অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তিনি সরকারের সঙ্গে কোনোভাবেই বিবাদে জড়াননি। প্রায় শতাধিক অর্ডিন্যান্স অনুমোদন করেছেন।
.jpg.webp)
প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা রাষ্ট্রপতির
শেষ আপডেট: 23 February 2026 13:38
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মহম্মদ সাহাবুদ্দিন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান (Bangladesh PM Tarique Rahman) এবং বিএনপি নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। সেই সঙ্গে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন বিগত অন্তর্বর্তী সরকার ও প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুসের (Md Yunus) বিরুদ্ধে। এক বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি বলেছেন অন্তর্বর্তী সরকার এবং সাবেক প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুস বিগত আঠারো মাসে তাঁকে একাধিকবার সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বিএনপি নেতৃত্ব পাশে থাকায় তাঁদের কোনও ষড়যন্ত্র সফল হয়নি।
রাষ্ট্রপতি বলেছেন, গণঅভ্যুত্থানের পর যেভাবে গণভবন ভাঙচুর, লুটপাট করা হয়েছিল একইভাবে রাষ্ট্রপতির অফিস-বাসস্থান বঙ্গভবনও (Bangabhavan) লুটপাট করার পরিকল্পনা ছিল ষড়যন্ত্রীদের। তিনি বলেছেন, অনেক রাত পর্যন্ত বঙ্গভবন ঘিরে রাখা হয়েছিল যাতে তিনি বাধ্য হন পদত্যাগ করতে।
ঢাকার (Dhaka) জনপ্রিয় সংবাদপত্র কালের কণ্ঠকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের এই বক্তব্য ঘিরে নয়া জল্পনা তৈরি হয়েছে। নির্বাচনের মাস দুই আগে তিনি একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়ে রেখেছিলেন যে ভোট মিটতেই সরে যাবেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮-এর মাঝামাঝি সময়। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের কাছ থেকে পদে পদে অসম্মানিত হওয়ায় তিনি মাঝপথে বিদায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

কালের কন্ঠকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি যেভাবে বিএনপি নেতৃত্ব এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের (BNP Chairperson Tarique Rahman) ভূয়সী প্রশংসা করেছেন তাতে অনেকে মনে করছেন, রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন মতবদল করে থাকতে পারেন। তিনি পুরো মেয়াদ থেকে যাওয়ার ভাবনা চিন্তা করছেন বলে অনেকের ধারণা। সেই কারণেই তিনি সংবাদ মাধ্যমকে ডেকে জানিয়ে রাখলেন যে বিএনপি (BNP) নেতৃত্ব তাঁকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পদে পদে সহযোগিতা করেছে। এখন তিনি নিজে থেকে সরে না গেলে সরকার এবং বিএনপি নেতৃত্ব তাঁর উপর চাপ সৃষ্টি করলে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে এমনটাই হয়তো মনে করছেন রাষ্ট্রপতি। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, সাক্ষাৎকারে সাহাবুদ্দিনের আগাম বিদায় নেওয়ার বিষয় উত্থাপন করা হয়নি।
এমনও হতে পারে তাঁকে তাঁর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মহল, সেনাবাহিনী এবং আমলাদের একাংশ পুরো মেয়াদ থেকে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি সরে যাবেন ধরে নিয়ে বিএনপিতে আলোচনার চলছে কে হবেন পরবর্তী রাষ্ট্রপতি।
কোনও কোনও মহল থেকে বলা হচ্ছে এই ব্যাপারে তারেক রহমানের (Tarique Rahman) সঙ্গে আগেই বোঝাপড়া হয়ে আছে সদ্য প্রাক্তন প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুসের। এছাড়া বিএনপির তিন শীর্ষ নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, মঈন খান এবং নজরুল ইসলাম খানের নাম রাষ্ট্রপতি পদের জন্য বিবেচনায় আছে। কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহলের ধারণা বিএনপি নেতৃত্ব বা সরকার রাষ্ট্রপতিকে সরে যেতে চাপ সৃষ্টি করলে জটিল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
