একাধিক সূত্রের খবর বাংলাদেশ সরকার ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক সীমিত করতে চাইছে। পরবর্তী নির্দেশ জারি করা না পর্যন্ত দিল্লি, আগরতলা এবং শিলিগুড়ির ভিসা সেন্টার কেন্দ্রগুলি থেকে ভারতীয়দের বাংলাদেশে যাওয়ার ভিসা ইস্যু করা হবে না।

শেষ আপডেট: 23 December 2025 13:43
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে ফের সেদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়েছিল। একটু আগে সেই বৈঠক শেষ হয়েছে।
একাধিক সূত্রের খবর বাংলাদেশ সরকার ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক সীমিত করতে চাইছে। সোমবার তারা দিল্লি, আগরতলা এবং শিলিগুড়ির ভিসা সেন্টার বন্ধ করে দিয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ জারি করা না পর্যন্ত এই কেন্দ্রগুলি থেকে ভারতীয়দের বাংলাদেশে যাওয়ার ভিসা ইস্যু করা হবে না।
ঢাকায় বাংলাদেশে কট্টরপন্থী ইসলামিক নেতা ওসমান হাদির হত্যাকান্ড এবং ময়মনসিংহে হিন্দু তরুণ পেশায় শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে পুড়িয়ে খুনের ঘটনায় দু'দেশের সম্পর্কে আচমকা দ্রুত অবনতি হতে শুরু করেছে। হাদির হত্যাকারীদের ভারত আশ্রয় গিয়েছে বলে বাংলাদেশের নানা মহল থেকে প্রচার করা হচ্ছে। সেই অভিযোগের সত্যতা নিয়ে নীরব থেকে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার পরিস্থিতিকে আরো জোরালো করে তুলেছে। অন্যদিকে দীপু চন্দ্র দাসের হত্যাকাণ্ডে ভারত তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।
এই দুই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে দুই দেশেই কট্টরপন্থী কয়েকটি সংগঠন ময়দানে সক্রিয়। গত শনিবার রাতে দিল্লির চাণক্যপুরীতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের বাইরে একটি উগ্র হিন্দু সংগঠনের সমর্থকেরা বিক্ষোভ দেখায় বলে অভিযোগ। বাংলাদেশের দাবি নিরাপত্তা বাহিনীর শিথিলতা সুযোগ নিয়ে ওই সংগঠনের লোকেরা পাঁচিল টোপকে বাংলাদেশের হাইকমিশনের ভেতরে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করে। সে দেশের বিদেশ বিষয়ক উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন অভিযোগ করেছেন এর ফলে বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ ও তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়েছে। ওই ঘটনায় ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী বিদেশি মিশনকে নিরাপত্তা দেওয়ার বিষয়টি বিঘ্নিত হয়েছে।
যদিও ভারতের বিদেশ মন্তকের মুখপাত্র রণধীর জয়সাওয়াল বাংলাদেশ সরকারের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে পাল্টা বলেন যে এ নিয়ে মিথ্যা প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
অন্যদিকে শিলিগুড়িতে সোমবার কিছু মানুষ সেখানে বাংলাদেশের ভিসা সেন্টারের সামনে বিক্ষোভ দেখায়। তারা দিপু দাসের হত্যার প্রতিবাদ এবং বিচার দাবি করেন। বাংলাদেশ সরকার আচমকায় আগরতলায় তাদের কনসাল অফিস বন্ধ করে দিয়েছে। সেখান থেকেও ভিসা প্রদান বন্ধ আছে।
গত রবিবার বিদেশ উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন চলতি পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় আভাস দেন বাংলাদেশ সরকার প্রয়োজনে ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক সীমিত করতে পারে। এর অর্থ বাংলাদেশ সরকার ভারতে তাদের বেশ কিছ কনসাল অফিস/ভিসা সেন্টার গুটিয়ে নিতে পারে। একই সঙ্গে তারা কিছু কূটনীতিকে দেশে ফিরিয়েও নিতে পারে। যে পরিস্থিতি দু'বছর আগে কানাডার সঙ্গে ভারতের হয়েছিল।
