বাংলাদেশে ভারতের বর্তমান হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মার মেয়াদ বেশ কিছুদিন আগেই শেষ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু ঢাকায় কে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হবেন তা নিয়ে নয়া দিল্লি এখনও কোন সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করতে না পারায় ভার্মা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। বলা চলে উত্তরসূরির জন্য তিনি কিছুটা কাজ এগিয়ে রেখে যাচ্ছেন।

শেষ আপডেট: 31 March 2026 16:37
বাংলাদেশে ভারতের বর্তমান হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মার মেয়াদ বেশ কিছুদিন আগেই শেষ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু ঢাকায় কে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হবেন তা নিয়ে নয়া দিল্লি এখনও কোন সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করতে না পারায় ভার্মা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। বলা চলে উত্তরসূরির জন্য তিনি কিছুটা কাজ এগিয়ে রেখে যাচ্ছেন।
শেষ পর্যন্ত কে হবেন ঢাকায় ভারতের পরবর্তী হাইকমিশনার তা নিয়ে জোর জল্পনা চলছে। ইন্দোনেশিয়ায় কর্মরত ভারতের রাষ্ট্রদূত সন্দীপ চক্রবর্তীকে বাংলাদেশে হাইকমিশনার করে পাঠানো হবে বলে বেশ কয়েক মাস আগে থেকেই জানা ছিল। তিনি এক সময় ঢাকায় ভারতের ডেপুটি হাইকমিশনার ছিলেন। তিনি ঢাকায় গুরুদায়িত্ব নিয়ে যাচ্ছেন জানার পর বাংলাদেশ নিয়ে নিজের মতো করে প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছিলেন।
তবে সর্বশেষ খবর তাঁকে আপাতত ইন্দোনেশিয়াতেই রেখে দেওয়া হতে পারে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার হবেন কে? জানা যাচ্ছে আরএসএস ও বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব বাংলাদেশে এই মুহূর্তে কোন পেশাদার কূটনীতিকের পরিবর্তে একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিক ও প্রশাসককে হাইকমিশনার করে পাঠানোর পক্ষপাতী। এই ভাবনার সূত্র ধরে দুটি নাম নিয়ে সরকারি মহলে আলোচনা চলছে। তাদের একজন বিহারের রাজ্যপাল আরিফ মহম্মদ খান। অপরজন সাংবাদিক এমজে আকবর।
দুজনেই এক সময় কেন্দ্রের মন্ত্রী ছিলেন। কানপুরের বাসিন্দা আরিফ মহম্মদ খান এর আগে কেরলের রাজ্যপালের দায়িত্ব পালন করেছেন। তার আগে তিনি ছিলেন রাজীব গান্ধীর মন্ত্রিসভার প্রতিমন্ত্রী। শাহবানু মামলায় সুপ্রিম কোর্ট তালাকপ্রাপ্ত মহিলাকে খোরপোষ দেওয়া বাধ্যতামূলক করে রায় দিলে তা বদলে দিতে প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর সংসদে আইন এনেছিলেন। রাজীবের সেই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন আরিফ মহম্মদ খান। পরবর্তীকালে কংগ্রেস ত্যাগ করেন এই নেতা।
অন্যদিকে এমজি আকবরের সঙ্গে রাজীব গান্ধীর ছিল বন্ধুত্বের সম্পর্ক। ১৯৮৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে রাজীব গান্ধীর অনুরোধে সাংবাদিক এমজে আকবর বিহারের কিষানগঞ্জ থেকে প্রার্থী হন। উর্দুভাষী আকবরের জন্ম ও বেড়ে ওঠা পশ্চিমবঙ্গের হুগলির ভদ্রেশ্বরে। ফলে তিনি ইংরেজি উর্দু হিন্দির পাশাপাশি বাংলাতেও সচ্ছন্দ। নরেন্দ্র মোদীর প্রথম মন্ত্রিসভায় তিনি বিদেশ দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। ভারতে মি টু আন্দোলনের সময় আকবরের কিছু প্রাক্তন সাংবাদিক সহকর্মী তাঁর বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ করায় তিনি মন্ত্রিসভা থেকে সরে দাঁড়ান।
বাংলাদেশের সঙ্গে আকবরের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ রয়েছে। সে দেশের সাংবাদিক লেখক বুদ্ধিজীবী তো বটেই সরকারি কর্তাদের সঙ্গেও তাঁর সুসম্পর্ক রয়েছে বহু বছর। কলকাতায় দ্য টেলিগ্রাফ ও পরবর্তীকালে দ্য এশিয়ান এজের সম্পাদক হিসেবে সম্পর্ক আরও গভীর হয়। বিদেশ মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী থাকার সময় এই সম্পর্ক আরও জোরদার হয়েছিল। গত ২৬ মার্চ দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশন অফিসে সেদেশের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আকবর।
