ইরান এবং আমেরিকা ও ইজরায়েলের যুদ্ধ বিরতি নিশ্চিত করে পাকিস্তান এই মুহূর্তে কূটনৈতিক তৎপরতায় অনেকটা এগিয়ে গিয়েছে। আর এখানেই এসেছে ভারতের নীরবতা বা নিষ্ক্রিয়তার প্রশ্নটি।

শেষ আপডেট: 9 April 2026 11:26
ইরানের সঙ্গে আমেরিকা ও ইজরায়েলের ৩৯ দিনব্যাপী চলা যুদ্ধের অবশেষে বিরতি (Iran America Israel ceasefire) হয়েছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ সব দেশের জাহাজ চলাচল (Hormuz ship movement) অচিরেই শুরু হবে। যুদ্ধ বিরতির ঘোষণায় ইতিমধ্যে বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজার চাঙ্গা হয়েছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামীকাল শুক্রবার ইসলামাবাদে ইরান ও মার্কিন কর্তারা পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় মুখোমুখি বৈঠকে (Islamabad Iran war talk) বসতে চলেছেন যুদ্ধ বিরতিকে স্থায়ী রূপ দিতে।
এই যুদ্ধ থামাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারে বারে যেমন ইরানকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন পাশাপাশি শান্তি প্রস্তাবও (Donald Trump on Iran) দিয়ে গিয়েছেন লাগাতার। কিন্তু ইরান তাতে কর্ণপাত করেনি। যুদ্ধের একটি পক্ষ হওয়া সত্ত্বেও ট্রাম্পের তরফে বারে বারে যুদ্ধ থামানোর প্রস্তাব ঘিরে বিশ্বজুড়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল কোথায় গেল মার্কিন প্রেসিডেন্টের সিংহ গর্জন। শেষ পর্যন্ত ইরান যুদ্ধ থামাতে সম্মত হলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট কৃতিত্ব দাবি করেননি।
আসলে দেশের মধ্যে ট্রাম্পের উপর চাপ বাড়ছিল। তিনি যে কোনও মূল্যে যুদ্ধ থামাতে চাইছিলেন। দেশের বাইরেও ক্রমশ নির্বান্ধব হয়ে পড়ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ইউরোপের সামরিক জোট ন্যাটোর কোনও সদস্য দেশ ইরানের ওপর হামলা এবং হরমুজ প্রণালী মুক্ত করতে যুদ্ধে যোগ দিতে রাজি হয়নি। এমনকি ফ্রান্স ও ইতালি অবতরণের মুখে মার্কিন যুদ্ধবিমানকে ফিরিয়ে দিয়েছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্টারমার মার্কিন প্রেসিডেন্টের মুখের ওপর বলে দেন ব্রিটেন এই যুদ্ধে যোগ দেবে না। যদিও ব্রিটিশ ও মার্কিন সামরিক ঘাঁটি দিয়াগো গার্সিয়ায় একবার হামলা চালায় ইরান। ওই হামলার পর ব্রিটেন যুদ্ধে যোগ দেওয়ার আভাস দিলেও দেশের মানুষের মেজাজ বুঝে স্টারমার আর অগ্রসর হননি।
আর মার্কিন প্রেসিডেন্টের এক ঘরে এবং কোণঠাসা হয়ে পড়ার সুযোগটাই নিয়েছে পাকিস্তান। ইরান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকার সুযোগ কাজে লাগাতে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এই তৎপরতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফকে তিনিই পরামর্শ দেন এই ব্যাপারে এগিয়ে যেতে। প্রধানমন্ত্রীর সবুজ সংকেত মিলতেই মুনির নিজেই নেমে পড়েন যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাবে দুপক্ষের সম্মতি আদায়ে। গত রবিবার রাতভর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের কর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে খসড়া শান্তি প্রস্তাব তৈরি করে ফেলেন তিনি। জানা যাচ্ছে শেষ পর্যন্ত সেই প্রস্তাবেই সামান্য অদলবদল করে যুদ্ধ বিরতিতে সায় দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান।
প্রশ্ন হল, দোর্দণ্ডপ্রতাপ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কেন পাকিস্তানকে যুদ্ধ বিরতি নিয়ে তৎপরতা চালিয়ে যেতে সবুজ সংকেত দিলেন? ওয়াকিবহাল মহল এর মতে, পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের সুসম্পর্ক এবং নানা ধরনের অভিন্নতার বিষয়টি ট্রাম্প বিবেচনায় রেখেছিলেন। একইসঙ্গে পাকিস্তানকে এই তৎপরাতে যুক্ত করে তিনি ভারতকেও খানিকটা বার্তা দিতে চেয়েছেন বলে তথ্যবিজ্ঞ মহল মনে করছে। ইরান এবং আমেরিকা ও ইজরায়েলের যুদ্ধ বিরতি নিশ্চিত করে পাকিস্তান এই মুহূর্তে কূটনৈতিক তৎপরতায় অনেকটা এগিয়ে গিয়েছে। আর এখানেই এসেছে ভারতের নীরবতা বা নিষ্ক্রিয়তার প্রশ্নটি।
বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভারতের অবস্থান বুঝতে পেরেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইসলামাবাদকে যুদ্ধবিরতির বিষয়ে কাজ চালিয়ে যেতে উৎসাহ দেন। এই তৎপরতায় ইসলামাবাদকে কিছুটা এগিয়ে যেতে দিয়ে তিনি নয়া দিল্লিকে চাপে রাখার কৌশল নেন।
সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের মতো পাক প্রধানমন্ত্রী শরিফও যুদ্ধ বিরতির জন্য দুপক্ষের সঙ্গে লাগাতার আলোচনা চালিয়ে যান। এই তৎপরতায় একমাত্র প্রতিবন্ধকতা ছিল ইজরায়েল। তারা পাকিস্তানের মধ্যস্থতা মানতে রাজি ছিল না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাদের রাজি করান, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুদ্ধ বিরতি নিশ্চিত হলে ইজরায়েল তা মেনে চলবে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধান যখন যুদ্ধ বিরতি নিয়ে সক্রিয় তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, বিদেশ মন্ত্রী এস জয় শংকর কেন এই সংঘাতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কোনও দৃশ্যমান, নেতৃত্বমূলক উদ্যোগ নিলেন না। বরং তারা হস্তক্ষেপ না করার নীতি বজায় রেখে ভারতের স্বার্থ রক্ষায় সরাসরি দ্বিপাক্ষিক আলোচনাতেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন—এমনটাই সমালোচক ও বিশ্লেষকদের বহুজনের মত।
পাশাপাশি আলোচনা শুরু হয়েছে নানা সমস্যায় জর্জরিত পাকিস্তান কীভাবে ইরানের সঙ্গে আমেরিকা ও ইজরায়েলের সংঘর্ষ বিরতিতে সক্ষম হল। আসলে ইরান হল পাকিস্তানের প্রতিবেশী। পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে প্রায় ৯০০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে ইরানের সঙ্গে। দু দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত। ইরানের পর পাকিস্তান হল শিয়া মুসলমানদের দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র।
ভারত তথা নরেন্দ্র মোদী কেন এই উদ্যোগে শামিল হলেন না? বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে যখন নরেন্দ্র মোদীর ব্যক্তিগত সক্ষ্য হয়েছে তখন ভারতের হাত গুটিয়ে বসে থাকা নিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচনা চলছে। ঘরেও সমালোচনার মুখে পড়েছেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। কংগ্রেসসহ বিরোধীদল গুলির বক্তব্য বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভারতের ঐতিহ্যগত ভূমিকা পালনে মোদী সরকার ব্যর্থ হয়েছে। এই আলোচনা-সমালোচনা আরও তীব্র হয়েছে যুদ্ধ বিরতিতে পাকিস্তান সফল হওয়ায়।
নয়াদিল্লির বিদেশ মন্ত্রকের কোনও কোনও মহল থেকে বলা হচ্ছে ভারত সাধারণত বিদেশি সংঘাতে প্রকাশ্য মধ্যস্থতা এড়িয়ে চলে। কারণ এটি সম্ভাব্য 'হস্তক্ষেপ' হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ভারত বরং পর্দার আড়ালের কূটনীতিকে প্রাধান্য দেয়। যদিও রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে নরেন্দ্র মোদীর তৎপরতার সঙ্গে বিদেশ মন্ত্রকের এই বয়ান মানানসই নয়।
বরং কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে—যে দেশ দুটি এই হামলায় জড়িত। পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখাও জরুরি। ফলে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেওয়া কূটনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ছিল নয়াদিল্লির কাছে। কোনও, কোনও বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, পাকিস্তান যখন এই সুযোগে আমেরিকা ও ইরান দুই বিবাদমান দেশের সঙ্গেই সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার চেষ্টা চালিয়েছে তখন ভারত ব্যস্ত থেকেছে দেশের জ্বালানি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে। এই বিষয়ে নতুন নতুন দেশের সঙ্গে বোঝাপড়া তৈরির প্রচেষ্টা লক্ষণীয়। ট্রাম্পের একতরফা আক্রমণের ঘটনায় মধ্যস্থতার ঝুঁকি নিতে চায়নি নয়া দিল্লি। ভারতের উদ্দেশ্য ছিল ইরানের সঙ্গে সুসম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে হরমুজ প্রণালী দিয়ে ভারতীয় জাহাজগুলি চলাচল নিশ্চিত করা। সেই কাজে নয়া দিল্লি ১০০ শতাংশ সফল হয়েছে।