জানা যাচ্ছে, এই প্রচেষ্টা বহুদিন ধরেই চলছে। মাস দুই আগে জামায়াতে ইসলামির আমির শফিকুর রহমানের লন্ডনে তারেক রহমানের বাড়িতে গিয়ে অসুস্থ খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক তারই অঙ্গ।

শেষ আপডেট: 6 June 2025 17:25
আগামী ১০ জুন লন্ডন সফরে যাচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুস। চারদিনের সফরে তিনি ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় চার্লস, প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামিসহ শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে ঠিক আছে।
সরকারি এই ঘোষণার পাশাপাশি জল্পনা চলছে এই সফরে উউনুসের সঙ্গে লন্ডনে রাজনৈতিক নির্বাসনে থাকা বিএনপির কার্যনির্বাহী চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বৈঠক হতে পারে। যদিও কোনও পক্ষই এই বৈঠকের কথা সরকারিভাবে স্বীকার করেনি। বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত বিদেশ সচিব রুহুল আলম জানান, প্রধান উপদেষ্টার সফরসূচিতে বিএনপি নেতার সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে তাঁর কিছু জানা নেই।]
ঘটনা হল, ইউনুসের আসন্ন সফর এবং লন্ডনে তাঁর সঙ্গে তারেক জিয়ার সম্ভাব্য বৈঠক নিয়ে জল্পনার মাঝেই বিএনপি’র শীর্ষ নেতা সালাউদ্দিন আহমেদ একটি টেলিভিশন চ্যানেলে জোরের সঙ্গেই ঘোষণা করেছেন, মাস তিনেকের মধ্যেই তাঁদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দেশে ফিরছেন। তারেক প্রায় দেড় দশক হতে চলল লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলের খবর, তারেকের দেশে ফেরার রাস্তা পরিস্কার করা এবং দ্রুত ভোটের ইস্যুতে বিএনপি-কে চাপে রাখতে চাইছে ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকার ও তাদের সহযোগী দল জামায়াতে ইসলামি এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি। চাপের আবহে তিন দলের বিরোধ দূর করে নির্বাচনী বোঝাপড়া গড়ে তোলার চেষ্টা শুরু হয়েছে। উদ্দেশ্য আওয়ামী লিগ তো বটেই, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিগুলিরও যাতে জাতীয় সংসদে প্রবেশ করতে না পারে। ভোটের ময়দানে তাদের নিশ্চিহ্ন করাই লক্ষ্য।
কেন এই পচেষ্টা? জানা যাচ্ছে, তিন দলের নেতারাই ধরে নিচ্ছে, নির্বাচনের আগে অন্তর্ভুক্তিমূলক ভোটের দাবিটি ফের জোরদার হবে। আমেরিকা, ব্রিটেন-সহ পশ্চিমা দেশগুলি এই চাপ তৈরি করলে তখন শেখ হাসিনার দলের নিবন্ধন বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নেওয়া হতে পারে। আওয়ামী লিগ ও তাদের সহযোগীদের ঠেকাতে ইউনুস অনুগামীরা মনে করছে, আগেভাগে নিজেদের মধ্যে আসন বোঝাপড়া গড়ে তোলা জরুরি। আর তা সম্ভব বিএনপি প্রত্যাশ্যা মতো আসন ছেড়ে দিলে তবেই।
এই বোঝাপড়ার ভিত শক্ত করার চেষ্টা হতে পারে লন্ডনে ইউনুস-তারেক বৈঠকে। যাতে জাতীয় সংসদে সরকার ও বিরোধী, দুই পক্ষই আওয়ামী বিরোধীদের হাতে থাকে। ইউনুস-তারেক বৈঠক ফলপ্রসূ হলে সেক্ষেত্রে বিএনপির দাবি মতো ভোট ডিসেম্বরের আগে-পরে করে দেওয়া হতে পারে। তবে সবটাই নির্ভর করছে আলোচিত বৈঠকটি শেষ পর্যন্ত হবে কি না।
