তৎকালীন রাষ্ট্রপতি তথা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের (Ziaur Rahaman, former president of Bangladesh and founder of BNP) সময়ে অনুষ্ঠিত সেই ভোটে ধানের শীষে ভোট পড়েছিল ৪১.১৬ শতাংশ। সেদিক থেকে জিয়া পুত্র তারেকের নেতৃত্বে বিএনপি সেই রেকর্ড ভেঙে বিপুল জয় পেয়েছে।
_0.jpeg.webp)
শেষ আপডেট: 16 February 2026 12:15
সদ্য অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে (13th Bangladesh National Election, 2026) বিএনপি (BNP) প্রায় ৫০ শতাংশ (৪৯ ৯৭ শতাংশ) ভোট পেয়েছে। অতীতে কোনও ভোটে দলটি এত বিপুল ভোট পায়নি। দলটি সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছিল ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি তথা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের (Ziaur Rahaman, former president of Bangladesh and founder of BNP) সময়ে অনুষ্ঠিত সেই ভোটে ধানের শীষে ভোট পড়েছিল ৪১.১৬ শতাংশ। সেদিক থেকে জিয়া পুত্র তারেকের নেতৃত্বে বিএনপি সেই রেকর্ড ভেঙে বিপুল জয় পেয়েছে। বিএনপি জোটের প্রাপ্ত ২১২ আসনের মধ্যে তারেক রহমানের (BNP Chairman Tarique Rahaman) পার্টি একাই পেয়েছে ২০৯ আসন। দুই তৃতীয়াংশ আসনে দলকে বিজয়ী করার কৃতিত্ব বাংলাদেশের জন্মের পর থেকে সরকার প্রধান হওয়া প্রথমসারির পাঁচ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান (Sheikh Mukibur Rahaman), হুসেইন মহম্মদ এরশাদ (Hissain Md Edshad), জিয়াউর রহমান (Ziaur Rahaman), খালেজা জিয়া (Khaleda Zia) এবং শেখ হাসিনার (Sheikh Hasina) রয়েছে। সেই তালিকায় যুক্ত হলেন তারেক রহমান। তাঁদের সঙ্গে তারেকের বিজয়ের ফারাক হল বাকিরা হয় ক্ষমতায় থাকাকালীন রেকর্ড আসন ও ভোট পেয়েছেন অথবা অতীতে সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতা ছিল। সেই তুলনায় তারেক রহমানের সাফল্য বেশি।

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামি (Jamaat-E Islami) ও তাদের ১১ দলের জোট এবার ভোট পেয়েছে ৩১.৭ শতাংশ। ওই দলটি ১৯৯১ সালের ভোটে ১৮টি আসন ও ১২.১৩ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। এবারা জামাতের প্রাপ্ত আসন ৬৮। জামাত জোট সব মিলিয়ে পেয়েছে ৭৭টি আসন। এর আগে ১৯৯১ সালে দলটি জয়ী হয়েছিল ১৮ আসনে। সেটাই ছিল এতদিন পর্যন্ত সর্বোচ্চ প্রাপ্ত আসন।
জিয়াউর রহমান ও খালেজা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ইতিপূর্বে চারবার সরকার গড়েছে। সেই নির্বাচনগুলিতে তাদেক প্রাপ্ত ভোটের হার ছিল ১৯৭৯ -এক ৪১.১৬ শতাংশ, ১৯৯১-এ ৩০.৮১ শতাংশ, ২০০১-এ ৪০.৯৭ শতাংশ) এবং ২০২৬ সালে (৪৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ) ভোটে তারা সরকার গঠন করেছে। অন্যদিকে, ১৯৯৬, ২০০৮ ও ২০১৮ সালে বিরোধী দলে থাকার সময় তাদের প্রাপ্ত ভোটের হার ছিল যথাক্রমে ৩৩.৬০ শতাংশ, ৩২.৫০ শতাংশ ও ১২.৭ শতাংশ। এরমধ্যে ২০১৮-তে আওয়ামী লিগ আমলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আগের রাতে ব্যালট বাক্স বোঝাই-সহ গুচ্ছ অনিয়মের অভিযোগ ছিল।
আড়াই দশক আগে ২০০১-এ বিএনপি সরকার গড়েছিল জামায়াতে ইসলামীকে সঙ্গী করে। ধরেই নেওয়া যায় তাদের সেবারের প্রাপ্ত ভোটে জামাতের ভোটও আছে। এছাড়া, ২০০৮-এর জামাতে ইসলামী ফের ভোটে লড়াই করার সুযোগ পেল ২০২৬-এ। মধ্যবর্তী নির্বাচনগুলিতে তাদের উপর নিষেধাজ্ঞা বলবৎ ছিল। এরমধ্যে ২০১৪ এবং ২০২৪-এর নির্বাচন বিএনপি বয়কট করেছিল। ২০১৮-র কারচুপির ভোটে দলটি মাত্র ১২.৭ শতাংশ ভোটারের সমর্থন পেলেও সেবার দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের অর্থাৎ জামাতের ভোটারদের একাংশ বিএনপির ধানের শীষে ভোট দিয়েছিলেন।