বিএনপি নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত কী করে রাষ্ট্রপতি সম্ভবত তা বুঝে নিতে চাইছেন। ২০২৩ সালে আওয়ামী লিগের প্রার্থী হিসেবে সাহাবুদ্দিন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পছন্দের মানুষ।
তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তিনি সরকারের সঙ্গে কোনওভাবেই বিবাদে জড়াননি। প্রায় শতাধিক অর্ডিন্যান্স অনুমোদন করেছেন। ফলে আওয়ামী লিগের মনোনীত রাষ্ট্রপতি হলেও তিনি সরকারের সঙ্গে সংঘাতে না জড়ানো নজির তৈরি করেছেন। তাঁকে সরাতে গেলে বিএনপি নেতৃত্ব খানিক প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
তবে তারেক রহমানের দলে একাংশের ভাবনা হল, টানা ১৩ বছর দেশে আওয়ামী লিগের (Awami League) মনোনীত ব্যক্তি রাষ্ট্রপতির পদে আছেন। সাহাবুদ্দিনের আগে টানা ১০ বছর রাষ্ট্রপতি ছিলেন আব্দুল হামিদ।
রাষ্ট্রপতি সাক্ষাৎকারে বলেছেন তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি'র শীর্ষ মহল থেকে তাঁকে বারে বারে আশ্বস্ত করা হয়েছিল যেন কোনও অবস্থাতেই তিনি ইস্তফা না দেন। বিএনপি নেতৃত্ব তাঁকে আশ্বাস দেয় যে তাঁরা তাঁর পাশে আছে।
রাষ্ট্রপতি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সেনাবাহিনীর ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেছেন, তিন বাহিনীর তরফ থেকেও তাঁকে বার্তা দেওয়া হয়েছে যে কোনও অবস্থাতেই তিনি যেন আগাম ইস্তফা দিয়ে না বসেন।
প্রসঙ্গত বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি হলেন তিন বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে সেনাবাহিনীর তিন প্রধান রাষ্ট্রপতির পাশে উপস্থিত থাকেন।
রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তাঁকে বঙ্গভবন থেকে সরিয়ে দিতে কীভাবে অন্তর্বর্তী সরকার পদে পদে ষড়যন্ত্র করেছিল। বারে বারে চেষ্টা হয়েছে তাঁকে অসম্মান, অপদস্ত করে পদত্যাগে বাধ্য করতে। কিন্তু তিনি বিভিন্ন মহল থেকে আশ্বাস পেয়ে মানসিকভাবে নিজেকে সুস্থির, দৃঢ় অবস্থান বজায় রেখেছিলেন।
সাহাবুদ্দিন বলেছেন, দু'বার অন্তর্বর্তী সরকার তাঁকে বিদেশ সফরে যাওয়ার অনুমতি দেয়নি। কসোভোতে একটি অনুষ্ঠানে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার ছাড়পত্র দেয়নি। কাতার সরকারও সে দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁকে আমন্ত্রণ জানায়। সাহাবুদ্দিন বলেছেন, সেই আমন্ত্রণের বিষয়টি সরকার তাঁর কাছে চেপে গিয়েছিল। পরে একটি চিঠি ড্রাফট করে তাঁকে পাঠিয়ে বলা হয় সই করে দিতে। তাতে লেখা ছিল, 'জরুরি রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যস্ত থাকায় তাঁর পক্ষে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না।'
সাহাবুদ্দিন বলেছেন, আমি ওই চিঠি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠিয়ে তাদেরকে সাবধান করে দিয়েছিলাম ভবিষ্যতে যাতে এই ধরনের কোনও পদক্ষেপ না করা হয়।
সাহাবুদ্দিন আরও কিছু ঘটনা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, একজন উপদেষ্টা বিদেশে বাংলাদেশ মিশনে গিয়ে রাষ্ট্রপতির ছবি দেখতে পেয়ে চোটপাট করেন এবং বাধ্য করেন দ্রুত সরিয়ে ফেলতে। যদিও সাংবিধানিক বিধি অনুযায়ী বিদেশি দূতাবাসগুলিতে সংবিধানের রক্ষক হিসেবে রাষ্ট্রপতির ছবি থাকাটাই রীতি।
সাহাবুদ্দিন বলেছেন সব বিদেশি মিশন থেকে তাঁর ছবি সরিয়ে ফেলা হয়েছে জানতে পেরে তিনি বিদেশ বিষয়ক উপদেষ্টাকে চিঠি দিয়ে এই বিষয়ে জানতে চান। উপদেষ্টা তাঁকে জানান এই বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।
তিনি আরও বলেছেন, প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে মহম্মদ ইউনুসের শপথ গ্রহণের দিনে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী, প্রধান উপদেষ্টা বিদেশ সফরে গেলে ফিরে এসে রাষ্ট্রপতিকে বিস্তারিত লিখিতভাবে অবগত করেন এবং ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাৎ করে আলোচনা করে থাকেন। কিন্তু মহম্মদ ইউনুস প্রায় ১৫ বার বিদেশ সফর করলেও একবারও ফিরে এসে তাঁর সঙ্গে দেখা করেননি। কোনও জাতীয় দিবস বা রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমেও প্রধান উপদেষ্টা সৌজন্য সাক্ষাতের প্রয়োজন বোধ করেননি।