তাৎপর্যপূর্ণ হলো ভারত বাংলাদেশ সম্পর্কের আচমকায় অতি দ্রুত অবনতি হলেও এখনো পর্যন্ত নয়া দিল্লির কোন পদস্থ কর্তা এমনকী বিদেশ সচিব পর্যন্ত মুখ খোলেননি। ভারত সরকারের তরফে যা বলার বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশের তরফে একেবারে সম্মুখ সমরে নেমে পড়েছেন সেদেশের বিদেশ উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। তিনি নিয়মিত সাংবাদিক বৈঠক ডেকে ভারতের বিরুদ্ধে গুচ্ছ অভিযোগ করছেন। যা থেকে মনে করা হচ্ছে, বাংলাদেশ সরকার খুব পরিকল্পিতভাবেই ভারতের সঙ্গে বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবনতি চাইছে।
অনেকেই মনে করছেন নির্বাচনের আগে ভারত বিরোধী মেজাজ জোরদার করা এর অন্যতম উদ্দেশ্য হয়ে থাকতে পারে। অতীতেও দেখা গিয়েছে আওয়ামী লীগ বিরোধী কোন শক্তি সে দেশে ক্ষমতায় থাকলে নির্বাচনে মুখ্য ইস্যু হয়ে ওঠে ভারত বিরোধিতা। এবার দ্বিতীয় আরও একটি কারণে বাংলাদেশ সরকার ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবনতি এবং অনির্দিষ্টকালের জন্য ভিসা দেওয়া বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকতে পারে। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যে নির্বাক বিদেশি নির্বাচনী পর্যবেক্ষক এবং বিদেশি সাংবাদিকদের জন্য নির্দেশিকা জারি করেছে। নির্বাচন কমিশন যাদের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ এবং যে সাংবাদিকদের কভার করার অনুমতি দেবে সরকার তাদের ভিসা দিতে বাধ্য। তবে আগে থেকেই ভিসা দেওয়া বন্ধ থাকলে সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে না। মনে করা হচ্ছে ভারতীয় পর্যবেক্ষক এবং সাংবাদিকদের নির্বাচনের সময় বাংলাদেশের ভূখণ্ডে থাকতে দিতে চাইছে না অন্তর্বর্তী সরকার। সেই কারণেই একপ্রকার উত্তেজনা তৈরি করে ভিসা সেন্টার বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে এবং কূটনীতিকদের তলব করে কঠোর বার্তা দিচ্ছে ঢাকা। কূটনৈতিক মহলের অনেকেই একে পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করা বলেও মন্তব্য করছে।
এর আগে প্রণয় ভার্মাকে গত ২১ ডিসেম্বর বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তলপ করা হয়েছিল হাই কমিশনার বিদেশ মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ অফিসার। তারা একটি দেশকে প্রতিনিধিত্ব করেন। এই পদমর্যাদার অফিসারকে কথায় কথায় বিদেশ মন্ত্রকে ডেকে পাঠিয়ে বাংলাদেশ সরকার পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে চাইছে বলে অনেকেই মনে করছেন। মোহাম্মদ ইউনুস সরকারের জমানায় ৬ বার ভারতের হাইকমিশনার অথবা ওই অফিসের কোন প্রতিনিধিকে বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রকে তলব করা হয়েছে।
চলতি মাসে বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহকে দিল্লিতে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়েছিল। তাঁকে বাংলাদেশে ভারতের মিশন গুলির নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য বলা হয়। জানা গেছে মঙ্গলবার প্রণয় ভার্মাকে ডেকে বাংলাদেশ সরকার ভারতে অবস্থিত তাদের মিশন গুলির নিরাপত্তা জোরদার করার দাবি জানায়। তবে এই ব্যাপারে এখনো পর্যন্ত ভারতের হাইকমিশনার বা বিদেশ মন্ত্র কোন মন্তব্য করেনি