বাংলাদেশের উত্তর প্রান্তের বড় শহর রাজশাহী মেডিকেল কলেজে আইসিসিইউতে চিকিৎসাধীন চার শিশুর তিনজন রবিবার রাতে মারা গিয়েছে। এ নিয়ে রাজশাহীতে গত এক মাসে ১২ শিশুর মৃত্যু হল।

হাম সংক্রমণ বাংলাদেশে
শেষ আপডেট: 30 March 2026 11:42
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাংলাদেশে (Bangladesh) বিগত এক মাসে শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে হামে আক্রান্ত হয়ে। হাজারের বেশি শিশু এই মুহূর্তে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ঢাকা সহ কমবেশি সব শহরেই এই রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমান (Tarique Rahman) হাম মোকাবিলায় (Measles in Bangladesh) সর্বোচ্চ সতর্কতা এবং তৎপরতা নির্দেশ দিয়েছেন প্রশাসনকে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীকে অবিলম্বে আক্রান্ত জেলাগুলিতে যেতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সঙ্গে বাংলাদেশ সরকার ১০ কোটি টিকা কেনার উদ্যোগ নিয়েছে।
বাংলাদেশের উত্তর প্রান্তের বড় শহর রাজশাহী মেডিকেল কলেজে আইসিসিইউতে চিকিৎসাধীন চার শিশুর তিনজন রবিবার রাতে মারা গিয়েছে। এ নিয়ে রাজশাহীতে গত এক মাসে ১২ শিশুর মৃত্যু হল।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রের খবর রাজশাহী ছাড়াও ঢাকা, ময়মনসিংহ, পাবনা, চট্টগ্রাম, যশোর ও নাটোরে এই রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি। জানা যাচ্ছে দুটি কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে প্রয়োজনের তুলনায় হামের টিকার জোগান কম। এছাড়া মৃত শিশুদের অনেকেরই বাধ্যতামূলক দুটি টিকা নেওয়া ছিল না বলে তদন্তে জানা গিয়েছে। টিকা সংগ্রহ ও বিতরণের আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্যাভির স্টিয়ারিং কমিটির চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন আহমেদ তাই পরিস্থিতিকে অতি উদ্বেগজনক বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য কত শিশু দুই ডোজ টিকা নেয়নি তার কোন হিসাব প্রশাসনের কাছে নেই। তবে মনে হচ্ছে, সংখ্যাটা নেহাত কম হবে না।
বিবিসি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে সাধারণত ৯ মাস পূর্ণ হলে ইপিআই কর্মসূচির আওতায় হামের টিকা পায় শিশুরা। কিন্তু এবার দেখা যাচ্ছে যারা আক্রান্ত তাদের ৩৩ ভাগ এই বয়সের আগেই আক্রান্ত হয়েছে। অর্থাৎ ৯ মাসের কম বয়সিদের মধ্যে এই রোগের সংক্রমণ বাড়ছে।
সাধারণত সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় ৯-১৫ বয়সি শিশুদের হামের দুটি টিকা দেওয়া হলেও এর অতিরিক্ত হিসেবে প্রতি চার বছর পরপর হামের টিকা দেওয়ার যে বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হয়, ২০২৪ সালে তা হয়নি।
এই সংকটের দায় তাই আওয়ামী লিগ বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের পাশাপাশি তারেক রহমানের প্রশাসনের উপরও চাপিয়েছে। সাবেক শাসকদলের বক্তব্য, ব্যর্থতা ঢাকতে প্রশাসন টিকাদান সংক্রান্ত পরিসংখ্যান আড়াল করছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী তথা আওয়ামী লিগ নেত্রী শেখ হাসিনা দলীয় সূত্রে হামজনিত পরিস্থিতির খোঁজখবর নিয়েছেন। তিনি দলকে নির্দেশ দিয়েছেন পরিসংখ্যান দিয়ে প্রচার করতে যে আওয়ামী সরকারের সময় কীভাবে টিকাকরণ কর্মসূচি সফল করে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছিল।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু টিকা না দেওয়াই নয়, শিশুদের পর্যাপ্ত পরিমাণে মায়ের বুকের দুধ না পাওয়া এবং অপুষ্টির কারণেও এই রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে।
