হাসিনার দল ভোটে নেই, তবু বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন একটাই কথা, ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ আর বাংলার রিগিং মডেল। ছাপ্পা, রিগিং, নামভোট—নির্বাচনের আবহে আবারও তুঙ্গে বিতর্ক।

শেষ আপডেট: 10 February 2026 11:16
ঢাকা
সোমবার বিকালের বিমানে ঢাকা এলাম। আগামী বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য ভোট নেওয়া হবে। ইন্ডিগোর জিই-১১০৬ নম্বরের ফ্লাইটটি নির্ধারিত সময়েই ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেয়। বিমান প্রায় ভর্তিই ছিল।
অতীতেও বাংলাদেশে ভোট কভার করার অভিজ্ঞতা আছে। এই ধরনের অ্যাসাইনমেন্টে কলকাতার সাংবাদিকেরা কাজ শুরু করেন বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর থেকেই। আমিও ব্যতিক্রম নই। কয়েকজন সহযাত্রীর সঙ্গে আলাপ করে কথা শুরু করলাম। অনেকেই ভোট দিতে বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছেন। বেশ কয়েকজন থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া থেকে কলকাতা হয়ে ঢাকায় এলেন। এতে নাকি খরচ কম হয়।

ভারত ও বাংলাদেশ, দুই দেশই ভিসা দেওয়া সীমিত করে রেখেছে। ফলে সরাসরি ভারতের যাত্রী তুলনায় কম। কেউ কেউ কলকাতা, চেন্নাই, দিল্লিতে চিকিৎসা করিয়ে দেশে ফিরলেন।
কলকাতা বিমানবন্দরের লাউঞ্জে কথা হচ্ছিল ঢাকার এক বাসিন্দার সঙ্গে। তিনি ব্যবসায়ী। ব্যাঙ্কক থেকে কলকাতা হয়ে ঢাকা ফিরলেন। ভোটের খবর জানতে চাইলাম। তাঁর জবাব শুনে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামের সেই অখ্যাত ভদ্রলোকের অসাধারণ মন্তব্যটি মনে পড়ে গেল। হাওয়া কোনদিকে জানতে চাইলে যিনি বলেছিলেন, 'হাওয়া চতুর্দিকে।'
ঢাকার ব্যবসায়ী ভদ্রলোক নিজেই জানালেন তিনি আওয়ামী লিগের সমর্থক। আওয়ামী লিগের বিপর্যয়ে তিনিও তাই চিন্তিত। তবে তিনিও বললেন, এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, বহু বছর পর ভোটের ফল নিয়ে কেউ একশো শতাংশ নিশ্চিত নয়। তিনি স্বীকার করলেন, শেখ হাসিনার সময়ের একতরফা নির্বাচনগুলিতে মোটের উপর জানাই ছিল, আওয়ামী লিগ ফের ক্ষমতায় ফিরবে। এবার কিন্তু বলা যাচ্ছে না, এবারের ভোটের ময়দানে সবচেয়ে বড় দল বিএনপি-ই ১৭ বছর পর ক্ষমতায় ফিরতে চলেছে।
আওয়ামী লিগ সমর্থক মাঝ বয়সি ভদ্রলোকের কথায় যে দল যত দক্ষতার সঙ্গে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করতে পারবে তাদের জয়ের সম্ভাবনা তত বেশি। তাঁর কথায় সায় দেন সহযাত্রী আর এক বাংলাদেশি নাগরিক।
দ্বিতীয় জনের বক্তব্য, বিএনপি আওয়ামী লিগের মতো বড় পার্টি বটে। কিন্তু জামায়াতে ইসলামীর মতো জাল বিছানো সংগঠন তাদের নেই। তিনি যোগ করেন, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আওয়ামী লিগ, বিএনপি, জামাত, সব দলেই ডিগ্রিধারীর ছড়াছড়ি।
তাঁর কথা শুনে মনে হল ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বুঝি নির্বাচন সংক্রান্ত উচ্চশিক্ষার কোনও কোর্স। ভারতে নির্বাচন কমিশন ২০১১ সালে চালু করে ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ডেমোক্রেসি এন্ড ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট। সেখানে মূলত সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন পরিচালনার নিয়ম-কানুন শিখিয়ে সরকারি আধিকারিক-কর্মচারীদের পারদর্শী করে তোলা হয়। বাংলাদেশেও একই উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছে বাংলাদেশ নির্বাচন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।
ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গাড়িতে হোটেলে পৌঁছে দিলেন মহম্মদ সেলিম। বছর ষাটের ভদ্রলোক ১৯৮৫ সাল থেকে ঢাকায় গাড়ি চালাচ্ছেন। তিনি অবশ্য বলছিলেন, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে আওয়ামী লিগ যে নজির গড়ে গেছে বাকি দলগুলি তাদের ধারেকাছে নেই। তাঁর কথায়, ২০১৮-র মতো দিনের ভোট রাতে করার নজির কোনও জমানায় নেই। জাপানের অ্যাম্বাসেডর এ নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ ও প্রশ্ন তুলে গোটা বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের মাথা নত করে দিয়ে গেছেন।
বিমান বন্দরের মুখ থেকে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ধরে মূল শহরে এলাম। চালক ভদ্রলোক বলছিলেন, এই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে শেখ হাসিনার অবদান। এ রকম অসংখ্য ভাল কাজ করেছেন তিনি। তারপরও কেন নির্বাচনে দিনের ভোট রাতে করিয়েছিলেন মাথায় ঢোকে না। উনি দেশটাকে সাজাচ্ছিলেন। নিজেই আবার নিজেকে ধ্বংস করেছেন।
জানতে চাইলাম, এবার তো শেখ হাসিনা, আওয়ামী লিগ ময়দানে নেই।এবার কেন ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কথা বলা হচ্ছে? চালক ভদ্রলোকের মতে, 'এবার জয়ের ব্যাপারে কেউ শতভাগ নিশ্চিত নয়। যে যেখানে শক্তিশালী সেখানে খেল দেখাতে চাইবে।' সেই সঙ্গে যুক্ত করেন, সব দলের উচিত হাসিনার জামানা থেকেই শিক্ষা নেওয়া। ভোটাধিকার হরণ মানুষ কখনই মেনে নেয় না। এটা শুধু হাসিনার জমানা নয়, অতীত প্রমাণিত হয়েছে। তবে নিঃসন্দেহে আওয়ামী লিগ এই ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করেছিল।
তিনি যদিও মনে করেন দলগুলি কতটা শিক্ষা নিয়েছে তা নিয়ে সংশয় আছে। তাঁর কথায়, যে দল যত দক্ষতার সঙ্গে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করতে পারবে তাদের জয়ের সম্ভাবনা তত বেশি।
বিমানে আমার সহযাত্রী আর এক বাংলাদেশি নাগরিক বলছিলেন, বিএনপি আওয়ামী লিগের মতো বড় পার্টি বটে। কিন্তু জামায়াতে ইসলামীর মতো জাল বিছানো সংগঠন তাদের নেই। তিনি যোগ করেন, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আওয়ামী লিগ, বিএনপি, জামাত, সব দলেই ডিগ্রিধারীর ছড়াছড়ি।
তাঁর কথা শুনে মনে হল ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বুঝি নির্বাচন সংক্রান্ত উচ্চশিক্ষার কোনও কোর্স। ভারতে নির্বাচন কমিশন ২০১১ সালে চালু করে ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ডেমোক্রেসি এন্ড ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট। সেখানে মূলত সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন পরিচালনার নিয়ম-কানুন শিখিয়ে সরকারি আধিকারিক-কর্মচারীদের পারদর্শী করে তোলা হয়। বাংলাদেশেও একই উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছে বাংলাদেশ নির্বাচন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। তবে ভোটের বাংলাদেশে সব মুখে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং কথাটি ঘুরছে ভিন্ন কারণে।
বহু বছর কলকাতায় বাংলাদেশ উপদূতাবাসে এবং দিল্লির দূতাবাসে কাজ করা বাংলাদেশ ফরেন সার্ভিসের এক অবসরপ্রাপ্ত অফিসারের কাছে জানতে চাইলাম এই ইলেকশান ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাপারটা কী? তিনি মজা করে বললেন আপনাদের তো এটা বুঝতে না পারার কথা নয়। পশ্চিমবঙ্গে যেমন ভোটের মুখে রিগিং, সন্ত্রাস, বুধ দখল, ছাপ্পা ভোট, গণনায় অনিয়মের অভিযোগে কমবেশি সব দল সরব থাকে, বাংলাদেশে এবারের নির্বাচনে ঠিক সেই অর্থেই ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং শব্দ যুগল সব মুখে ঘুরছে।
বিষয়টি দলগুলি কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে তা বোঝা যায় শীর্ষস্থানীয় নেতাদের কথায়। জামায়াতে ইসলামিকের দিকে ইঙ্গিত করে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশবাসীকে আর্জি জানিয়েছেন ফজরের নামাজ পড়ার পরই বুথে চলে যান। ভোট শেষ না হওয়া পর্যন্ত বুথের আশপাশে পাহারাদারের কাজ করুন।
