Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
ছত্তীসগড়ে পাওয়ার প্ল্যান্টে ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ! মৃত অন্তত ৯, ধ্বংসস্তূপের নীচে অনেকের আটকে পড়ার আশঙ্কাস্কি, ক্যান্ডেললাইট ডিনার আর পরিবার, বিয়ের জন্মদিনে কোন স্মৃতিতে ভাসলেন আলিয়া? পরপর দু’বার ছাঁটাই! চাকরি হারিয়ে 'বিহারি রোল' বানানো শুরু, এখন মাসে আয় ১.৩ কোটিনববর্ষে সস্তায় পেটপুরে খাওয়া! দুই বাংলার মহাভোজ একই থালিতে, হলিডে ইন-এ শুরু হচ্ছে ‘বৈশাখী মিলনমেলা’কষা মাংস থেকে কাটলেট! নববর্ষে তাজের সমস্ত হোটেলে জিভে জল আনা ভোজ, রইল সুলুকসন্ধানপিএসএল ছেড়ে আইপিএলে আসার কড়া মাশুল! ২ বছরের জন্য সাসপেন্ড কেকেআরের এই পেসার রণবীর-দীপিকার ৮ বছরের দাম্পত্যে বিচ্ছেদ! স্বামীর সঙ্গে বাড়তে থাকা দূরত্বই কি ডিভোর্সের কারণ?'বিজেপির কথায় চললে আমাদের কাছেও তালিকা থাকবে', পুলিশ কর্তাদের চরম হুঁশিয়ারি ব্রাত্য বসুর!একসময় নীতীশকেই কুর্সি থেকে সরানোর শপথ নিয়েছিলেন! তাঁর ছেড়ে যাওয়া পদেই বসলেন শকুনি-পুত্র‘একজনকে ধরলে হাজার জন বেরোবে...’, আইপ্যাক ডিরেক্টর গ্রেফতারের পরই নাম না করে হুঁশিয়ারি মমতার

বাংলাদেশে ভোট-ময়দানে জামাত যেন নয়ের দশকের বিজেপি, বাজপেয়ীর মতোই মধ্যপন্থী আমির শফিকুর

বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে জামাতের বদলে যাওয়া ভাষা ও কৌশল। আমির শফিকুরকে বাজপেয়ীর সঙ্গে তুলনা, ‘সুযোগ দিন’ বার্তা ও অতীত নিয়ে ক্ষমা—কীভাবে মধ্যপন্থার পথে হাঁটছে জামাত?

বাংলাদেশে ভোট-ময়দানে জামাত যেন নয়ের দশকের বিজেপি, বাজপেয়ীর মতোই মধ্যপন্থী আমির শফিকুর

ফাইল চিত্র

অন্বেষা বিশ্বাস

শেষ আপডেট: 8 February 2026 09:32

অমল সরকার

‘ভোটটা কি পচাইয়া দিমু, নাকি জামাতরে‌ দিমু। একবার জামাতরেই দিয়া দেখি না সে আমাদের জন্য কী করে।’

বছর পঞ্চাশ-পঞ্চানোর এক ভদ্রলোকের এই বক্তব্যের ভিডিও বাংলাদেশে এখন‌ সমাজ মাধ্যমে সুনামির গতিতে‌ ছড়িয়ে পড়ছে। অনেকেই বলছেন, এটা আসলে জামাতের আইটি‌ সেলের‌ কাজ।‌ কারণ, ভিডিওর অতি সাধারণ এক নাগরিকের কথাই আসলে‌ বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটির প্রচারের মূল কথা—সুযোগ দিন।‌ ঠকবেন না‌। ভোট না পচানোর আর্জি আওয়ামী লিগের ভোটারদের উদ্দেশ্য করে। এই নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় যে দলটি ভোট বয়কটের ডাক‌ দিয়েছে। তাদের অন্তত ৪০ শতাংশ ভোট আছে বলে দাবি আওয়ামী লিগের। আওয়ামী লিগ সমর্থকদের নিরাপত্তা এবং অন্যান্য নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে জামাত বলছে, বুথে গিয়ে ভোটটা তাদের দিতে। প্রতিটি প্রচার সভায় এর ব্যাখ্যাও‌ দিচ্ছেন জামাত নেতারা‌।

যেমন, বরিশালের‌ মেহেন্দিগঞ্জে এক জনসভায় জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলছেন, ‘স্বাধীনতার পর বারে বারে সরকার বদল হলেও মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। জনগণ এবার পরিবর্তনের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।’ বিশাল জনসভায় জামাতের আমির নাম না করে বিএনপিকে তীব্র আক্রমণ শানান। শুক্রবারের ওই সভায় তিনি আরও বলেন, ‘জুলাই বিপ্লবের পর একটি বড় দলের নেতা-কর্মীরা মামলা বাণিজ্য, চাঁদাবাজি ও দখলদারিতে লিপ্ত হয়েছে।’