এবার পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। আওয়ামী লিগ ময়দানে না থাকায় মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে একদা মিত্র বিএনপি ও জামাতের মধ্যে। মিত্ররাই একে অপরের দুর্বলতা সম্পর্কে বেশি জানে। ভোটে প্রার্থী বাছাই এবং প্রচারে তা টের পাওয়া গিয়েছে। এখন প্রশ্ন হল, এবার জামাতের ভোট বিএনপির বাক্সে যাওয়ার কোনও সুযোগ ছিল না। তারপরও বিএনপি তাদের অতীতের সব রেকর্ড ছাপিয়ে কীভাবে ৫০ শতাংশ ভোট পেল তা নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনটিকে মোটের উপর ভার নির্বাচন বলে ধরা হয়। সেই ভোটে ক্ষমতায় ফেরে আওয়ামী লিগ। সেবার হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে বিএনপি পেয়েছিল ৩২.৫ শতাংশ ভোট। সেই পরিচ্ছন্ন ভোটকে মানদণ্ড ধরলে বিএনপি এবার ১৭-১৮ শতাংশ ভোট বেশি পেয়েছে।
প্রশ্ন হল, এই বিপুল বাড়তি ভোট তারেক রহমানের দল কীভাবে পেল। ওয়াকিবহাল মহল এরমধ্যে চার-পাঁচটি কারণকে প্রধান বলে মনে করছে। এক. বাংলাদেশের মানুষ একটি স্থিতিশীল সরকার চেয়েছিল। তারা দুর্বল বা পর নির্ভর সরকার চায়নি। ফলে বিএনপির বিজয় নিশ্চিত করতে চেয়েছেন বেশিরভাগ মানুষ। বহু মানুষ এভাবে ভাবলে ভোটের বাক্সে তার প্রতিফলন হওয়া স্বাভাবিক। বিএনপি দেশবাসীর ওই ভাবনার সুফল পেয়েছে। ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, বহু আসনে জামাতের শক্তিশালী প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও বিএনপি ভূমিধস বিজয় হাসিল করেছে। এতে বোঝা যাচ্ছে বহু সংখ্যক মানুষ বিএনপির জয় নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ভোট দিয়েছেন।
দুই. সদ্য প্রয়াত খালেদা জিয়া শুধু বিএনপি নয়, দলের বাইরেও বহু মানুষের শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন। দীর্ঘ রোগভোগে তাঁর যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুতে প্রয়াত নেত্রী তথা তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে আবেগ কাজ করেছে। এর প্রভাব পড়েছে ভোট বাক্সে।
তিন. তারেক রহমানকে ঘিরেও নতুন আশা, উদ্দীপনা ছিল বিএনপির কর্মীদের মধ্যে। এবারের নির্বাচনে জামাত প্রচারে বারে বারে তাদের একবার সুযোগ দেওয়ার কথা বলে। বাংলাদেশের মানুষ সুযোগ দিয়েছেন বিএনপি-র নতুন নেতা তারেক রহমানকে। তিনি কেমন দেশ চালান সেটা দেখে নিতে চেয়েছে মানুষ।
চার. পরিস্থিতিজনিত কারণে দলের হুইপ অগ্রাহ্য করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লিগের ভোটারদের অনেকেই বুথে গিয়ে ধানের শীষে ছাপ দিয়ে এসেছেন। ঢাকায় আওয়ামী লিগের এক ভোটার বলেছিলেন, জামাত হল আমাদের আদর্শিক শক্রু। তারা মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশকেই মানেনি। অতীতের ভুলের জন্য ক্ষমা চায়নি। অন্যদিকে, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধে একটি সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লিগ ও বিএনপি হল ভোটের ময়দানে পরস্পরের প্রতিপক্ষ। জামাতকে আটকাতে বহু সচেতন আওয়ামী লিগ ভোটার ধানের শীষে ভোট দিয়েছে। কেউ ভয়ে, কেউ ভক্তিতে। আওয়ামী লিগের একাংশ জানাচ্ছে, সংখাটা নেহাৎ কম নয়।
