নিরঙ্কুশ বিজয় নিশ্চিত হওয়ার পর তিনি সাংবাদিক বৈঠকে এবং একাধিক সাক্ষাৎকারে এই ব্যাপারে তার সরকারের মনোভাব ব্যক্ত করেছেন। তারেক বলেছেন এই সমস্ত বিষয়ে তিনি আইনের পথে চলবেন।

ফাইল ছবি
শেষ আপডেট: 17 February 2026 11:17
শেখ হাসিনার (Sheikh Hasina) উপর গ্রেনেড হামলার ঘটনার মামলায় আওয়ামী লিগ জামানায় যাবজ্জীবন সাজা (life sentence) হয়েছিল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হতে যাওয়া বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের (Tarique Rahman)। ওই মামলা সহ তার বিরুদ্ধে থাকা যাবতীয় আইনি প্রতিবন্ধকতা থেকে গতবছর তাঁকে মুক্তি দেয় বাংলাদেশের হাইকোর্ট (Bangladesh High Court) এবং সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court)। এই অনুকূল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ১৭ বছর লন্ডনে রাজনৈতিক নির্বাচনে থাকা তারেক রহমান গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরে এসেছেন। মঙ্গলবার বিকেল চারটেয় সেই তিনিই হতে চলেছেন বাংলাদেশের একাদশ প্রধানমন্ত্রী। বাবা জিয়াউর রহমান, মা খালেদা জিয়ার (Khaleda Zia) পর এবার পুত্র তারেক রহমান বাংলাদেশের সরকার প্রধান হতে চলেছেন।
ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী তথা আওয়ামী লিগ নেত্রী শেখ হাসিনাকে (Seikh Hasina) দেশে ফেরানো এবং তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা ও দলের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো গুরুতর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারেক রহমানকে (Tarique Rahman)। তিনি এই ব্যাপারে কী পদক্ষেপ করেন তা নিয়ে গভীর উৎকণ্ঠার সঙ্গে অপেক্ষা করছে আওয়ামী লিগ নেতৃত্ব। তারা আশাবাদী নতুন প্রধানমন্ত্রী দলের ওপর থেকে প্রথমেই কার্যক্রমের উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেবেন। আওয়ামী লিগের একাধিক নেতা বলছেন, এই একটি সিদ্ধান্তই আপাতত তাদের জন্য যথেষ্ট হবে। তাহলে এই নেতাকর্মীরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন। বিদেশে থাকা নেতারাও আইন আদালতের মুখোমুখি হবেন।
প্রশ্ন হল তারেক রহমান (Tarique Rahman) এই বিষয়ে কী পদক্ষেপ করতে পারেন? নিরঙ্কুশ বিজয় নিশ্চিত হওয়ার পর তিনি সাংবাদিক বৈঠকে এবং একাধিক সাক্ষাৎকারে এই ব্যাপারে তার সরকারের মনোভাব ব্যক্ত করেছেন। তারেক বলেছেন এই সমস্ত বিষয়ে তিনি আইনের পথে চলবেন।
আপাত দৃষ্টিতে বিষয়টি আইন-আদালতের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেস্টা মনে হলেও তারেক নিজে কিন্তু আদালত থেকেই অনুকূল রায় পেয়ে আজ দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন। তবে আওয়ামী লিগের উপর সন্ত্রাস দমন আইনে অন্তর্বর্তী সরকারের নিষেধাজ্ঞা (lifting ban on functions of Awami League) প্রত্যাহারের ক্ষমতা নির্বাচিত সরকারের হাতে রয়েছে। কারণ ওই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ হয়েছিল এক্সিকিউটিভ অর্ডার বা নির্বাহী আদেশে। নির্বাহী আদেশ প্রত্যাহারের জন্য আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার প্রয়োজন নেই। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনে করলে দ্রুততম সময়ে দ্রুততম সময়ে আওয়ামী লিগের কার্যক্রমের ওপর জারি নিষেধাজ্ঞা প্রস্তাব করে নিতে পারেন। তিনি তেমন পদক্ষেপ করেন কিনা সময়ই তা বলবে।