বাংলাদেশের দক্ষিণ প্রান্তের নড়াইল এবং ফরিদপুরের জনসভায় জামাতের আমির আরও বলেছেন, ‘দেশ‌ স্বাধীন‌ হওয়ার পর বিগত ৫৪ বছরে যাদের দেখেছি তাদের আমলনামা (কাজের খতিয়ান) আমাদের জানা আছে। গণ অভুত্থান পরবর্তী বিগত‌ ১৭‌ মাস যাদের দেখেছি তাদের আমলনামাও‌ আমাদের সামনে আছে।‌ যাদের আমলনামা ভাল, ভোট‌ তাদের দেওয়া উচিত।’ নাম না করে বিএনপিকে ঠেস দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘যারা নিজেদের দল সামলাতে পারেন না, তারা কী‌ করে‌ দেশ চালাবে! তারা দেশ‌ সামলাতে পারবে না। যারা নিজেদের দল সামলাতে পারে, তাদেরই দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া উচিত।’

দিন পাঁচেক আগে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের শহর রাজশাহী, রংপুরের বিভিন্ন সভার আরও স্পষ্টভাবে তিনি তুলে ধরেন দলের কথা। বলেন, ‘আমরা নিজেদের দলটাকে পাহারা দিয়েছি। এতদিন পাহারাদারি করেছি দলকে।‌ এখন আপনারা সুযোগ দিলে আমরা দেশের ১৮ কোটি মানুষের চৌকিদারি করতে চাই। তাদের জীবন, সম্পদ ও ইজ্জতের পাহারাদার হতে চাই।’ উত্তরাঞ্চলের শহরগুলির‌ প্রচার সভায় জনতার উদ্দেশে‌ তিনি আরও বলেছেন, ‘আপনারা যদি সুযোগ দেন আপনাদের আস্থার প্রতিদান দেওয়া আমাদের জন্য ওয়াজিব (কর্তব্য) হবে।

শুধু আমির শফিকুর রহমানই নন, জামাতের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা মিয়া গোলাম পরওয়ার ও‌ বাকি নেতারাও‌ বলছেন, একবার সুযোগ দিয়ে‌ দেখুন। ‌আপনারা সুযোগ দিলে আমরা প্রমাণ করে দেব, জামায়াতে ইসলামী ভিন্ন জাতের দল। ‘দ্য ওয়াল’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পরোয়ার খোলাখুলি বলেছেন, আমরা সুযোগ চাইছি।‌ বাংলাদেশের মানুষ আওয়ামী লিগ, বিএনপি ও‌ জাতীয় পার্টির নেতৃত্বাধীন সরকার দেখছে। একবার আমাদেরও‌ দেশ পরিচালনার‌ সুযোগ দিক।‌ তখন মানুষ বুঝবেন, জামাত অন্য জাতের দল।’

জামাত নেতাদের এই বক্তব্য ঢাকার এক প্রবীণ সাংবাদিককে গত শতাব্দীর আট-নয়ের দশকে ভারতের নির্বাচনী প্রচার মনে করিয়ে দিয়েছে।‌ সেই‌ সময় ঢাকার একটি দৈনিকের দিল্লি প্রতিনিধি হিসাবে ভারতের তৎকালীন নির্বাচনী রাজনীতির চালচিত্র তাঁর স্মৃতিতে এখনও প্রখর। তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশে এবারের নির্বাচনে জামাত নেতাদের ভাষণ শুনে অটল বিহারী বাজপেয়ী, লালকৃষ্ণ আডবানীদের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। মনে পড়ে যাচ্ছে বিজেপির ‘পার্টি উইথ এ ডিফারেন্স’ স্লোগানের কথা। কংগ্রেস ও‌ তৃতীয় ফ্রন্টের বিকল্প হিসেবে বিজেপিকে একবার সুযোগ দিতে প্রতিটি সভায় কাতর‌ আবেদন জানাতেন‌ ওই নেতারা।’ যেমন, জামাতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মহম্মদ তাহের বলেছেন, ‘গত ৫৫ বছর ধরে বাংলাদেশ মূলত দুটি দল, আওয়ামী লিগ ও বিএনপির দ্বারা শাসিত হয়েছে। মানুষের ওই দুই দলের বিষয়ে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আছে। মানুষ দেশের জন্য একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তি চায়।’

