পশ্চিমবঙ্গে ক্যানসারের বাড়বাড়ন্ত রুখতে কীভাবে সাধারণ মানুষ নিজের জীবনযাপন, সচেতনতা, স্ক্রিনিং ও সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে বড় পরিবর্তন আনতে পারেন—জানুন বিস্তারিত প্রতিবেদনে।

ডক্টর শুভদীপ চক্রবর্তী (কনসালট্যান্ট সিনিয়র সার্জিক্যাল অঙ্কোলজিস্ট)
শেষ আপডেট: 4 February 2026 19:50
পশ্চিমবঙ্গে (West Bengal) ক্যানসারের (Cancer) প্রকোপ যে ধীরে ধীরে ভয়াবহ আকার নিচ্ছে, তা আজ আর অস্বীকার করার উপায় নেই। চিকিৎসকদের (Doctors) একাংশের মতে, তামাকজাত দ্রব্যের (Tobacco) অতিরিক্ত ব্যবহার, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস (Food Habit), শারীরিক পরিশ্রমের (Physical Exercise) অভাব এবং সর্বোপরি সচেতনতার (Awareness) ঘাটতিই এই বিপদের মূল কারণ। কিন্তু এই অন্ধকার ছবির মধ্যেও একটা আশার আলো আছে—সেটা হল, সাধারণ মানুষের ছোট ছোট উদ্যোগই পারে বড় পরিবর্তন এনে দিতে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্যানসার প্রতিরোধ একদিনের কাজ নয়। এটা আসলে একটা দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক আন্দোলন, যেখানে প্রতিটি মানুষ নিজের জায়গা থেকে দায়িত্ব নিলে গোটা রাজ্যের ছবিটাই বদলে যেতে পারে।
জীবনযাপনে বদল আনাই প্রথম ধাপ
ক্যানসার প্রতিরোধের লড়াই শুরু হয় নিজের ঘর থেকেই। পশ্চিমবঙ্গে ওরাল ও লাংস ক্যানসারের অন্যতম বড় কারণ তামাকজাত দ্রব্য— গুটখা, খৈনি, সিগারেট বা বিড়ি। এগুলো ছেড়ে দেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। একই সঙ্গে খাদ্যাভ্যাসেও নজর দেওয়া দরকার। রোজকার পাতে বেশি করে ফল, সবজি, সম্পূর্ণ শস্য রাখলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার আর অ্যালকোহল কমানো জরুরি।
রাজ্যে রাস্তার খাবারের চল খুব জনপ্রিয়, কিন্তু সেগুলির স্বাস্থ্যঝুঁকিও কম নয়। তাই যতটা সম্ভব ঘরে রান্না করা খাবারের দিকে ঝোঁক বাড়ানোই বুদ্ধিমানের কাজ। পাশাপাশি নিয়মিত অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে, যা ক্যানসারের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
সচেতনতার আলো ছড়াক পাড়ায়-পাড়ায়
ক্যানসার নিয়ে ভয়, লজ্জা আর ভুল ধারণা এখনও সমাজে খুবই প্রচলিত। এই জায়গাতেই সাধারণ মানুষের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি দরকার। পরিবার, বন্ধু, প্রতিবেশীদের সঙ্গে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ ধরা পড়লে চিকিৎসা কতটা সহজ হয়, সেই কথা বারবার বলা দরকার। ক্যানসার ফাউন্ডেশন অফ ইন্ডিয়া বা রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের বিনামূল্যের স্ক্রিনিং ক্যাম্পের খবর ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে।
কলকাতা হোক বা গ্রামীণ জেলা—সোশ্যাল মিডিয়া, পাড়া-প্রতিবেশীর হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ, কিংবা স্থানীয় ক্লাব—সব জায়গাতেই ‘পিঙ্ক রিবন’ জাতীয় সচেতনতা কর্মসূচির মতো উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব। দুর্গাপুজো বা অন্য উৎসবের সময় পাড়ায় ছোট আলোচনা সভা হলে, অনেক মানুষই প্রথমবার এই বিষয়গুলো নিয়ে খোলাখুলি কথা বলার সুযোগ পাবেন।
মাঠে নেমে কাজ করার গুরুত্ব
