গত সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসুর নির্বাচন দিয়ে শুরু হয়েছে বাংলাদেশ ছাত্র ভোট্। তিরিশ বছর পর আজ বৃহস্পতিবার ছাত্র সংসদ ভোট হতে যাচ্ছে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে।

ফাইল ছবি
শেষ আপডেট: 11 September 2025 10:14
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (Dhaka University) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামির (Jamat Islam) ছাত্র সংগঠন ইসলামিক ছাত্র শিবিরের বিপুল জয় নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে (Bangladesh Politics) টালমাটাল শুরু হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশের বিগত ৫৩ বছরের ইতিহাসে শিবিরের মতো স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির জয় এই প্রথম। তারা শুধু ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং সাধারণ সম্পাদকের মতো পদগুলিই নয়, সম্পাদকমণ্ডলীর ১২টি পদের নয়টিকে জয়লাভ করেছে। আরও লক্ষণীয় হল, জামাতের ছাত্র সংগঠনের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন বিপুল ভোটের ব্যবধানে। তাদের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির (BNP) ছাত্র দলের চাইতে ১০-১২ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন শিবিরের প্রার্থীরা। যে ফলাফল শুধু রাজনৈতিক দলগুলিই নয়, চমকে দিয়েছে ভোট বিশ্লেষকদেরও।
গত সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসুর নির্বাচন দিয়ে শুরু হয়েছে বাংলাদেশ ছাত্র ভোট্। তিরিশ বছর পর আজ বৃহস্পতিবার ছাত্র সংসদ ভোট হতে যাচ্ছে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। এরপর রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভোট হবে। ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা ছিল রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির ভাল ফল করতে পারে। কারণ, বহু বছর সেখানে তাদের সংগঠন শক্তিশালী। আওয়ামী লিগের ছাত্র সংগঠন ছাত্র লিগের অনুপস্থিতিতে ডাকসুতে বিএনপির ছাত্রদল সংসদ দখল করবে, কিছু আসন ছাত্র শিবির পেতে পারে, এমনটাই ধারণা করা হয়েছিল ভোটের আগে।
কিন্তু সব অঙ্ক বদলে দিয়েছে সোমবারের ডাকসুর নির্বাচনের ফলাফল। ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ছাত্র হস্টেল যা 'হল' নামে বেশি পরিচিত সেখানেও ভোট হয়। শেখ মুজিব, বেগম, মেজর জিয়া হল, ফজলুতুন্নেছা মুজিব, সূর্যসেন হল ইত্যাদিতে বিপুল সমর্থন পেয়েছে স্বাধীনতার যুদ্ধের বিরোধিতাকারী জামাত শিবিরের প্রার্থীরা। একমাত্র সংখ্যালঘু ছাত্রদের জন্য বরাদ্দ জগন্নাথ হলে তারা সুবিধা করতে পারেনি। ছাত্র লিগ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় সংখ্যালঘু পড়ুয়ারা বিএনপির ছাত্রদলকে সমর্থন করে।
ডাকসুর নির্বাচনকে বাংলাদেশে মূল ধারার রাজনীতি থেকে আলাদা করে দেখা হয় না। প্রথাগতভাবে ছাত্র সংসদের প্রেসিডেন্ট হন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। ছাত্রদের মধ্যে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদটিই সর্বোচ্চ। ওই পদে থাকা অনেক ছাত্রছাত্রী পরবর্তীকালে মূল ধারার রাজনীতিতে এসে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পেয়েছেন।
