বঙ্গবন্ধুর মতোই যেন ভাগ্যবরণ করতে হয়েছে তাঁর কন্যা শেখ হাসিনাকে। রাজনীতিতে অভিষেক যেমন তাঁর জন্য সুখকর অভিজ্ঞতা ছিল না, তেমনই মসৃণ ছিল না রাজনৈতিক পথ।

শেষ আপডেট: 11 June 2025 12:03
বাংলাদেশের ইতিহাস কেবলই যেন বঞ্চনার ইতিহাস। ষড়যন্ত্র, নিষ্ঠুর নিপীড়ন আর রক্ত ঝরানোর ইতিহাস। এমনি এক ষড়যন্ত্রের সূচনা হয়েছিল ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি। আবির্ভাব ঘটেছিল কথিত ওয়ান-ইলেভেনের। একটি চেপে বসা অপশক্তি প্রচণ্ড প্রতাপে দেশ শাসন করেছে তখন। সেই চেপে বসা অপশক্তির হাতে পিষ্ট হয়েছে দেশের গণতন্ত্র।
রাজনীতি তখন যেন গর্হিত অপরাধ। রাজনীতিক পরিচয় দিতেও অনেকে কুণ্ঠিত ছিলেন। আগের পাঁচ বছরের জোট অপশাসন রাজনীতিকে এক গভীর পঙ্কে নিমজ্জিত করেছিল। ওয়ান-ইলেভেন নামের পটপরিবর্তনের সুযোগে চেপে বসে ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার’ নামের নতুন এক দীর্ঘমেয়াদি শাসনব্যবস্থা।
চেপে বসা সেই শাসককুল তখন রীতিমতো ত্রাস। রাতারাতি সব কিছু বদলে ফেলার ঘোষণা দেয় তারা। রাজনীতি থেকে জঞ্জাল পরিষ্কার করার কথা তখন বারবার করে বলা হতো। প্রতিক্রিয়াশীল চক্র রাজনৈতিক নিষ্ঠুর প্রতিহিংসাপরায়ণতা ও চক্রান্তের জাল বিছিয়েছে গোপনে! সাহসী রাজনীতির পারিবারিক ঐতিহ্য ও সংগ্রামের ইতিহাস মুছে ফেলার কুৎসিত, নির্মম ও ভয়াবহ চক্রান্ত করেছে চেপে বসা শাসকচক্র।
সংকীর্ণ রাজনীতির হীনম্মন্যতার ছদ্মাবরণে আজকের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার ভাবমূর্তি নস্যাৎ করার ষড়যন্ত্র হয়েছে। এই চেপে বসা অপশক্তি ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই মিথ্যা মামলায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করে।
শেখ হাসিনার জীবনের সঙ্গে তাঁর বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। আমরা যদি জাতির পিতার রাজনৈতিক জীবনের দিকে ফিরে তাকাই, তাহলে দেখতে পাই জীবনের বেশির ভাগ সময় তাঁকে থাকতে হয়েছে কারা অভ্যন্তরে। বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের এই মহান নেতাকে স্বস্তিতে থাকতে দেয়নি পশ্চিম পাকিস্তানের চেপে বসা শাসকগোষ্ঠী।
বঙ্গবন্ধুর মতোই যেন ভাগ্যবরণ করতে হয়েছে তাঁর কন্যা শেখ হাসিনাকে। দেশের মানুষ যখন অধিকারবঞ্চিত, ১৯৮১ সালে তিনি তৎকালীন চেপে বসা শাসকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে দেশে ফিরে এসে দাঁড়িয়েছেন অধিকারবঞ্চিত মানুষের পাশে। যেমন দাঁড়িয়েছিলেন জাতির পিতা। শেখ হাসিনার চলার পথটা সহজ ছিল না কোনো দিনই। রাজনীতিতে অভিষেক যেমন তাঁর জন্য সুখকর অভিজ্ঞতা ছিল না, তেমনি মসৃণ ছিল না তাঁর রাজনৈতিক চলার পথ। পায়ে পায়ে পাথর ঠেলে এগুতে হয়েছে শেখ হাসিনাকে। প্রতি পদে পদে জীবনের ঝুঁকি নিতে হয়েছে। কিন্তু জনগণকে আস্থায় নিয়ে রাজনৈতিক কল্যাণের যে পথযাত্রা শুরু হয়েছিল তাঁর, তা থেকে তাঁকে বিচ্যুত করা যায়নি।

