অভিযুক্ত অফিসারদের বিচার সেনা আইনে হবে নাকি ফৌজদারী দণ্ডবিধি মেনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালেই বিচার চলবে তা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা মত উঠে আসছে। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আছে সেনা অভ্যুত্থানের সম্ভাবনা নিয়ে।
.jpg.webp)
ফাইল ছবি
শেষ আপডেট: 11 October 2025 21:57
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর (Bangladesh Army) ১৫ জন অফিসারকে হেফাজতে নিয়েছে সেনা সদর। তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। অবসরপ্রাপ্ত এবং কর্মরত মিলিয়ে মোট ২৫ জন সেনা কর্তার বিরুদ্ধে গুম, খুন, বেআইনিভাবে আটক করে অত্যাচার করার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধে যুক্ত থাকার অভিযোগ জমা হয়েছে ট্রাইব্যুনালে। একই মামলায় নাম আছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর মন্ত্রিসভার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের। নাম আছে বেশ কয়েকজন প্রাক্তন শীর্ষস্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তার। ২৫ সেনা কর্মকর্তার মধ্যে ১৫ জন কর্মরত।
সাবেক ও কর্মরত এই অফিসারদের পরিণতি কী হবে তা নিয়ে তুমুল জল্পনা শুরু হয়েছে বাহিনীর মধ্যে। সেনাপ্রধান ওয়াকার উজ জামান প্রবল চাপের মুখে পড়েন জাতীয় নাগরিক পার্টি ও বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বের। চাপের মুখে শনিবার ঢাকা সেনানিবাসে সাংবাদিক বৈঠক ডেকে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়া অফিসারদের ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের হেফাজতে রাখা হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত সস, অফিসারদেরও পরোয়ানার বিষয়ে জানানো হয়েছে। সাবেক ও কর্মরত মিলিয়ে ২৫ সেনা কর্তার মধ্যে একজন ফেরার। তিনি যাতে দেশ ছেড়ে পালাতে না পারেন সে জন্য সীমান্ত রক্ষী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলিকে সতর্ক করেছে সেনাবাহিনী।
অভিযুক্ত অফিসারদের বিচার সেনা আইনে হবে নাকি ফৌজদারী দণ্ডবিধি মেনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালেই বিচার চলবে তা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা মত উঠে আসছে। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আছে সেনা অভ্যুত্থানের সম্ভাবনা নিয়ে। অনেকেই মনে করছেন পঁচিশ জন অফিসারকে গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত করা নিয়ে বাহিনী যেভাবে দ্বিধা বিভক্ত হয়ে পড়েছে তাতে বড় ধরনের অশান্তির সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে সেনাপ্রধান ওয়াকার উজ জামানের এ মাসে ভারত সফরে আশা নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছে। এ মাসের মাঝামাঝি দুটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ফোরামের সম্মেলনে যোগ দিতে তার দিল্লি আসার কথা। তাঁর দিল্লি সফর বাতিলের সম্ভাবনা প্রবল বলে মনে করা হচ্ছে।
সেনাপ্রধানের বিরুদ্ধে আঙুল ওঠার কারণ তিনি আগেই প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন সেনাবাহিনী বাদে অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থায় যেসব সেনা কর্মকর্তা দায়িত্বে আছেন তাঁদের কাজকর্ম খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তারা নিয়ম বহির্ভূতভাবে কোন কাজ করে থাকলে সাজা পেতে হবে। শেখ হাসিনার জমানায় ওই অফিসারেরা সরকারের কথায় নানা ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ।
অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বাংলাদেশ সরকার যে অভিযোগ দায়ের করেছে তাতে দুটি পৃথক মামলা রুজু হয়। একটি বহু আলোচিত আয়না ঘর মামলা। হাসিনা জমানায় সরকার বিরোধীদের আটকে রাখা হতো আয়না ঘরে। সেই গোপন কুঠুরিতে শুধুমাত্র নিজের ছায়া ছাড়া আর কিছু দেখার উপায় থাকত না। সেই কারণেই ওই কুঠুরির নাম দেওয়া হয় আয়না ঘর। এই কুঠুরি গুমঘর নামেও পরিচিত।
দ্বিতীয় মামলাটি টিএফআই টাস্ক ফোর্স ফর ইন্টারোগেশন সেল নামে পরিচিত। জেরা করার নামে টাস্কফোর্সের অফিসারেরা এখানে নির্যাতন চালাতেন বলে অভিযোগ। এই দুই ক্ষেত্রেই দায়িত্বে ছিলেন পদস্থ সেনা কর্তারা। যদিও শেখ হাসিনা সরকার বারে বারেই এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সেনাকর্তারাও অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলেছেন। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার হাসিনা ও তাঁর সময়কার মন্ত্রী ও আমলাদের পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত ও কর্মরত সেনা অফিসারদেরও অভিযুক্ত করেছে।