অনেকেই একটি আইনি সমস্যা সামনে আনছেন। রাজনৈতিক নির্বাসনে থাকা ব্যক্তির সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার বৈঠক হওয়া বাঞ্ছনীয় কি না, সরকারের অন্দরে এই প্রশ্ন রয়েছে। আবার বিএনপির একাংশ মনে করছে, এই বৈঠক হলে দলের বিরুদ্ধে দ্বিচারিতার অভিযোগ উঠবে। সরকারের বিরুদ্ধে দলের বক্তব্য নিয়ে পার্টির নীচুতলায় সংশয় দেখা দিতে পারে। যদিও বোঝাপড়া গড়ে তোলার প্রচেষ্টা থেমে নেই।
ইতিমধ্যে বাংলাদেশে জেলা, উপজেলা স্তরেও বোঝাপড়া গড়ে তোলার চেষ্টা শুরু হয়েছে। বুধবার বাংলাদেশের উত্তরভাগের জেলা রংপুরে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন নেতৃত্বের ডাকা এক বৈঠকে বিএনপি, জাতীয় নাগরিক পার্টি, জামায়াতে ইসলামি, ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফতে মজলিস, গণ অধিকার পরিষদ, এবি পার্টি, গণ সংহতি পরিষদ প্রভৃতি দলের দীর্ঘ বৈঠক হয়। সেখানে দলগুলির নেতারা সিদ্ধান্ত নেন, কোনও অবস্থাতেই ফ্যাসিবাদী শক্তিকে মাথা তুলতে দেওয়া হবে না। বাংলাদেশে এখন আওয়ামী লিগকেই ফ্যাসিবাদী শক্তি হিসাবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। বৈঠকে ঠিক হয়েছে, ফ্যাসিবাদী তথা হাসিনার দোসরদের বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।
আওয়ামী লিগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার পর জাতীয় পার্টিকে নিশানা করা শুরু হয়েছে ফ্যাসিস্টের দোসর বলে। বিএনপি এবং এনসিপি প্রচার শুরু করেছে, নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন বাতিল হওয়ায় আওয়ামী লিগের নেতারা জাতীয় পার্টির টিকিটে ভোটে লড়াই করবে। সর্বত্র প্রার্থী দেওয়ার মতো শক্তি জাতীয় পার্টির নেই। আপাতত নিষিদ্ধ আওয়ামী লিগ সেই জাতীয় পার্টির হয়ে লড়াই করে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চায়।
ঘটনাচক্রে রংপুরে জাতীয় পার্টর ভাল শক্তি আছে। হালে তারা সেখানে বড় জমায়েত করেছে। এরপরই রংপুর শহরে জাতীয় পার্টির সভাপতি জিএম কাদেরের বাড়িতে হামলা হয়। অন্যত্র ওই দলের বেশ কয়েকটি পার্টি অফিস ভাঙচুর করে এসপিপি-বিএনপি-জামাতের কর্মীরা। দেখা যাচ্ছে, জাতীয় স্তরে এনসিপি ও বিএনপি-র মধ্যে ঝগড়াঝাটি লেগে থাকলেও নীচুতলায় বহু জায়গায় তারা আওয়ামী লিগ ও তাদের সহযোগীদের ঠেকাতে হাত মেলাচ্ছে। আওয়ামী লিগ নেতৃত্ব মনে করছে, রংপুরে বিএনপি-জামাত-এনসিপি-সহ অন্য দলগুলির বৈঠক গোটা বাংলাদেশেই বোঝাপড়া গড়ে তোলার প্রচেষ্টার অংশ।
নানা সুত্র থেকে জানা যাচ্ছে, তলে তলে এই প্রচেষ্টা বহুদিন ধরেই চলছে। মাস দুই আগে জামায়াতে ইসলামির আমির শফিকুর রহমানের লন্ডনে তারেক রহমানের বাড়িতে গিয়ে অসুস্থ খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক তারই অঙ্গ। খালেদা-তারেক-শফিকুরের বৈঠকের পর নির্বাচনের সময় নিয়ে জামায়াতে ইসলামির অবস্থান পরিবর্তন হয়েছে। তারা আগামী জুনের পরিবর্তে এখন ভোট এগিয়ে আনার কথা বলতে শুরু করেছে। যদিও বিএনপির সঙ্গে পুরোপুরি গলা মেলায়নি তারা।