লন্ডনে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠকে নতুন ‘ডাইমেনশন’ তৈরি হতে পারে বলে দু’ দিন আগে মন্তব্য করেন বিএনপি-র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগির।

শেষ আপডেট: 11 June 2025 12:34
লন্ডনে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে তারেক রহমানের (Md Yunus & Tarek Zia would meet in London on Friday) বৈঠকে নতুন ‘ডাইমেনশন’ তৈরি হতে পারে বলে দু’ দিন আগে মন্তব্য করেন বিএনপি-র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগির (Mirza Fakhrul Islam Alamgir, the BNP Secretary general) ।
বিএনপির আর এক শীর্ষনেতা তথা দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ (Salahuddin Ahmed, senior standing committee member of BNP) বলেছেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান। তিনি আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ব্যক্তিত্ব। অন্যদিকে, দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি। সেই দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ১৭ বছর যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত (17 years in political asylum in London) জীবন কাটাচ্ছেন। আমরা মনে করি, সরকারের প্রধান ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সাক্ষাৎটা হওয়া জরুরি। এই বৈঠক রাজনৈতিক শিষ্টাচারেরও অংশ। এই সাক্ষাৎ না হলে নিন্দুকেরা বিরূপ সমালোচনার সুযোগ নিতে পারত।’ লন্ডনে ইউনুস ও তারেকের নির্ধারিত বৈঠকটি হবে আগামী পরশু শুক্রবার সকালে।
তাৎপর্যপূর্ণ হল মির্জা ফখরুল ও সালাউদ্দিন আহমেদ দিন কয়েক আগেও মহম্মদ ইউনুস ও তাঁর সরকার সম্পর্কে যে সব কথা বলেছেন তার সঙ্গে তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক সক্রান্ত বক্তব্যের জমিন-আসমান ফারাক। বিএনপি নেতারা ইউনুসের মুণ্ডপাত করে বলেছেন, তিনি দেশের বৃহত্তম দলটির কোনও কথা কানে তুলছেন না। নির্বাচন না করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চাইছেন। প্রধান উপদেষ্টাকে নিশানা করে অন্তর্বর্তী সরকারকে ক্ষমতালোভী বলে গালমন্দ করেছেন তাঁরা।
সেই তাঁরা রাতারাতি কথা বদলে ফেললেন কেন? বিএনপি সুত্রে জানা যাচ্ছে, লন্ডনে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে তারেক জিয়ার বৈঠক নিয়ে দলের মধ্যে ভিন্ন মত আছে। অধিকাংশ নেতা এই বৈঠকের বিরোধী। তাঁরা মনে করছেন, আগামী দিনে বিশেষ করে ভোটের সময় এই বৈঠকের জন্য খেসারত দিতে হতে পারে দলকে। ভোটে বিএনপি সরকারের কাছ থেকে সুবিধা নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠতে পারে। তাছাড়া সরকারের অবৈধ সিদ্ধান্তগুলির দায় বিএনপির উপর এসে পড়বে।

খালেদাকে ঘিরে ইউনুসের ছাত্র বাহিনী
কিন্তু পরিস্থিতি বদলে যায় গত ইদ উল আজহার দিন থেকে। দলীয় সুপ্রিমো খালেদা জিয়াকে ইদের শুভেচ্ছা জানাতে বিএনপির শীর্ষ নেতারা তাঁর বাড়িতে গিয়েছিলেন। খালেদা এখন অনেকটাই সুস্থ। কথায় কথায় তিনি দলের নেতাদের বলেন, সরকারের সঙ্গে সংঘাতে গিয়ে বিএনপির কোনও লাভ হবে না। বরং সহযোগিতা করে অনুকূল পরিস্থিতির দিকে এগনোই সঠিক হবে।
