ওসমান হাদির মৃত্যুর পর বাংলাদেশের অশান্ত পরিস্থিতির জেরে চট্টগ্রামের ভারতীয় ভিসা কেন্দ্র অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করল দিল্লি। একই সঙ্গে সিলেট-সহ অন্যান্য ভারতীয় কূটনৈতিক কেন্দ্রগুলিতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

সংগৃহীত ছবি
শেষ আপডেট: 21 December 2025 14:25
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ঢাকা-চট্টগ্রাম-সিলেট তিন শহরজুড়েই এখন চাপা আতঙ্ক। জুলাই আন্দোলনের অন্যতম ছাত্রনেতা ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদির (Osman Hadi) মৃত্যু ঘিরে যে আগুন জ্বলে উঠেছে বাংলাদেশে (Bangladesh), তার আঁচ এসে পড়ল ভারতীয় কূটনৈতিক পরিকাঠামোতেও। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিচার করে চট্টগ্রামের ভারতীয় ভিসা কেন্দ্র বা আইভ্যাক (IVAC) অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিল দিল্লি (Delhi)। একই সঙ্গে সিলেটের ভারতীয় উপদূতাবাস (Indian Deputy High Commission) ও ভিসা আবেদন কেন্দ্রের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে বলে খবর।
হাদির মৃত্যুর পর থেকেই বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে যেভাবে হিংসা, ভাঙচুর আর অগ্নিসংযোগ ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিই নয়, বিদেশি কূটনৈতিক মিশনগুলিও উদ্বেগের মধ্যে পড়েছে। সেই প্রেক্ষিতেই রবিবার থেকে চট্টগ্রামের আইভ্যাক বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রামে নিযুক্ত ভারতের সহকারী হাই কমিশনার (Assistant High Commissioner of India) জানিয়েছেন, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনার জেরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সেই কারণেই কোনও ঝুঁকি না নিয়ে ভিসা কেন্দ্র বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রামের আইভ্যাক-এর সমস্ত পরিষেবা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ থাকবে। এই সংক্রান্ত একটি বিজ্ঞপ্তি ইতিমধ্যেই ভিসা কেন্দ্রের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, “বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে আইভ্যাক (IVAC)। যেসব ভিসা আবেদনকারীর অ্যাপয়েন্টমেন্ট নির্ধারিত ছিল, তাঁদের জন্য নতুন তারিখ পরে জানানো হবে।”
হঠাৎ এই সিদ্ধান্তে স্বাভাবিক ভাবেই ভিসা আবেদনকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তবে কূটনৈতিক মহলের একাংশের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। বিশেষ করে যখন বিদেশি দূতাবাস ও ভিসা কেন্দ্রগুলিকেও জনরোষের মুখে পড়তে হচ্ছে।
চট্টগ্রামের পাশাপাশি সিলেটেও সতর্কতা তুঙ্গে। অশান্তির আশঙ্কায় সিলেটের ভারতীয় উপদূতাবাস এবং সংশ্লিষ্ট ভিসা কেন্দ্রে নিরাপত্তা আঁটসাঁট করেছে মহম্মদ ইউনুসের (Muhammad Yunus) অন্তর্বর্তী সরকার। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত ডেপুটি কমিশনার (মিডিয়া) সাইফুল ইসলাম (Saiful Islam) জানিয়েছেন, “বর্তমান পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তৃতীয় কোনও পক্ষ যাতে নতুন করে অশান্তি ছড়াতে না পারে, সেই কারণেই ভারতীয় উপদূতাবাস এবং ভিসা কেন্দ্রে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।” তাঁর কথায়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শুক্রবার সকাল থেকেই বাড়তি পুলিশি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ওসমান হাদির মৃত্যুর পর বৃহস্পতিবার রাত থেকেই বাংলাদেশে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি। ‘হাসিনা ফেরাও’ স্লোগান তুলে একাংশের বিক্ষোভ দ্রুত হিংসায় রূপ নেয়। অভিযোগ উঠেছে, প্রগতিশীল সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের লক্ষ্য করেই হামলা চালানো হয়েছে। ভাঙচুর করা হয়েছে একাধিক সংবাদমাধ্যমের অফিস। জনতার রোষ থেকে রেহাই পায়নি ভারতীয় দূতাবাস (Indian Mission) কিংবা আওয়ামি লিগের (Awami League) দপ্তরও। ধর্মনিরপেক্ষ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট (Chhayanaut)-এ অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনাও সামনে এসেছে।
হিংসার ভয়াবহ চিত্র আরও স্পষ্ট হয় চট্টগ্রামের ঘটনায়। সেখানে উন্মত্ত জনতার হাতে খুন হন এক সাংবাদিক। পাশাপাশি, ময়মনসিংহে (Mymensingh) নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় এক হিন্দু যুবককে। এই সব ঘটনাই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। মানবাধিকার সংগঠন থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে।
এই আবহেই চট্টগ্রামের আইভ্যাক বন্ধের সিদ্ধান্তকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, এটা শুধু একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, বরং বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান অস্থিরতার প্রতি ভারতের স্পষ্ট বার্তা। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত যে সতর্ক অবস্থান বজায় রাখা হবে, তারই ইঙ্গিত মিলছে এই সিদ্ধান্তে।