উত্তরপ্রদেশের এক তরুণীকে লক্ষ্য করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘ফ্রেন্ডশিপ’-এর নামে প্রতারণা। ‘ডঃ খান’ পরিচয়ে জাল প্রোফাইল, ভুয়ো গিফট পার্সেল, কাস্টমস, CBI-র নামে হুমকি, মাত্র ১০ দিনে প্রায় সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েন তিনি। কী ভাবে এই চক্র মহিলাদের টার্গেট করে এবং কী ভাবে বাঁচবেন এই ফাঁদ থেকে?

ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি
শেষ আপডেট: 23 November 2025 15:35
দ্য ওযাল ব্যুরো: উত্তরপ্রদেশের এক ছোট শহরে ছটপুজোর দিন আচমকাই ফোনে নোটিফিকেশন দেখেছিলেন নিনা (নাম পরিবর্তিত)। ‘Instagram user’ বন্ধুত্ব করতে চাইছে। উৎসবের ভিড়ে পাত্তা না দিলেও পরে ফের মেসেজ আসে। নিজেকে ‘Dr Khan’ বলে পরিচয় দেওয়া ওই ব্যক্তি দাবি করেন, তিনি পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত, লন্ডনের চিকিৎসক, (MBBS), (London), (Instagram), (WhatsApp), সব মিলিয়ে সাজানো-গোছানো প্রোফাইল দেখে বিশ্বাস হয়ে যায়। তিন দিনে ইনস্টাগ্রাম থেকে তাদের কথাবার্তা চলে যায় WhatsApp-এ।
কথায় কথায় ভিডিও কলের অনুরোধ করতেন ওই ব্যক্তি। কিন্তু নিনা কখনও তাঁর মুখ দেখেননি। ‘নেটওয়ার্ক সমস্যা,’ এই ছিল তাঁর ব্যাখ্যা। একই সঙ্গে লন্ডনের চাকচিক্যের জীবন দেখানোর চেষ্টা, আর নিনার ছোট শহরের বাস্তবতা— সে সব কথা মিলিয়ে দ্রুতই তৈরি হয় আস্থার সম্পর্ক।
পাঁচ দিনের মাথায় ‘Dr Khan’ হঠাৎই বিয়ের প্রস্তাব দেন। নিনা সরাসরি 'না' বলেন। তখন তিনি নিনার আধার কার্ড (Aadhaar) চাইতে শুরু করেন। নিনা জানান, তাঁর নথিপত্র বাবার কাছে থাকে। সঙ্গে সঙ্গেই কৌশল বদলান ওই ব্যক্তি। ‘আমি তোমায় কিছু উপহার পাঠাতে চাই,’ জানিয়ে ফোনে পাঠাতে থাকেন কেনাকাটার ভিডিও: দামি (iPhone), গয়না, শাড়ি, দাবি করেন, সব মিলিয়ে লাখ টাকার জিনিস।
ঠিকানা না দিলেও তিনি জানান, উপহার ইতিমধ্যেই পাঠানো হয়েছে। পরদিন সকালেই WhatsApp-এ ফোন আসে ‘Mumbai Airport office’ থেকে। বলা হয়, তাঁর নামে পার্সেল এসেছে। মুম্বই না থাকায় তাঁরা নাকি কুরিয়ার করে পাঠাতে চান, তার জন্য লাগবে ৪,০০০ টাকা প্রসেসিং ফি (Processing fee)।
নিনা টাকা দিতে অস্বীকার করতেই ভয় দেখানো শুরু। বলা হয়, এটি নাকি ‘CBI’-র কাছে পাঠানো হবে, কারণ আন্তর্জাতিক হাই-ভ্যালু জিনিস এসেছে তাঁর নামে। আতঙ্কিত নিনা ফোন করেন ‘Dr Khan’-কে। তিনি সব জানেন না বলে দাবি করে উলটে নিনাকেই দায়ী করতে থাকেন।
চাপে পড়ে বন্ধুদের থেকে ধার করে নিনা সেই ৪,০০০ টাকা পাঠান। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। পরের দিন ফের ফোন আসে, এবার দাবি করা হয় ১২,০০০ টাকা। না দিলে আবারও CBI-র ভয়। ‘Dr Khan’-এর সুর আরও বদলায়, হুমকি দেন, নেটওয়ার্ক সমস্যার সময়ে করা ভিডিও কল থেকে তাঁর ছবি-ভিডিও নাকি গোপনে রেকর্ড করা হয়েছে, সেগুলো সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া হবে।
হতবিহ্বল নিনা শেষমেশ দৌড়ন একটি গয়নার দোকানে। সোনার দুল বেচে ১২,০০০ টাকা পাঠাতে যান দোকানির মাধ্যমে। কিন্তু লেনদেন ব্যর্থ হয়। এর পরেই ব্যাঙ্ক তাঁকে ফোন করে সতর্ক করে। পরিস্থিতি শুনেই দোকানি নিনার দুল ফিরিয়ে দেন। ব্যাঙ্ক কর্মীও তাঁকে বোঝান, তিনি প্রতারণার ফাঁদে পড়েছেন।
এর পর সব নম্বর ব্লক করে দেন তরুণী, ‘airport office’, ‘CBI’, এমনকি ‘Dr Khan’। পরিবার-সমাজের প্রতিক্রিয়ার ভয়ে তিনি এখনই অভিযোগ জানাননি। তবে পরিবারকে বিষয়টি জানিয়েছেন।
এই ধরনের প্রতারণা কেবল নিনার ঘটনা নয়। বহু মহিলা এমন ভয় দেখানো, ভিডিও দিয়ে ব্ল্যাকমেল, ভুয়ো ‘Customs’, ভুয়ো ‘CBI’ চক্রের শিকার হন।
এ ধরনের প্রতারণা কীভাবে কাজ করে?
সাইবার বিশেষজ্ঞ অজয় সিং জানাচ্ছেন, প্রথমে সোশ্যাল মিডিয়ায় যেমন ফেসবুক (Facebook), ইনস্টাগ্রাম (Instagram), স্ন্যাপচ্যাট (Snapchat) প্রোফাইল ব্যবহার করে বন্ধুত্বের অনুরোধ পাঠানো হয়। কয়েক দিনের কথাবার্তার পর বলা হয় ‘গিফট’ পাঠানো হবে। পরে ভুয়ো কাস্টমস অফিসার (Customs Officer)-এর ফোন, হাই ভ্যালু পার্সেল (high-value parcel), কাস্টম ডিউটি (custom duty)। টাকা দিলে আরও দাবি, ফরেন কারেন্সি ফাউন্ড (foreign currency found), শেষে ব্ল্যাকমেল।
কী ভাবে বাঁচবেন এই ফাঁদ থেকে?
অনেকেই ভয় বা লজ্জায় অভিযোগ করেন না। কিন্তু নিনার মতো আরও অনেকে সময়মতো সতর্ক হলে হয়তো বড় ক্ষতি এড়ানো সম্ভব।