শুধু ক্ষমতায় আসার কাতর আর্জিই নয়, আমির শফিকুর রহমানের সঙ্গে অনেকে অটল বিহারী বাজপেয়ীল মিল দেখতে পান। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন প্রয়াত বাজপেয়ী। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেও প্রতিপক্ষকে ধারালো আক্রমণ শানাতেন না তিনি। বিরোধীরাও মানত বাজপেয়ী অনেক বেশি সহনশীল মানুষ।  

বাংলাদেশে এবারের নির্বাচনে জামাতের বিরুদ্ধে বিএনপি জোরালো আক্রমণ শানাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধে তাদের ভূমিকা নিয়ে। অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে ১৯৭১-এ বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে বিরোধী অবস্থান নিয়েছিল জামায়াতে ইসলামী। দলের তৎকালীন নেতৃত্বের অবস্থান সঠিক কী বেঠিক সেই বিতর্কে না ঢুকে অতীতের কৃতকর্ম নিয়ে ক্ষমা চেয়েছেন জামাতের বর্তমান আমির। শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘শুধু ১৯৭১ নয়, ১৯৪৭ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত আমাদের দ্বারা যত মানুষ কষ্ট পেয়েছেন, কেউ যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকেন সেই সকল মানুষের কাছে তাদের সকলের কাছে আমি বিনা শর্তে ক্ষমা চাইছি।’

এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন, আমরা আদর্শবাদী দল। আমরা বিশ্বাস করি মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। আর মাফ চাওয়ার মধ্যে কোনও পরাজয় নেই, লজ্জা নেই। আমার মানবিক মূল্যবোধ আর দায়িত্বের জায়গা থেকে ক্ষমা চেয়েছি।’ উল্লেখযোগ্য হল, জামাতের এই আমিরের সময়েই এই প্রথম এবারের ভোটে দলটি খুলনা-১ আসলে কৃষ্ণ নন্দী নামে এক হিন্দু ব্যবসায়ীকে প্রার্থীও করেছে। যদিও রাজনৈতিক মহল মনে করছে, এটা আসলে হিন্দু ভোট পাওয়ার কৌশল। বিজেপি-কে বাজপেয়ী কট্টর হিন্দুত্ববাদী দল বলে মানতেন না। বারে বারেই এই বয়ানের বিরোধিতা করছেন। জামাতের বর্তমান আমিরও তাঁর দল সম্পর্কে ‘কট্টর’ তকমায় আপত্তি তুলেছেন। বলেছেন, ‘জামাত একটি মধ্যপন্থী ইসলামিক দল।’

মিল আরও আছে। প্রধান প্রতিপক্ষ কংগ্রেসের দুর্দিনে দলকে ক্ষমতায় আনতে সমর্থ হয়েছিলেন বাজপেয়ী-আডবানীরা। বাংলাদেশে জামাতের প্রধান প্রতিপক্ষ আওয়ামী লিগ এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না, তাই শুধু নয়, মহম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকার সন্ত্রাস দমন আইনে তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে রেখেছে। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এই অনুকূল পরিস্থিতির সুযোগ নিতে চাইছে জামাত।‌

শেখ হাসিনার ১৬ বছরের শাসনামলে জামাত নানা ধরনের দমন পীড়নের শিকার হয়। গণ অভুত্থাননের দিন কয়েক আগে হাসিনা সরকার‌ দলটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।‌ ১৯৭১-এ‌ প্রথমবার দলটি নিষিদ্ধ হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ ও‌ বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করায় প্রথম রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দলটিকে‌ নিষিদ্ধ করেন। অন্যদিকে, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান জামাত সহ ধর্মভিত্তিক সব দলকে রাজনীতি করার অধিকার ফিরিয়ে দেন।

তার আগে আদালতের রায়ে বহু বছর দলটির নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন বাতিল ছিল।‌ হাসিনা সরকারের পতনের পর তারা ভোটে লড়ার করার অধিকার ফিরে পায় আদালতের রায়েই।‌ সেই ধারাবাহিকতায় ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়ার সরকারকে‌ বাইরে‌ থেকে সমর্থন দেয় জামাত। ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত দুই দলের জোট সরকার ক্ষমতায় ছিল। ২০০৮-এ আওয়ামী লিগ ফের ক্ষমতায় আসার পর পুনরায় জামাতের দুর্দিন শুরু হয়। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা এবং মানবতা বিরোধী অপরাধে যুক্ত থাকার অভিযোগে হাসিনা সরকার জামাতের কয়েকজন শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করে। বিচারে কয়েকজন‌ নেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ঘটনাচক্রে ওই ট্রাইব্যুনালই গত বছর ১৭ নভেম্বর শেখ হাসিনাকে গত অভ্যূত্থান দমনে মানবতা বিরোধী অপরাধে যুক্ত থাকার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে।


```