তবে বিএনপি'র একাধিক শীর্ষ সূত্র দ্য ওয়াল-কে জানিয়েছে, আওয়ামী লীগের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানো দুটি বিষয়কে দল এবং তারেক রহমানের সরকার এক দৃষ্টিতে নাও দেখতে পারে। হাসিনাকে দেশে ফেরানোর ব্যাপারে নতুন সরকার খুব একটা আগ্রহ নাও দেখাতে পারে। অর্থাৎ হাসিনাকে বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের যে প্রস্তাব গত দেড় বছর ধরে নানা মহলের বিবেচনায় আছে তারেক রহমান সেই পথেই হাঁটতে পারেন। সে ক্ষেত্রে হাসিনাররত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার দায় তিনি তার ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারবেন।
নির্বাচনের আগে বিএনপি নেতারা একাধিকবার হাসিনার ভারতে অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বলেছেন এর ফলে ভারত বাংলাদেশ সম্পর্ক স্বাভাবিক করা দুরহ হয়ে উঠবে। দ্য ওয়াল-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বারেবারে বলেছিলেন ভারত সরকারের উচিত শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে দেওয়া।
সবকিছু ঠিক থাকলে মঙ্গলবার বিকালে তারিখ রহমানের মন্ত্রিসভায় মির্জা ফখরুল কে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে দেখা যাবে। পূর্ব ঘোষণা মতো বর্তমান রাষ্ট্রপতি মহম্মদ সাহাবুদ্দিন সরে গেলে বিএনপির প্রবীণ নেতা মির্জা ফখরুল ওই পদে বসতে পারেন। সেই টিভির নির্বাচনের পর এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান ভারত বাংলাদেশ সম্পর্কে কোন সমস্যা তৈরি করবে না। ফখরুলের এই বক্তব্য থেকে অনেকে মনে করছেন হাসিনাকে দেশে ফেরাতে খুব একটা আগ্রহ দেখাবে না তারেক সরকার।
এই ব্যাপারে আইনের পথটিও দীর্ঘ এবং জটিল। ফলে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার আইনি জটিলতাকে হাতিয়ার করেও হাসিনাকে দেশে ফেরানোর বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখতে পারে। কারণ হাসিনা ফিরলে আওয়ামীলীগ আবার আগের মতন প্রবল শক্তিধর হয়ে উঠতে পারে এবং বিএনপি'র বিরুদ্ধে ফ্যাসিস্ট শক্তিকে পুনর্ভাসিত করার অভিযোগ ওঠা অসম্ভব নয়। বিএনপি নেতৃত্বকে এই বিষয়টি ভাবাচ্ছে। এক্ষেত্রে তখন বল হাসিনার কোর্টে চলে যাবে। তাঁকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে মৃত্যুদণ্ডের সাজা মাথায় নিয়ে তিনি দেশে ফিরবেন কিনা। একাধিক আইনজ্ঞ দ্য ওয়াল কে জানিয়েছেন, বিষয়টি এমন নয় যে আওয়ামী লীগ নেত্রী দেশে ফিরলেন আর সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে ফাঁসি কাঠে ঝোলানো হবে। দেশে ফিরে তিনিও দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ায় নিজেকে সাজা মুক্ত করতে পারেন। তবে সেক্ষেত্রে তার কারাবাস এড়ানোর সুযোগ কম। বিএনপি'র একটি সূত্র জানিয়েছে তারা এটাও চান না। কারণ হাসিনা কারাগারে থাকলে তাঁর মুক্তির দাবিতে দেশে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে আওয়ামী লিগ। আবার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার দাবিতে অশান্তি করতে পারে, জামায়াতে ইসলামী।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, আইনের পথে তারেক রহমান নিজে সবচেয়ে লাভবান ব্যক্তি বাংলাদেশে। তার বিরুদ্ধে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং হাসিনা জামানা মিলিয়ে প্রায় ৩৫টি মামলা ছিল। তারমধ্যে দুর্নীতির মামলা ছাড়াও ছিল শেখ হাসিনার উপর ২০০৪ এ গ্রেনেড হামলার ঘটনা। ওই মামলায় তারেক রহমানের যাবজ্জীবন সাজা হয়েছিল। তিনি লন্ডন থেকেই আইনি পথে সাজা মুক্ত হয়ে গত ৩০ ডিসেম্বর দেশে ফিরে আসেন এবং এবারের নির্বাচনে দলকে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাইয়ে মঙ্গলবার দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন। ঘটনাচক্রে তাঁর পূর্ববর্তী প্রধানমন্ত্রীর নাম শেখ হাসিনা।