আগামীকাল মঙ্গলবার ঢাকা ইউনির্ভাসিটি সেন্ট্রাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (Dhaka University Central Student’s Union) বা ডাকসু’র নির্বাচনের জন্য ভোট নেওয়া হবে। ২৯১৯-এ শেষবার এই নির্বাচন হয়েছিল। সেবার বিপুল ভোটে জয়ী আওয়ামী লিগের ছাত্র সংগঠন ছাত্র লিগ. (Chhatra League, students wing of Awami League) এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারছে না নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ায়।

শেষ আপডেট: 8 September 2025 13:17
দেশ জুড়ে রাজনৈতিক সহিংসতা বিরাজ করছে। মব আক্রমণের ভয়ে সিঁটিয়ে সাধারণ মানুষ। বাদ নেই স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ও। রাজনৈতিক সংঘাত, সন্ত্রাস তো লেগেই আছে। সব মিলিয়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভয়াবহ। এমন আবহের মধ্যেই আগামীকাল মঙ্গলবার ঢাকা ইউনির্ভাসিটি সেন্ট্রাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (Dhaka University Central Student’s Union) বা ডাকসু’র নির্বাচনের জন্য ভোট নেওয়া হবে। ২৯১৯-এ শেষবার এই নির্বাচন হয়েছিল। সেবার বিপুল ভোটে জয়ী আওয়ামী লিগের ছাত্র সংগঠন ছাত্র লিগ. (Chhatra League, students wing of Awami League) এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারছে না নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ায়। গত বছর ৫ অগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের আগে পর্যন্ত ছাত্র লিগই ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শেষ কথা।
আবার এই সময়কালের মধ্যেই ঢাকা-সহ একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র লিগের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিরোধ এবং সরকার বিরোধিতা জোরদার হয় বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা। তারই প্রতিফলন ঘটে কোটা বিরোধী আন্দোলন এবং গণঅভ্যুত্থানের সময়। ৫ অগস্টের আগেই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্র লিগকে ছাত্ররোষের মুখে ক্যাম্পাস ছাড়তে বাধ্য হয়। রাজনৈতিক মহলের বড় অংশের মত হল ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ করে রেখে হাসিনা দলের কবর খুঁড়েছেন। নির্বাচিত ছাত্র সংসদ না থাকায় ছাত্র লিগের কার্যক্রম কমে গিয়েছিল। এই সুযোগে মাথা তোলে তাদের বিরোধী শক্তি। সরকার, দল, এমনকী ছাত্র লিগ নেতারাও বিরোধী শিবিরের প্রস্তুতির খবর রাখত না। আত্মতুষ্টি গ্রাস করেছিল তাদের।
বাংলাদেশ ‘ডাকসু’-র হাত ধরেই রাজনীতিকে প্রবেশ ঘটে শত শত নেতার। ডাকসু-র সূত্রেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেও বলা হয়ে থাকে বাংলাদেশের রাজনীতির আঁতুরঘর। ছয় বছর পর সেই ডাকসুর নির্বাচন করিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার দেখাতে চাইছে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা কমেছে। অন্যদিকে, বিএনপির ছাত্রদল, জামাতের ছাত্র শিবির, এনসিপির বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন ডাকসুর নির্বাচনে শক্তি প্রদর্শন করে আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদের সম্ভাব্য নির্বাচনের আগে পায়ের তলায় জমি শক্ত করে নিতে চাইছে।
রবিবার পর্যন্ত নির্বচনী প্রচার ঘিরে অশান্তি, সংঘাত না হওয়ায় সরকারের এই দাবি আরও জোরদার হয়েছে যে বাংলাদেশ এখন শান্ত, স্বাভাবিক। মঙ্গলবার ভোটগ্রহণ চলা কালে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে পাহারায় থাকবে পুলিশ। ক্যাম্পাসের বাইরে নিরাপত্তার দায়িত্বে স্ট্যান্ডবাই থাকবে সেনা। ছয় বছর পর যখন দেশের অস্থির পরিস্থিতির মধ্যেও ডাকসুর নির্বাচন হতে যাচ্ছে তখন এপার বাংলায় নয় বছর ধরে বন্ধ ছাত্র সংসদের নির্বাচন কবে হবে, সে প্রশ্ন ঘোরাফেরা করছে শিক্ষা মহলে। এই বিষয়ে মামলায় কলকাতা হাই কোর্ট রাজ্য সরকারকে তাদের অবস্থান জানাতে বলেছে। সেই সময়সীমা এখনও শেষ হয়নি। তবে সরকারি আইনজীবী এই ব্যাপারে দায় চাপিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়গুলির উপর। অন্যদিকে, একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, ছাত্র সংসদ ভোটে অতীতে হিংসার নজির রয়েছে। এককভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে এই ভোট করানো সম্ভব নয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কোনও কোনও উপাচার্য এমন কথাও বলেছেন, সাম্প্রতিক অতীতে সরকার ছাত্র ভোট নিয়ে বিভিন্ন সময়ের উল্লেখ করেছে। এর অর্থ সরকারেই এই ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা।
