পরিস্থিতি ক্রমশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশে শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠান বাতিল করতে বাধ্য হন আয়োজকেরা।

শেষ আপডেট: 27 December 2025 07:58
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাংলাদেশে (Bangladesh) ফের সংস্কৃতির উপর হামলার (Cultural Attacks) ছবি প্রকাশ্যে এল। জনপ্রিয় গায়ক জেমসের কনসার্ট বাতিল (James concert cancelled in Bangladesh) হয়ে গেল ফরিদপুরে (Faridpur), ঢাকা (Dhaka) থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দূরে। শিল্পী, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও অনুষ্ঠান ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ের ধারাবাহিক হিংসার আবহেই এই ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ বাড়াল (attacks on cultural institutions Bangladesh)।
স্থানীয় সূত্রের খবর, শুক্রবার রাত ৯টায় ফরিদপুরে একটি স্কুলের বার্ষিকী উপলক্ষে জেমসের কনসার্ট (James concert) হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অনুষ্ঠান শুরুর আগেই একদল দুষ্কৃতী মঞ্চের ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করে। অভিযোগ, তারা দর্শকদের লক্ষ্য করে ইট-পাথর ছোড়ে। স্থানীয়রা জানান, প্রথমে ছাত্রছাত্রীরা হামলাকারীদের আটকানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু পরিস্থিতি ক্রমশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশে শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠান বাতিল করতে বাধ্য হন আয়োজকেরা।
এই ঘটনার পর সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। এক্স-এ দেওয়া পোস্টে তিনি লিখেছেন, “ছায়ানট, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, পুড়িয়ে ছারখার করে দেওয়া হয়েছে। সঙ্গীত, নাটক, নৃত্য, আবৃত্তি ও লোকসংস্কৃতির মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল চেতনা গড়ে তোলার লক্ষ্যে গড়ে ওঠা উদীচীকেও পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আজ জিহাদিরা খ্যাতনামা শিল্পী জেমসকেও মঞ্চে উঠতে দিল না।”
Islamist mob attacks concert of Bangladesh's biggest rockstar James at Faridpur. James has sung for Bollywood also. The mob wants no music or cultural festivals to be held in Bangladesh. James somehow managed to escape. pic.twitter.com/0yNeU0Us9h
— Deep Halder (@deepscribble) December 26, 2025
তসলিমা আরও লেখেন, কয়েকদিন আগেই ধাক্কা খেয়ে বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন সেতারবাদক সিরাজ আলি খান। তিনি কিংবদন্তি আলি আকবর খানের নাতি এবং বিশ্বখ্যাত ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের প্রপৌত্র। নিজেও মাইহার ঘরানার একজন বিশিষ্ট শিল্পী সিরাজ আলি খান। ঢাকায় কোনও অনুষ্ঠান না করেই তিনি ভারতে ফিরে যান এবং স্পষ্ট জানিয়ে দেন শিল্পী, সঙ্গীত ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত তিনি আর বাংলাদেশে ফিরবেন না।
তসলিমা নাসরিন আরও দাবি করেন, দু’দিন আগেই ঢাকার আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছেন ওস্তাদ রশিদ খানের পুত্র আরমান খান। তাঁর কথায়, “সংগীতবিদ্বেষী জিহাদিদের দখলে থাকা বাংলাদেশে পা রাখতেও তিনি আগ্রহী নন।”
জেমস বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় গায়ক-গীতিকার ও সুরকার। তিনি ‘নগর বাউল’ ব্যান্ডের লিড সিঙ্গার, গিটারিস্ট ও গান লেখক। পাশাপাশি তিনি প্লেব্যাক সিঙ্গার হিসেবেও পরিচিত। বলিউডে তাঁর গাওয়া ‘গ্যাংস্টার’ ছবির ভিগি ভিগি বা লাইফ ইন আ মেট্রো-র আলবিদা আজও শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয়। সেই শিল্পীর কনসার্টে হামলা বাংলাদেশের সমাজে চরমপন্থী শক্তির ক্রমবর্ধমান দাপটেরই ইঙ্গিত বলে মনে করছেন অনেকেই।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে কট্টরপন্থী ইসলামী গোষ্ঠীগুলি রাস্তায় নেমে কার্যত তাণ্ডব চালাচ্ছে বলে অভিযোগ। আর সেই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে, এমন অভিযোগও উঠছে। ছায়ানট, উদীচীর মতো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছাড়াও শিল্পী, সাংবাদিক এবং সংবাদপত্রের অফিসগুলিও হামলার শিকার হয়েছে।
মহম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এই হিংসা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে বলেই অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন মহলে। সরকারের সমালোচকদের একাংশের দাবি, আইন-শৃঙ্খলার এই অবনতি ইচ্ছাকৃতভাবেই উস্কে দেওয়া হচ্ছে, যাতে ফেব্রুয়ারিতে নির্ধারিত নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়া যায়।
সব মিলিয়ে, জেমসের কনসার্ট বাতিলের ঘটনা শুধুই একটি অনুষ্ঠান পণ্ড হওয়ার খবর নয়, বাংলাদেশে সংস্কৃতি, শিল্প এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কোন দিকে যাচ্ছে, সেই প্রশ্নই ফের সামনে এনে দিল।