এদিকে বাংলাদেশের যেভাবে হাম ছড়িয়ে পড়ছে তাতে ভারতসীমান্ত লাগোয়া এলাকায় সর্তকতা প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। যে জেলাগুলি সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত তার মধ্যে অন্যতম যশোর একেবারে পশ্চিমবঙ্গ লাগোয়া। আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার জন্য সীমান্ত লাগোয়া পশ্চিমবঙ্গের হাসপাতাল গুলিতে নিয়ে আসার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। আম অতিস্পর্শকাতর এবং মারাত্মক ধরনের সংক্রামক ব্যাধি। হাঁচি কাশি মাধ্যমে এই রোগ ছড়ায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশ লাগোয়া ভারতের বাকি রাজ্যগুলিতে হামের টিকাকরণ কর্মসূচি হতে দেখা উচিত স্থানীয় প্রশাসনের। কারণ যে কোন সময় সীমান্তের এপারেও এই রোগ এসে থাবা দিতে পারে।
এদিকে আওয়ামী লিগ এক বিবৃতিতে বলেছে, মার্চ মাস শেষ হয়ে আসছে। এই একটা মাসে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ১২ শিশু। ৯ জন মারা গেছে আইসিইউতে ঢোকার পরে, আর তিনজন আইসিইউতে ঢোকারই সুযোগ পায়নি, তার আগেই শেষ। শিশু হিয়ার বাবা রিফাত হোসেন বলেছেন, আইসিইউ পাওয়ার আগেই তার মেয়ে চলে গেছে। এই একটা বাক্যেই বোঝা যায় দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখন কোথায় দাঁড়িয়ে আছে।
বিএনপি সরকারের উদ্দেশে দলটির বক্তব্য ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখে যে সরকার ক্ষমতায় বসেছে, তারা এই পরিস্থিতিতে কী করেছে? হাসপাতালে আইসোলেশন ব্যবস্থা নেই, জনবল নেই, আইসিইউ নেই। ৮৪ জন শিশুকে আইসিইউতে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল এই মাসে। সুপারিশ হয়েছে, কিন্তু ব্যবস্থা হয়নি। কারণ সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে নাকি পর্যাপ্ত জনবল নেই। এই কথাটা হাসপাতালের মুখপাত্র নিজেই বলেছেন। তার মানে সমস্যাটা সবাই জানেন, কিন্তু কেউ সমাধান করেননি।
সবচেয়ে ভয়াবহ যে তথ্যটা বেরিয়ে এসেছে সেটা হল, হাসপাতালে আইসোলেশন না থাকায় হামে আক্রান্ত শিশুদের সাধারণ রোগীদের সঙ্গেই রাখা হচ্ছিল।
রাজশাহী, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ তিনটি জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় ১৮ মার্চ ১৫৩ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে, তার মধ্যে ৪৪ জনের হাম পজিটিভ এসেছে। প্রায় ২৯ শতাংশ। এই হার অত্যন্ত উচ্চ। আর এই পরিস্থিতিতে কোনো জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি? শনিবার, মানে ২৮ মার্চ, মাসের শেষ দিকে এসে হাসপাতালের দুটো ওয়ার্ডকে হাম আইসোলেশন কর্নার ঘোষণা করা হয়েছে। ১২টা শিশু মরে যাওয়ার পরে এই সিদ্ধান্ত এল।
বিএনপির এই সরকার ক্ষমতায় এসেছে দেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলোকে বাইরে রেখে, জনগণের বয়কট করা একটা নির্বাচনের মাধ্যমে। তারা বলেছিল দেশ চালাতে পারবে, মানুষের জন্য কাজ করবে। রাজশাহীতে এখন যা হচ্ছে সেটা তাদের সেই দাবির জবাব। শিশুদের জন্য আইসিইউ নেই, আইসোলেশন নেই, জনবল নেই। যা আছে তা হলো অজুহাত আর বিলম্বিত সিদ্ধান্ত।
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্তারা বলছেন পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। নির্দেশনা জারি হয়েছে। কিন্তু নির্দেশনা আর বাস্তবতার ফারাকটা ঠিক কতটা, সেটা বোঝা যায় রিফাত হোসেনের কথায়। তার মেয়ে নির্দেশনার জন্য অপেক্ষা করেনি। হাম কোনো নতুন রোগ না, এর টিকা আছে, চিকিৎসা আছে। কিন্তু ব্যবস্থাপনা না থাকলে টিকা আর চিকিৎসা থাকলেই কী আর না থাকলেই কী।