ডাকসুর মতে গুরুত্বপূর্ণ ভোটে লজ্জার হার নিয়ে বিএনপি নেতৃত্ব চরম বিপাকে পড়েছে। গত বছর গণঅভ্যুত্থানের পর এই প্রথম বাংলাদেশে কোনও বড়মাপের ভোট হল। ডাকসুর নির্বাচনে যে ৩৯ হাজার ভোটারের প্রায় ৭০ শতাংশই জীবনে প্রথমবার ভোট দিয়েছেন। ডাকসুর শেষ ভোট হয়েছিল ২০১৯-এ। গত বছর দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৪০ শতাংশ। তরুণ সমাজের বড় অংশ সেই ভোট বয়কট করে। ফলে ডাকসুর এবারের ভোট হয় উৎসবের মেজাজে।
সেই ভোটে জামাতের ছাত্র সংগঠন ইসলামি ছাত্র শিবিরের বিপুল জয়ে বিপাকে পড়ল বিএনপি, মনে করছে দলেরও একাংশ। আওয়ামী লিগের ছাত্র সংগঠন ছাত্র লিগ নিষিদ্ধ থাকায় জামাত-শিবিরকে মোকাবিলার প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল খালেদা জিয়ার দলের। তারা সেই কাজে চরম ব্যর্থ হয়ে দায় চাপাচ্ছে আওয়ামী লিগের বিরুদ্ধে। বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাস অভিযোগ করেছেন ছাত্র দলকে আটকাতে ছাত্র লিগ তাদের ভোট জামাত শিবিরকে ট্রান্সফার করেছে।
যদিও বিএনপি নেতার এই বক্তব্য বেশিরভাগের কাছেই বিশ্বাসযোগ্য হয়নি। কারণ, ছাত্র লিগ ক্যাম্পাসে নেই। তাদের শত শত সমর্থকের ছাত্রত্ব বাতিল করে দেওয়া হয়েছে৷ প্রাণভয়ে বহু পড়ুয়া ক্যাম্পাসে আসতে, পরীক্ষায় বসতে পারছে না। তাছাড়া জগন্নাথ হলের ফলাফলও বলছে ছাত্র লিগের ভোট শিবিরের বাক্সে যায়নি। একমাত্র ওই হলে শিবির সুবিধা করতে পারেনি।

প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুস এবং জামায়াতে ইসলামির আমির শফিকুর রহমান
প্রশ্ন হল, আপাত ক্ষুদ্র শক্তি বাংলাদেশ ইসলামি ছাত্র শিবির কীভাবে ডাকসুতে বাজিমাত করল? ওয়াকিবহাল মহল এর একাধিক কারণ মনে করছে্। প্রথমত তারা মনে করছে, গণ-অভ্যুত্থান আড়াল থেকে শিবিরই পরিচালনা করেছে, তাদের এই দাবিকে তারা ছাত্র সমাজের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পেরেছে। বিএনপির ছাত্রদল দল এই ধারণা জোরদার করতে পারেনি। অন্যদিকে, প্রকাশ্যে গণঅভ্যুত্থান পরিচালনা করা বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব পালাবদলের পরই ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। রাজনীতির জায়গা দখল করে তাদের অদৃশ্য অভিভাবক জামায়াতে ইসলামি। ফলে এক বছর আগে যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে তারা গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত করে সেখানেই এই ছাত্র সংগঠন দাঁত ফোটাতে পারল না। অন্তর্কলহে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।
কিন্তু বিএনপি ছাত্রদল কেন ব্যর্থ হল? রাজনৈতিক মহলের মতে ডাকসুর নির্বাচনের আগেই ছাত্রদলের দাদাগিরি, চাঁদাবাজি, সিন্ডিকেটরাজে নবীন পড়ুয়া, বিশেষ করে ছাত্রীরা বিরক্ত ছিল। প্রচারে আভাস মিলেছিল ছাত্রীদের মধ্যে জনপ্রিয়তা তুলনায় বেশি শিবিরের ভিপি প্রার্থীর।
রাজনৈতিক মহল মনে করছে ডাকসুর ভোটে ছাত্র দলের বিপর্যয়ে বড় ধাক্কা খেল বিএনপি। অন্যদিকে দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়ল জামাতের। তারা এবার জাতীয় সংসদের আগে স্থানীয় সরকার ভোট আগে করানোর দাবি তুলবে। সংস্কারের আগে জাতীয় সংসদ ভোট নয় এবং প্রাপ্ত ভোটের নিরিখে সাংসদ নির্বাচনের দাবিও জোরদার করবে তারা। এই সব বিষয়েই বিএনপির সঙ্গে জামাতের চরম বিরোধ রয়েছে। ডাকসুর ভোটে শিবিরের বিপুল জয়ে এবার সরকারের উপর আরও চাপ, প্রয়োজনে ময়দানে শক্তি প্রদর্শনের পথেও হাঁটতে পারে জামাত। এক কথায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের নির্বাচনের সুবাদে জামায়াতে ইসলামির শক্তি বৃদ্ধি হল বলা চলে।