সার্ভিক্যাল ক্যানসারের (Cervical cancer) প্রাথমিক উপসর্গগুলো কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে খুবই সাধারণ। কিন্তু অবহেলা থেকেই ছোট্ট একটা সমস্যা ভবিষ্যতে ক্যানসারের রূপ নেয়।

সার্জিক্যাল অঙ্কোলজিস্ট, ডক্টর শুভদীপ চক্রবর্তী
শেষ আপডেট: 4 February 2026 12:35
লিভার (Liver cancer) বা ফুসফুস ক্যানসার (Lung cancer) নিয়ে মানুষ যতটা সচেতন, সার্ভিক্স (cervix) নিয়ে অতটা মাথাব্যথা নেই। তার একটা বড় কারণ এটাও যে, অনেকের কাছে এটাই একটা বড় প্রশ্ন, সার্ভিক্স শরীরের কোথায় থাকে (what is cervix)! কিন্তু ২০২৬-এ দাঁড়িয়ে শুধু সার্ভিক্যাল ক্যানসার (cervical cancer)-ই একমাত্র ক্যানসার যেটা ভ্যাকসিন (cervical cancer vaccine) দিয়ে প্রতিরোধ সম্ভব। তার জন্য দরকার সময় থাকতে সঠিক সচেতনতা। সার্ভিক্যাল ক্যানসার লজ্জার নয়, চিকিৎসায় (cervical cancer treatment) দেরি এবং মৃত্যু (cervical cancer death) - এটা বরং বেশি লজ্জার।
দেখুন ভিডিও।
সার্ভিক্স শরীরের ঠিক কোথায় থাকে (where is cervix in body)?
ইউটেরাস (uterus) আর ভ্যাজাইনা (vagina) বা যোনিকে সংযুক্ত করছে সার্ভিক্স। সোজা বাংলায় যাকে বলে জরায়ুমুখ। প্রেগন্যান্সিতে (pregnancy) এটি ইউটেরাসের মুখ বন্ধ করে সন্তানকে সময়ের আগে বেরিয়ে আসা থেকে সুরক্ষা দেয়। পিরিয়ডের সময় সার্ভিক্স হয়েই ব্লাড শরীরের বাইরে বেরিয়ে আসে।
সার্ভিক্যাল ক্যানসার কেন হয়?
সার্ভিক্স আর ভ্যাজাইনার মাঝখানে যে কোষগুলি থাকে, তার বদল ঘটলে সার্ভিক্যাল ক্যানসার হয়। তার পিছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা থাকে HPV ভাইরাসের।
এই HPV ভাইরাসের অনেক ধরন রয়েছে। তার মধ্যে শুধুমাত্র চারটেই ক্যানসার তৈরি করতে পারে। জনসংখ্যার প্রায় ৮০-৯০% মহিলা জীবনকালে এই ভাইরাসে সংক্রামিত (HPV infection) হন। সমস্যা তখনই হয়, যদি সময়ে চিকিৎসা শুরু না হয়। একমাত্র তবেই সংক্রমণ ক্যানসার (infection to cancer) পর্যন্ত পৌঁছয়।
সার্ভিক্যাল ক্যানসার নিয়ে অনেক ভ্রান্ত ধারণাও রয়েছে (cervical cancer myth)
অনেকের মধ্যে এই ধারণা রয়েছে যে, একবার সন্তান হয়ে গেলে এই ক্যানসার হয় না। আবার বিয়ে হলেই যে শুধু সার্ভিক্যাল ক্যানসারের ঝুঁকি (cervical cancer risk) রয়েছে, এমন ধারণার কোনও ভিত্তি নেই। একের বেশি সঙ্গী থাকলেও হতে পারে।
সার্ভিক্যাল ক্যানসার ছড়াতেও পারে (cervical cancer transmission)
ক্যানসারের মতো রোগ একজনের শরীর থেকে আরেকজনের মধ্যে ছড়িয়েও পড়তে পারে। কারণ HPV ভাইরাস সার্ভিক্সে প্রভাব ফেলে। এমনকি মায়ের যদি এই ভাইরাসের সংক্রমণ থাকে, তাহলে নর্মাল ডেলিভারির সময়ে বাচ্চাও সংক্রমিত হতে পারে।
সার্ভিক্যাল ক্যানসার যৌন সঙ্গমের মাধ্যমে সঙ্গীর শরীরে ছড়াতে পারে, 'স্কিন টু স্কিন কনট্যাক্ট' এই ক্যানসারের ক্ষেত্রে একটা বড় কারণ।
প্রাথমিক উপসর্গ (cervical cancer symptoms) অবহেলা করবেন না
এদেশের বড় চিন্তার কারণ এটাই যে, গোটা বিশ্বের সার্ভিক্যাল ক্যানসারের তিন ভাগের এক ভাগ দেখা যায় ভারতেই। পৃথিবীতে ১০০টি মৃত্যু হলে তার মধ্যে ৫০টিই ঘটে এ দেশে। অথচ সমস্যা কিন্তু খুবই সাধারণ। হোয়াইট ডিসচার্জ বা স্রাবে দুর্গন্ধ, তলপেটে ব্যথা, সহবাসের সময় বা তার পর ব্যথা, হেভি ব্লিডিং, পিরিয়ডের মাঝে ব্লিডিং-এর মতো প্রাথমিক উপসর্গগুলো বুঝতে হবে। মেনোপজের পরও ব্লিডিং (bleeding after menopause) হওয়া -সার্ভিক্যাল ক্যানসারের অশনি সংকেত।
উপসর্গ মানেই ক্যানসার নয়, কিন্তু সচেতনতাই আসল
প্রাথমিক উপসর্গ বলতে যা বলা হচ্ছে, সেগুলো কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে খুবই সাধারণ। সেরকম কোনও উপসর্গ দেখা দেওয়া মানেই সেটা ক্যানসার নয়, ইনফেকশনের মতো আরও অনেক কারণেই সেসব হতে পারে। কিন্তু সমস্যা ঠিক কী কারণে হচ্ছে, সেটা বোঝা দরকার। কারণ এই অবহেলা থেকেই ছোট্ট একটা সমস্যা ভবিষ্যতে ক্যানসারের মতো ভয়াবহ রূপ নেয়।
সার্ভিক্যাল ক্যানসার লজ্জার (cervical cancer stigma) নয়
২০২৬-এ দাঁড়িয়েও সার্জিক্যাল ক্যানসারের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সমাজের ঠিক করে দেওয়া কিছু তকমা। শহরের মানুষের মধ্যেও এই প্রবণতা প্রকট। চিকিৎসকজীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে এটা বলতে পারি, লজ্জা বা স্টিগমা থেকেই অনেকেই উপসর্গ এড়িয়ে যান, এমনকি বাড়িতেও জানান না। কারণ একটা ধারণা আছে যে, সার্ভিক্যাল ক্যানসার মানেই 'চরিত্র খারাপ'। লোক জানাজানির ভয়ে অনেকে সার্জারির পর বাধ্যতামূলক রেডিয়েশন বা কেমোথেরাপি নিতে চান না। এই জন্য ক্যানসার ফিরে আসে। প্রাথমিক স্টেজে হয়তো যেটা সেরে যেত, সেটাই বাড়াবাড়ি হয়ে যায়। এটা রুখতেই হবে।