অন্যদিকে, আরিফ মহম্মদ খান হলেন নরেন্দ্র মোদীর অত্যন্ত পছন্দের মানুষ। তাঁর মতো হিন্দুত্ববাদী মুসলিম মুখ ভারতে বিরল। এখন দেখার নয়াদিল্লি সত্যিই পেশাদার কূটনীতিকে পরিবর্তে কোন রাজনৈতিককে ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার করে পাঠায় কিনা। সে ক্ষেত্রে আরিফ মহম্মদ খান এবং এমজে আকবরদের নাম বিবেচিত হয় কিনা তা নিয়েও কৌতূহল আছে।
তৃতীয় একটি নাম নিয়েও জল্পনা আছে। তিনি হলেন কংগ্রেস নেতা শশী তারুর। কেরলে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস ক্ষমতায় এলে শশী রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার চেষ্টা করবেন।
কংগ্রেসে তাঁর আশা পূর্ণ না হলে তাঁকেও ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার করে পাঠানোর সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না। কংগ্রেসের তিরুবনন্তপুরমের এই সাংসদ নরেন্দ্র মোদীর অত্যন্ত আস্থাভাজন। বিদেশ নীতিতে তাঁর দল কংগ্রেস নরেন্দ্র মোদীকে দশে শূন্য দিলেও তিনি সর্বদা বর্তমান সরকারের বৈদেশিক বিষয়ক সিদ্ধান্তগুলিকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে আসছেন। বর্তমানে সংসদের বিদেশ বিষয়ক সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান শশী বাংলাদেশ সম্পর্কে একজন ওয়াকিবহাল রাজনীতিক। তিনি সে দেশের কয়েকটি পত্রপত্রিকায় নিয়মিত কলম লেখেন।
তবে হাসিনা সরকারের পতনের আগে থেকেই তিনি আওয়ামী লিগের কট্টর সমালোচক ছিলেন। সংসদীয় কমিটির বৈঠকেও তাঁর উত্থাপিত প্রশ্নও আওয়ামী লিগের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়েছে। ফলে এমন একজন ব্যক্তিকে নরেন্দ্র মোদীকে ঢাকায় তাঁর দূত করে পাঠাবেন কিনা সে প্রশ্ন উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এখন প্রশ্ন হল কোন পেশাদার কূটনীতিক বা ক্যারিয়ার ডিপ্লোমাটের পরিবর্তে রাজনীতিক অথবা প্রশাসককে ঢাকায় হাইকমিশনার করে পাঠানোর ভাবনা কেন এল?
জানা যাচ্ছে বাংলাদেশে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সঙ্গে বোঝাপড়ার পাশাপাশি প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে কার্যকরী বোঝাপড়া গড়ে তোলা দিল্লির লক্ষ্য। বিজেপি ও আরএসএস-এর শীর্ষ নেতৃত্বের একাংশ মনে করছে বাংলাদেশে আগামী দিনে ভারতকে যেভাবে পদক্ষেপ করতে হবে তাতে সরকারের চাহিদা বিবেচনায় রেখে কোন রাজনীতিক অথবা দক্ষ প্রশাসককে সে দেশে পাঠালে আদতে নয়া দিল্লি লাভ হবে। অতীতে বাংলাদেশে হাইকমিশনারের দায়িত্ব পালন করা অনেক কূটনীতিকের বিষয়েই নয়া দিল্লির কর্তারা সন্তুষ্ট নন। তাঁদের অধিকাংশই নির্ধারিত সময়ে কাটিয়ে ঢাকা থেকে চলে এসেছেন। দেশের স্বার্থে সম্পর্ককে তেমন একটা মজবুত করতে পারেননি।
নয়া দিল্লির একটি সূত্রের বক্তব্য, আগামী দিনে বিএনপি সরকারের পাশাপাশি ভারত সেদেশের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী সহ অন্যান্য দলগুলি সঙ্গেও সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী। জাতীয় সংসদে ৭৭টি আসন নিয়ে প্রধান বিরোধীদলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে জামাইটি ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ইসলামিক দলগুলির জোট। তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে শেখ হাসিনা সরকারের উৎখাতের সঙ্গে জড়িত বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে তৈরি জাতীয় নাগরিক পার্টি।
ভারত সরকার এখন মনে করছে তারেক রহমানের সরকারকে চাপে রাখার কৌশল হিসেবেও অন্যান্য দলগুলির সঙ্গে নয়া দিল্লির কাজের সম্পর্ক থাকা দরকার। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক বিষয়ে অভিজ্ঞ এক বিশেষজ্ঞের মত হল, তারেক রহমানের সরকারকে আগামীদিনে প্রতি পদে পদে চাপে রাখবে জামায়েত ইসলামী।
সেক্ষেত্রে তারেক সরকারের কাছ থেকে ভারতের স্বার্থ আদায় করতে হলে জামায়াতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখাটা অত্যন্ত সুকৌশলী সিদ্ধান্ত হবে। আর এই কাজে রাজনীতিবিদ কূটনীতিকে তুলনায় বেশি সফল হতে পারেন। গেরুয়া ও পদ্ম শিবিরের একাংশের বক্তব্য, আওয়ামী লিগের জাতীয় সংসদে না থাকা এবং দলটির উপর নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকায় বাংলাদেশে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তাতে কূটনীতিকদের প্রচলিত পথে সম্পর্কে র উন্নয়ন সহজ হবে না। সেই কাজের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হতে পারে অবিরাম ডায়লগ। এই কাজের দক্ষ ভূমিকা পালন করতে পারেন কোনও রাজনৈতিক।