগ দিয়ে শুনেছেন তিনি।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীও মরিয়া হিন্দুদের ভোট পেতে। বাংলাদেশের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লড়াই মূলত বিএনপি ও জামাতের জোটের মধ্যে। জোট ভেঙে পুরনো বন্ধুরা এবার পরস্পরকে টেক্কা দিতে মরিয়া।