আবার এটিও তো ঠিক, এই উপমহাদেশের রাজনীতিতে জেল-জুলুম নতুন কোনো ঘটনা নয়। মহৎ রাজনীতিকরা কারাগারে বসেই তাঁদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করেছেন—এমন অনেক নজির আছে। জননেত্রী শেখ হাসিনাও নির্জন কারাবাসকালে অলস সময় কাটাননি। কারাগারের নির্জনতাকে তিনি তাঁর সৃজনশীল রাজনৈতিক চিন্তায় সময় পার করেছেন। তাঁর চরিত্রের যে বিষয়টি সবারই নজর কাড়ে, তা হচ্ছে তাঁর গভীর প্রত্যয়। দেশ ও মানুষের কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ জননেত্রী গভীর সংকটেও জনগণের কল্যাণচিন্তা করেন। সেই চিন্তার প্রতিফলন এরই মধ্যে ঘটেছে। এক স্মৃতিচারণায় জননেত্রী শেখ হাসিনা উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করার যে পরিকল্পনা, তা সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় কারাগারে নিঃসঙ্গ দিনগুলোতেই তৈরি করেছিলেন তিনি। তাঁর এই নিরলস চিন্তার ফসল ঘরে তুলেছে বাংলাদেশ।
কবিগুরু বলেছেন, ‘মানুষের দায় মহামানবের দায়, কোথাও সীমা নেই। অন্তহীন সাধনার ক্ষেত্রে তার বাস।...দেশ শুধু ভৌমিক নয়, দেশ মানসিক। মানুষে মানুষে মিলিয়ে এই দেশ জ্ঞানে জ্ঞানে, কর্মে কর্মে।...আমরাও দেশের ভবিষ্যতের জন্য বর্তমানকে উৎসর্গ করেছি। সেই ভবিষ্যৎকে ব্যক্তিগতরূপে আমরা ভোগ করব না।...ভবিষ্যতে যাঁদের আনন্দ, যাঁদের আশা, যাঁদের গৌরব, মানুষের সভ্যতা তাঁদেরই রচনা। তাঁদেরই স্মরণ করে মানুষ জেনেছে অমৃতের সন্তান, বুঝেছে যে তার সৃষ্টি, তার চরিত্র, মৃত্যুকে পেরিয়ে।’
কথাগুলি শেখ হাসিনার জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য। তিনি দেশের ভবিষ্যতের জন্য উৎসর্গ করেছেন নিজের বর্তমান। ব্যক্তিগতভাবে বর্তমানকে ভোগ করেন না তিনি। আর সে কারণেই বাঙালির সঙ্গে তাঁর জন্মান্তরের নিবিড় যোগসূত্র। দেশের মানুষের আস্থা ও অস্তিত্বে তাঁর স্থায়ী আসন। মানুষের পাশে থাকেন সব সময়।
দেশের মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে আসার পরও ছায়ার মতো তাঁকে অনুসরণ করেছে ঘাতক। একাধিকবার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে তিনি সংসদে প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হন। বসেন বিরোধীদলীয় নেতার আসনে। জনস্বার্থে ১৯৮৮ সালে পদত্যাগ করলেন। এরপর যুগপৎ আন্দোলন-সংগ্রাম। তাঁকে হত্যার চেষ্টা হয়েছে কয়েকবার—চট্টগ্রামে, কোটালীপাড়ায়। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে গ্রেনেড হামলা করা হয়েছে। বাংলার মানুষের ভালোবাসার কাছে পরাজিত হয়েছে শত্রু। এর পরও ষড়যন্ত্র কম হয়নি তাঁকে নিয়ে। ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই তাঁকে গ্রেপ্তার করাটাও ছিল গভীর এক ষড়যন্ত্র।

ষড়যন্ত্র এখনও থেমে নেই। দেশি ও বিদেশি ষড়যন্ত্র একত্রিত হয়ে এক গভীর ও সুনিপূণ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে। দেশছাড়া করা হয়েছে। স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি, মৌলবাদী ও জঙ্গিবাদীদের মিলিত শক্তিকে কাজে লাগিয়ে আওয়ামী লিগকে নিশ্চিহ্ন করার মিশন শুরু হয়েছে। সেই মিশনের অবস্থা আজ অনেকটা এক-এগারোর অপশক্তির মতোই। এদেরও হোচট খাওয়া শুরু হয়েছে। শিগগিরই নাক-মুখ দিয়ে রক্ত ঝরা শুরু হবে। কারণ, দেশের মানুষের শতভাগ আস্থা এখনো শেখ হাসিনার প্রতি।
অমৃতের সন্তান শেখ হাসিনা চেপে বসা এক-এগােরোর অপশক্তির কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন ২০০৮ সালের ১১ জুন। তাঁর মুক্তিতে সেদিন যেন মুক্তি পেয়েছিল রুদ্ধ গণতন্ত্র। তাঁকে মুক্তি দিয়েই নির্বাচনের দিকে এগোতে হয় সে সময়ের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে।
আমরা এরই মধ্যে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, আর এক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে চেপে বসা বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারও এরই মধ্যে পালানোর পথ খুঁজতে শুরু করেছে।
লেখক: সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সভাপতি, মানবাধিকারকর্মী, লেখক ও সাংবাদিক। মতামত ব্যক্তিগত।