পাঁচ. সংখ্যালঘু, বিশেষ করে হিন্দুরা এই নির্বাচনে ঢেলে বিএনপি-কে ভোট দিয়েছে। সংখ্যালঘুদের একাধিক সংগঠনের নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, দেশি-বিদেশি একাধিক সূ্ত্র থেকে এ জন্য তাদের পরামর্শ, কোনও কোনও ক্ষেত্রে চাপ দেওয়া হয়েছিল। হিন্দুদের বিএনপি-কে ভোট দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট ছিল পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার এলাকায়। ভোটের দিন সেখানে গিয়ে দেখেছি ঢাকার বাকি এলাকার তুলনায় শাঁখারীবাজারে অনেক বেশি উৎসবের মেজাজে ভোট হচ্ছে। ওই এলাকায় হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। তারা প্রকাশ্যে ক্যামেরার সামনে বলেছেন, এই প্রথম দলে দলে বুথে গিয়ে ধানের শীষ অর্থাৎ বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন। তাদের প্রায় নব্বই ভাগই ছিলেন আওয়ামী লিগ অর্থা নৌকা প্রতীকের প্রার্থী। তাঁদের একজন আমাকে একথাও বলেন, জামাতকে আটকাকে বিএনপি-কে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত সম্প্রদায়গত। দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে বিবেচনায় রেখে তারা আওয়ামী লিগের ভোট বয়কটের ডাক উপেক্ষা করেছেন। সেখানে আরও একটি বিষয় ছিল লক্ষণীয়। বিএনপি-কে ভোট দিলেও গণভোটে সিংহভাগ হিন্দু ‘না’-তে টিক দিয়েছেন। অর্থাৎ তারা চাননি ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়ে দেশের সংবিধান বদলে দিক। যদিও সামগ্রিক ফলাফলে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছে ‘হ্যাঁ’।
বাংলাদেশে সংখ্যালঘু ভোট আছে প্রায় আট শতাংশ। এর সিংহভাগ হিন্দু। অন্তত ৬০টি আসনে সংখ্যালঘু ভোটের উপর জয়-পরাজয় নির্ভর করে। যেমন শেখ মুজিবর রহমানের স্মৃতি বিজড়িত তথা শেখ হাসিনার দীর্ঘদিনের সংসদীয় এলাকা গোপালগঞ্জ-৩ সহ এই এলাকায় তিনটি আসনেই এবার বিএনপি জয়ী হয়েছে। সেখানে পর্যন্ত হাসিনার ভোট বয়কটের ডাকে সাড়া মেলেনি। গোপালগঞ্জেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি , ৫০ শতাংশ হিন্দুর বাস।
এবারে আসা যাক, বিএনপি-র সঙ্গে জোট ছাড়াই জামাত কী করে তাদের ভোট ১২-১৩ শতাংশ থেকে একলাফে ৩১.৭ শতাংশ ভোট পেল। এরমধ্যেও কোনও রহস্য নেই। বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে এক তৃতীয়াংশ ভোটার আছে যারা মুক্তিযুদ্ধ চায়নি। ঘটনাচক্রে তারা ভারত বিরোধীও। ১৯৭০-এর যে নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ স্বাধীনতার পক্ষে রায় দিয়ে সংসদ নির্বাচনে গণভোটের রূপ দিয়েছিলেন, সেই ভোটেও আওয়ামী লিগ প্রায় সব আসলে জিতলেও তাদের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিল প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ। সেই ভোটের পরিমান স্বাধীনতার ৫৪-৫৫ বছর পরেও বদলায়নি। এবারের ভোটে বিএনপি ভারত বিরোধিতাকে প্রধান অস্ত্র করেনি। জামায়াতে ইসলামীও তেমন সুর চড়ায়নি। তবে ভারত বিরোধী শক্তি হিসাবে ভোটের ময়দানে জামাত জোটকে ওই ৩০ শতাংশ মানুষ বেছে নিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। অতীতে ইসলামিক দলগুলি নিজেদের মধ্যে লড়াই করায় এই ভোট একাধিক বাক্সে পড়ত। এবার জামাত জোট পুরোটা পেয়েছে। এই সঙ্গে আছে সংখ্যালঘু ভোটের অঙ্ক। যে সব আসনে জামাতের জয় নিশ্চিত ছিল সেখানে সংখ্যালঘুরা দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিয়েছেন বলে কোনও কোনও মহলের ধারণা।