সুত্রের খবর, নেত্রীর এই কথায় মুষড়ে পড়েন অধিকাংশ নেতা। জানা যাচ্ছে, সেই বৈঠকেই খালেদা জানিয়ে দেন তিনি চান লন্ডনে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে যেন তারেক বৈঠকে বসে। তার আগে ছেলেকেও একই পরামর্শ দেন খালেদা। যদিও তারপরও তারেক লোক দেখানো বৈঠক করে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যদের কাছে তাঁদের অভিমত জানতে চান ইউনুসের সঙ্গে বসবেন কি না। বলাইবাহুল্য নেত্রীর মনোভাব জানা থাকায় কেউই এই ব্যাপারে আর আপত্তি করেননি। সেই বৈঠকের পরই ইউনুস-তারেকের নির্ধারিত বৈঠকে নতুন দিশা দেখা দিতে পারে বলে মন্তব্য করেন বর্তমান মহাসচিব ফখরুল এবং আর এক বর্ষীয়ান নেতা সালাউদ্দিন, যিনি বিএনপির পরবর্তী মহাসচিব বলে মনে করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, সরকারপক্ষও বিগলিত ইউনুস-তারেক বৈঠক নিয়ে। লন্ডন যাত্রার আগেই প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিখুল আলম মন্তব্য করেন, দু’জনের বৈঠক হলে ভালই হয়। দেশের মঙ্গল হবে। লন্ডনে পৌঁছে তিনি বলেছেন, দু’জনের মধ্যে অনেক বিষয়েই কথা হতে পারে। জানা যাচ্ছে, মূল আলোচ্য জাতীয় সংসদ ভোটের দিন স্থির করা। দেশ ছাড়ার আগে ইউনুস আগামী বছরের এপ্রিলের গোড়ায় ভোট হবে বলে ঘোষণা করেছেন। অন্যদিকে, বিএনপির দাবি, ভোট করতে হবে চলতি বছরের ডিসেম্বরে। মনে করা হচ্ছে, ভোটের দিনক্ষণ নিয়ে আলোচনায় বোঝাপড়া গড়ে তোলার চেষ্টা হবে। বিএনপি জামাত ও এনসিপির সঙ্গে আসন সমঝোতার প্রস্তাব মানলে ভোটে এপ্রিলের আগে জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারিতেও করাতে পারেন ইউনুস। দ্বিতীয় আলোচ্য জুলাই ঘোষণাপত্র এবং জুলাই সনদের খসড়ায় বিএনপি-কে রাজি করানো। খসড়ায় এমন অনেক প্রস্তাব আছে বিএনপির পক্ষে মেনে নেওয়া কঠিন। এখন আইএসআইয়ের চাপে বিএনপি ইউনুস সরকার ও তাঁর অনুগামী ছাত্র সংগঠনের তৈরি খসড়ায় সই করে কিনা সেটাই দেখার।
প্রশ্ন হল, খালেদা হঠাৎ ইউনুসের প্রতি সদয় হলেন কেন? তাঁকে মুক্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান উপদেষ্টার কোনও ভূমিকা ছিল না। রাষ্ট্রপতির বিশেষ ক্ষমতাবলে ৫ মুক্তি পান তিনি। ইউনুস তখনও প্রধান উপদেষ্টা হননি। খালেদা জিয়াকে লন্ডনে চিকিৎসা করাতে যেতে দিতে সরকারের অনুমতি দেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। তারপরও ইউনুসের প্রতি বিএনপি সুপ্রিমোর কৃতজ্ঞতা, তাঁর পাশে থাকতে দলকে নির্দেশ দেওয়ার কারণ কী?
জানা যাচ্ছে খালেদা জিয়া তাঁর রাজনীতির দুই পুরনো বন্ধুর কথায় ইউনুস সরকারকে নিরাপদে কাজ চালাতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে পাকিস্তান, বিশেষ করে তাদের সামরিক গোয়ন্দা সংস্থা আইএসআই নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্স্থাপনে মহম্মদ ইউনুস সরকারকে সামনে রেখে এগচ্ছে পাক সরকার। ইতিমধ্যে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বাণিজ্য, ভিসা নীতি শিথিল করা, সাংস্কৃতিক বিনিময় জোর কদমে শুরু হয়েছে যা খলেদার জমানার পুনরাবৃত্তি বলা চলে। ঢাকার পাক দূতাবাসের সঙ্গে বিএনপি নেতাদের পুরনো মাখো মাখো সম্পর্ক আবার ফিরে এসেছে।
শুধু আইএসআই-ই নয়, খালেদা জিয়ার প্রধান উপদেষ্টার প্রতি নরম মনোভাবের পিছনে জামায়াতে ইসলামিরও মদত আছে বলে খবর। ২০০১ থেকে পাঁচ বছর জামাতকে সঙ্গে নিয়ে সরকার চালিয়েছেন খালেদা। তিনি চিকিৎসার জন্য লন্ডনে থাকাকালে জামাতের আমির শফিকুর রহমান সেখানে গিয়ে তাঁর সঙ্গে একান্তে বৈঠক করে এসেছেন। ইউনুস সরকারের রাজনৈতিক প্রাণভ্রমরা হল পাকিস্তানপন্থী জামায়াতে ইসলামি। প্রধান উপদেষ্টা হয়ে খালেদার কাছে দৌত্য করতে গিয়েছিলেন শফিকুর।