এই দুই ক্ষেত্রেই মূলত সেনা গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই এবং আধা সামরিক বাহিনীর্্যাবের বিরুদ্ধে অমানবিক আচরণের অভিযোগ ছিল। এই অভিযোগকে মান্যতা দিয়ে ২০২২ এর অক্টোবরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র র্র্যাবের বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তার উপর আমেরিকা সফরে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। বাংলাদেশের বিরোধী দলগুলি হাসিনা জামানায় বারে বারে গুম খুন অপহরণ এবং আটকে রেখে নির্যাতন-নিপীড়নের অভিযোগ করেছে।
এদিকে, ইতিমধ্যে ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক মানবতা বিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু সংশোধন করেছে সরকার। তার মধ্যে অন্যতম হল মানবতাবিরোধী অপরাধে কারও বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করা হলে তিনি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। কোন স্বশাসিত এবং আধা সরকারি সংস্থার পদেও থাকতে পারবেন না। এছাড়া সরকারি চাকরি পাওয়ার যোগ্যতা হারাবেন। সেইসঙ্গে অভিযুক্তরা সরকারি চাকুরিজীবী হলে তাদের বরখাস্ত করা হবে। আয়না ঘর মামলায় অভিযুক্ত ১২ অফিসার এর মধ্যে চারজন কর্মরত। তাদের দুজন মেজর জেনারেল এবং দুজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল। কর্মরত ৪ অফিসার হলেন মেজর জেনারেল কবির, মেজর জেনারেল শেখ সরওয়ার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কামরুল এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আজাদ। নাম আছে কর্নেল মোমেনের।
অন্যদিকে টিএফআই মামলায় অভিযুক্ত ১২ অফিসার এর মধ্যে নয় জন কর্মরত। তাঁদের পাঁচজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, একজন কর্নেল এবং তিনজন লেফটেন্যান্ট কর্নেল। এই অফিসাররা হলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তোফায়েল, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুব, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কামরুল, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আজাদ, কর্নেল মোমেন, লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারোয়ার বিন কাসেম, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মশিউর, লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল সুমন।
বাংলাদেশ সরকারের একাধিক সূত্র জানাচ্ছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল আইনের সাম্প্রতিক সংশোধনী অনুযায়ী অভিযুক্ত অফিসারদের চাকরি থেকে বসিয়ে দেওয়া হতে পারে।
প্রশ্ন হল তারপরে এই অফিসারদের বিচার সেনা আইনে, নাকি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেই সম্পন্ন করা হবে। কোন কোন মহল অতীত দৃষ্টান্ত টেনে বলছেন ফৌজদারি আদালতের বিচারক মনে করলে সেনা কর্মকর্তাদের বিচারের ভার সেনা আদালতের হাতে অর্পণ করতে পারেন। যদিও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটররা দাবি করেছেন এই আইন বাংলাদেশের সমস্ত নাগরিকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। ফলে কেউ সেনাবাহিনীতে চাকরি করেন বলে অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তার বিচার করা যাবে না এমন কোন বিধান নেই।
তবে ইতিমধ্যে তুমুল অশান্তি শুরু হয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মধ্যে। পরশুদিন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনা ও অবসরপ্রাপ্ত এবং কর্মরত সেনা অফিসারদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হওয়ার পর বাহিনীর মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হয়। পরিস্থিতি বিবেচনা করে সেনাপ্রধান ওয়াকার উজ জামান বৃহস্পতিবার ঢাকার সেনানিবাসে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক করেছেন। অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন অনুযায়ী কর্মরত সেনা অফিসারদের চাকরি থেকে বসিয়ে দিতে হলে তাকেই এই ব্যাপারে পদক্ষেপ করতে হবে। তাঁর সুপারিশ মেনে তাতে রায় দেবেন রাষ্ট্রপতি। জানা গিয়েছে ট্রাইব্যুনালে অভিযুক্ত করার পিছনে সেনাপ্রধানের ইন্ধন ছিল। আবার সরকারি সিদ্ধান্তে তিনিই অস্বস্তিতে পড়েছেন। কারণ চলতি সপ্তাহের আগে ট্রাইব্যুনালের আইনে অভিযুক্তদের চাকরি থেকে বসিয়ে দেওয়ার কোন বিধান ছিল না। এখন ১৫ জন কর্মরত অফিসারকে বরখাস্ত করতে হলে সেনায় ছোটখাটো অভুত্থান হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও ওয়াকিবহালমহল উড়িয়ে দিচ্ছে না। বাংলাদেশের ইতিহাসে অতীতে কোন মামলায় এত জন সেনা অফিসার একসঙ্গে অভিযুক্ত হননি। অবসরপ্রাপ্ত সেনা অফিসারেরাও গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। তাঁদের অনেকের ব্যাচমেট বর্তমানে বাহিনীতে আছেন। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে এই মুহূর্তে তুমুল অশান্তি চলছে বলে খবর। সেনাপ্রধান ওয়াকার এই পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেন সেটাই এখন দেখার। ইতিমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে অভিযুক্ত সেনা কর্তাদের বিরুদ্ধে এতদিন সেনাবাহিনী কেন ব্যবস্থা নেয়নি। কেন হাসিনা জমানার পতনের আগে এবং পরবর্তী ১৩-১৪ মাস সেনাপ্রধান হাত গুটিয়েছিলেন।