পশ্চিমবঙ্গে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মধ্যে তিনটি বাদে বাকিগুলিতে শেষবার ছাত্র সংসদ ভোট হয়েছিল ২০১৭ সালে। ২০১৯-এ যাদবপুর, প্রেসিডেন্সি এবং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিজেদের উদ্যোগে ছাত্র ভোট করায়। সেখানেও নির্বাচিত ছাত্র সংসদের মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছে ২০২২-এ। ওই তিন বিশ্ববিদ্যালয় বাদে বাকিগুলির মূল ক্যাম্পাস এবং বেশিরভাগ ক্যাম্পাসেই ২০১৯-এর ভোটে টিএমসিপি বিজয়ী হয়েছিল। অভিযোগ, মেয়াদ ফুরনোর পরও তারাই আনফিসিয়ালি ছাত্র সংসদ চালাচ্ছে।
এপারেও অনেকে মনে করছেন, নির্বাচিত ছাত্র সংসদ না থাকায় তৃণমূলের ছাত্র সংগঠন ক্ষমতা ভোগ করলেও তাদের ক্যাম্পাস কেন্দ্রীক কর্মসূচি নেই বললেই চলে। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে প্রকাশ্য কর্মসূচির বাইরে আড়ালে শক্তি বৃদ্ধি করেছে আরএসএসের ছাত্র সংগঠন বিদ্যার্থী পরিষদ। তারা ক্যাম্পাসের বাইরে অঘোষিত, গোপন সভা করছে। মাঝেমধ্যে প্রকাশ্য কর্মসূচিও পালন করছে। এর প্রতিক্রিয়া বিধানসভা ভোটে কতটা পড়বে তা এখনও স্পষ্ট নয়। ছাত্র ইস্যুতে প্রকাশ্য কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে এসএফআই, এআইএসএফ, ডিএসও-র মতো বাম ছাত্র সংগঠনগুলি। তৃণমূল এবং টিএমসি নেতৃত্বের একাংশ ছাত্র ভোট বন্ধ থাকায় উদ্বিগ্ন। তাদের বক্তব্য, নির্বাচনে ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সি ভোটারের গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলায় কম বয়সিদের ভোটার তালিকায় নাম তোলার প্রবণতাও বেশি। ফলে ক্যাম্পাসে তৃণমূল বিরোধীরা কতটা শক্তিশালী তা জানা থাকলে বিধানসভা ভোটের জন্য সেই মতো কৌশল সাজানো সহজ হতো।
মঙ্গলবার ডাকসুর নির্বাচনে ২৮টি পদে মোট ৪৯১জন প্রার্থীর মধ্যে লড়াই হবে। ছাত্র ভোটের বুথ পাহারায় প্রথমে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হলেও পরে সমালোচনার মুখে তা বাতিল করা হয়। তবে গুরুতর পরিস্থিতির মোকাবিলায় সেনাকে তলব করা হবে।
ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রাম থেকে পাকিস্তানের দাবি, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার দাবিতে আন্দোলন, স্বশাসনের লড়াই থেকে মুক্তিযুদ্ধ—সব পর্বেই শতাব্দী প্রাচীন এই বিশ্ববিদ্যালয় ও ছাত্র সংসদটির ভূমিকা আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে আছে। যে কারণে ডাকসু’কে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সংসদ বলা হয়ে থাকে।বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী পদাধিকার বলে ছাত্র সংসদের প্রেসিডেন্ট হন উপাচার্য। ভাইস প্রেসিডেন্ট বা ভিপি পদ নিয়েই হয় যত লড়াই। ডাকসু’র ভিপি হওয়াকে রাজনীতির পথে অগ্রসর এবং সাফল্যের সঙ্গে প্রথম ধাপ উত্তরণ ধরা হয়ে থাকে। বাংলাদেশের প্রথমসারির রাজনীতিকদের অনেকেরই রাজনীতিতে হাতেখড়ি ডাকুসর ভিপি পদ দিয়ে।সেই ডাকসু’র নির্বাচনে এবারই প্রথম সরকারিভাবে লড়াইয়ে নেই আওয়ামী লিগের ছাত্র সংগঠন ছাত্র লিগ। শেখ মুজিবুর রহমান প্রতিষ্ঠিত দেশের সবচেয়ে পুরনো এবং বৃহত্তম এই ছাত্র সংগঠনের ঝুলিতে ১৯৭১-এ স্বাধীনতার আন্দোলনের নেতৃত্বদানের কৃতিত্ব রয়েছে। তার আগে স্বাধিকারের লড়াই এবং ভাষা আন্দোলনেও প্রথমসারিতে ছিল ওই সংগঠন।
সেই সংগঠনকে গত বছর অগস্টে পালা বদলের পর সন্ত্রাস দমন আইনে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে মহম্মদ ইউনুসের সরকার। ফলে ছাত্র লিগের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ নেই। সংগঠনের সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের কথায়, ‘ছাত্র লিগকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশে কোনও ছাত্র সংসদ নির্বাচন কখনও অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে পারে না। তা সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হোক কিংবা রাজশাহী, খুলনা, যে বিশ্ববিদ্যালয়ের কথাই বলা হোক না কেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের শুধু অংশ নিতে দেওয়া হচ্ছে না তাই-ই নয়, ছাত্র লিগের সমর্থক হাজার ছেলেমেয়ের শিক্ষা জীবনে ইতি টেনে দেওয়া হয়েছে। তাদের ক্যাম্পাসে প্রবেশের অনুমতি নেই। ক্লাস করতে পারছে না। পরীক্ষা দিতে দেওয়া হচ্ছে না।’

সূত্রের খবর, ছাত্র লিগ ময়দানে না থাকায় মূল লড়াই হবে বিএনপি’র ছাত্র দল এবং জামাত-ই-ইসলামির ছাত্র শিবিরের মধ্যে। এছাড়া বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রার্থীরা আছেন। ওই ছাত্র সংগঠনের প্রথমসারির নেত্রী উমামা ফাতামার স্বতন্ত্র বা নির্দল প্রার্থী হিসাবে লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত ডাকসু’র নির্বাচনকে নয়া মাত্রা দিয়েছে। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করে এই নেত্রী হাসিনা সরকারকে উৎখাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেওয়া ওই সংগঠনকে টাকা কামানোর মেশিন বলে মন্তব্য করে শোরগোল ফেলে দিয়েছেন।