শুধু কথা বললেই হবে না, কাজে নামাও জরুরি। জাতীয় ক্যানসার নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আওতায় যে সরকারি উদ্যোগগুলি চলছে, সেগুলিতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যুক্ত হওয়া যেতে পারে। মুর্শিদাবাদ, দার্জিলিং বা প্রত্যন্ত এলাকার স্বাস্থ্য শিবিরগুলিতে মানুষের এখনও ঠিকমতো চিকিৎসা পরিষেবার সুযোগ মেলে না—সেখানে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলে তার প্রভাব সুদূরপ্রসারী হয়।
চিত্তরঞ্জন ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউটের মতো প্রতিষ্ঠানে রক্তদান বা আর্থিক সহায়তা অনেক রোগীর চিকিৎসার পথ খুলে দিতে পারে। আবার চা বাগান অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে, যেখানে ধূমপানের প্রবণতা তুলনামূলক বেশি, সেখানে ধূমপানমুক্ত অঞ্চল গড়ে তুলতে স্থানীয়ভাবে উদ্যোগ নেওয়াও বড় পদক্ষেপ হতে পারে।
পলিসি তৈরিতেও নাগরিকের কণ্ঠ জরুরি
ক্যানসার শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, এটা পরিবেশ ও সামাজিক কাঠামোর সঙ্গেও জড়িত। হাওড়ার মতো শিল্পাঞ্চলে দূষণ নিয়ন্ত্রণের দাবিতে পিটিশনে সই করা বা স্থানীয় প্রশাসনের কাছে দাবি জানানো নাগরিক দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। স্কুল, কলেজ এবং কর্মক্ষেত্রে ক্যানসার সংক্রান্ত শিক্ষা ও সচেতনতা কর্মসূচি বাধ্যতামূলক করার দাবিও তোলা যেতে পারে।
এ ছাড়া আয়ুষ্মান ভারতের মতো স্বাস্থ্য প্রকল্প যাতে আরও বেশি দরিদ্র পরিবার পর্যন্ত পৌঁছয়, সেই দাবিতে জনপ্রতিনিধিদের পাশে দাঁড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সময়মতো চিকিৎসা না পেলে অনেক ক্ষেত্রেই ক্যানসার প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।
পরীক্ষা করান, অন্যকেও উৎসাহ দিন
চিকিৎসকদের মতে, ক্যানসার যত আগে ধরা পড়ে, চিকিৎসা তত সহজ ও সফল হয়। যাঁদের বয়স ৪০-এর বেশি বা পরিবারে ক্যানসারের ইতিহাস আছে, তাঁদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো অত্যন্ত প্রয়োজন। সরকারি অনেক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বিনামূল্যে ম্যামোগ্রাম বা প্যাপ স্মিয়ারের মতো পরীক্ষা করা হয়—এই তথ্যটা ছড়িয়ে দেওয়া দরকার।
বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার মহিলারা অনেক সময় লজ্জা বা ভয়েই পরীক্ষা করাতে চান না। তাঁদের পাশে দাঁড়িয়ে সাহস জোগানোই পারে বহু প্রাণ বাঁচাতে।
একসঙ্গে লড়লেই বদল সম্ভব
এই সব উদ্যোগ একত্রে ক্যানসার প্রতিরোধের লড়াইকে আরও শক্তিশালী করে। ‘ইউনাইটেড বাই ইউনিক’-এর মতো ভাবনায় বিশ্বাস রেখে সমাজ একসঙ্গে এগোলে, এই রোগের বিরুদ্ধে লড়াই অনেকটাই সহজ হয়। নিজের অগ্রগতি নজরে রাখতে একটি স্বাস্থ্য ডায়েরি রাখা যেতে পারে—কবে কী পরীক্ষা করালেন, কী বদল আনলেন, সব নথিভুক্ত থাকলে নিজেকেও সচেতন রাখা সহজ হয়।
পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে, রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের ওয়েবসাইটে চোখ রাখা যেতে পারে আসন্ন সচেতনতা কর্মসূচি বা স্বাস্থ্য শিবিরের খোঁজে। আর সুযোগ পেলেই স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে নাম লেখানো—কারণ ক্যানসারের বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে, আপনার ছোট উদ্যোগই হতে পারে কারও নতুন জীবনের শুরু।