একই কথা বলেছেন জামায়াতে ইসলামের আমি শফিকুর রহমান। তিনিও নাম না করে বিএনপিকে ইঙ্গিত করে বলছেন, এবার কারও ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং সফল করতে দেওয়া হবে না। অবাধ ভোট আমরা নিশ্চিত করব।
ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গাড়িতে হোটেলে পৌঁছে দিলেন মহম্মদ সেলিম। বছর ষাটের ভদ্রলোক ১৯৮৫ সাল থেকে ঢাকায় গাড়ি চালাচ্ছেন। তিনি অবশ্য বলছিলেন, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে আওয়ামী লিগ যে নজির গড়ে গেছে বাকি দলগুলি তাদের ধারেকাছে নেই। তাঁর কথায়, ২০১৮-র মতো দিনের ভোট রাতে করার নজির কোনও জমানায় নেই। বিমান বন্দরের মুখ থেকে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ধরে মূল শহরে এলাম। চালক ভদ্রলোক বলছিলেন, এই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে শেখ হাসিনার অবদান। এ রকম অসংখ্য ভাল কাজ করেছেন তিনি। তারপরও কেন নির্বাচনে দিনের ভোট রাতে করিয়েছিলেন মাথায় ঢোকেনি।
জানতে চাইলাম, এবার তো শেখ হাসিনা, আওয়ামী লিগ ময়দানে নেই।এবার কেন ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কথা বলা হচ্ছে? চালক ভদ্রলোকের মতে, জয়ের ব্যাপারে কেউ শতভাগ নিশ্চিত নয়। এবার তাই যে যেখানে শক্তিশালী সেখানে খেল দেখাতে চাইবে।
বাংলাদেশের রাজধানীর যে এলাকাটি প্রায় সারা বছর রাজনৈতিক কর্মকান্ডে সরগরম থাকে, প্রায়ই রক্তাক্ত হয়ে ওঠে আন্দোলন দমনকে কেন্দ্র করে, সেই সাহবাগ ময়দান ঢাকা-৮ কেন্দ্রের অন্তর্গত। এখানে বিএনপি'র প্রার্থী প্রাক্তন সাংসদ মির্জা আব্বাস। এলাকায় তার যথেষ্ট রাজনৈতিক প্রভাব এবং জনপ্রিয়তা রয়েছে। তার বিরুদ্ধে প্রার্থী জাতীয় নাগরিক পার্টির নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী। তিনি মির্জা আব্বাসকে কতটা বিপাকে ফেলতে পারবেন তা নিয়ে সব মহলেই কমবেশি সংশয় আছে। তারপরও মির্জা আব্বাসের মতন বিএনপি'র হেভি ওয়েট প্রার্থীও ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। পাটোয়ারির হয়ে এখানে নির্বাচনের মূল কাজটি করছে জামাত ইসলামের নিবিড় সংগঠন। জামাতের এই সংগঠনকে বাংলাদেশের সব দলসমূহ করে। বিএনপি সেই কারণেই এবার নির্বাচনে প্রতিপক্ষ দলের তুলনায় শক্তিতে ও মর্যাদায় অনেক এগিয়ে থাকলেও তারাও ভোটে কারচুপি সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছে না।
অন্যদিকে পাটোয়ারীর হয়ে মুখ খুলেছেন জামাত ইসলামের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরোয়ার। তাঁর কথায়, মির্জা আব্বাসের কেন্দ্রে আমরাও ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আশঙ্কা করছি। বিএনপি সেখানে নানাভাবে চেষ্টা করবে ফল ঘুরিয়ে দিতে। তাৎপর্যপূর্ণ হল জামাত-বিএনপি সহ সব দল তাদের কর্মী সমর্থকদের বলেছে, শুধু সময় মত ভোট দিলেই হবে না, ভোট শেষ না হওয়া পর্যন্ত বুথ পাহারা দিতে হবে। অর্থাৎ এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লিগ না থাকলেও ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বা ভোটে কারচুপির আশঙ্কা থেকে মুক্ত নয় কোনও দল। বিএনপি নেতারা বলছেন জামাতের হয়ে ভোট ভোটের দিন ময়দানে সক্রিয় হতে পারে প্রশাসনের একাংশ। অন্যদিকে জামাতের বক্তব্য নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ নয়। কদিন আগেও জামাত নেতারা বলেছেন অবাধ সুষ্ঠু ভোটের পরিস্থিতি তৈরি করতে পারেনি কমিশন। চালক ভদ্র লোকের কথায় আসলে এদেশে এখনও ভোটের ময়দানে শেষ কথা হল 'জোর যার মুলুক তার'।