প্রসঙ্গত, ইরান-আমেরিকা-ইজরায়েলের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর থেকেই নিজেদের অবস্থান স্পষ্টই রেখেছিল ভারত। বরাবর বিদেশ মন্ত্রক জানিয়ে এসেছে, কূটনৈতিক পথে এবং আলোচনা করেই এই সমস্যার সমাধান করায় বিশ্বাসী ভারত।

শান্তির পক্ষে ভারতের সওয়াল (ছবি - দিব্যেন্দু দাস)
শেষ আপডেট: 8 April 2026 14:38
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আমেরিকা, ইরান এবং ইজরায়েলের মধ্যে দুই সপ্তাহের অস্থায়ী সংঘর্ষ বিরতি চুক্তি (Trump Iran ceasefire)-কে স্বাগত জানাল ভারত (US-Iran Ceasefire India Reaction)। বুধবার বিদেশ মন্ত্রকের তরফে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, নয়াদিল্লি বরাবরই যুদ্ধের পরিবর্তে কূটনীতি ও আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানে বিশ্বাসী। তবে এই যুদ্ধবিরতির পাশাপাশিই হরমুজ প্রণালী দিয়ে অবাধে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের অধিকার (Strait of Hormuz freedom of navigation) ফেরানোর দাবি জানিয়েছে সরকার।
বুধবার ৮ এপ্রিল, ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের তরফে একটি বিবৃতি (MEA reaction on US Iran ceasefire) জারি করে বলা হয়, "পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি ফেরানোর লক্ষ্যে এই সংঘর্ষ বিরতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ। আমরা আশা করছি এই আলোচনার পথ ধরে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে।" মন্ত্রক আরও মনে করিয়ে দিয়েছে যে, গত কয়েক সপ্তাহের সংঘর্ষের ফলে সাধারণ মানুষের সীমাহীন কষ্ট হয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যিক ব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তাই 'ডি-এসকেলেশন' বা উত্তেজনা প্রশমনই এই মুহূর্তে একমাত্র কাম্য।
প্রসঙ্গত, ইরান-আমেরিকা-ইজরায়েলের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর থেকেই নিজেদের অবস্থান স্পষ্টই রেখেছিল ভারত। বরাবর বিদেশ মন্ত্রক জানিয়ে এসেছে, কূটনৈতিক পথে এবং আলোচনা করেই এই সমস্যার সমাধান করায় বিশ্বাসী ভারত।
ভারতের মূল উদ্বেগ
ভারতের মূল চিন্তা লুকিয়ে রয়েছে হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিয়ে। বিশ্বের খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই সরু সমুদ্রপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। গত কয়েক দিনের অশান্তিতে এই পথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশছোঁয়া হয়েছিল। এদিন বিদেশ মন্ত্রক কড়া সুরে জানিয়েছে, “আমরা আশা করছি হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্ব বাণিজ্য ও নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা কোনও বাধা ছাড়াই বজায় থাকবে।”
ইসলামাবাদে ঐতিহাসিক বৈঠকের সম্ভাবনা
জানা গেছে, এই ১৪ দিনের বিরতি চলাকালীনই আগামী শুক্রবার পাকিস্তানের ইসলামাবাদে ওয়াশিংটন ও তেহরানের প্রতিনিধিরা মুখোমুখি বসতে পারেন। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেজাজ এখনও যথেষ্ট খামখেয়ালি। তিনি প্রথমে ইরানের ১০ দফার একটি প্রস্তাবকে 'কাজ চালানোর মতো' বললেও পরে তাকেই 'প্রতারণা' বলে তোপ দাগেন। এমনকি যুদ্ধবিরতি ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগেও তিনি চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, "চুক্তি না হলে আজ রাতেই একটি সম্পূর্ণ সভ্যতা শেষ হয়ে যাবে, যা আর কখনও ফিরে আসবে না।" ট্রাম্পের এই চাপ সৃষ্টির কৌশল যে কাজ করেছে, তা অস্থায়ী বিরতি চুক্তি থেকেই স্পষ্ট।
ইজরায়েলের অবস্থান
এই ত্রিদেশীয় চুক্তিতে ইজরায়েল সায় দিলেও তাদের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু একটি 'কিন্তু' রেখেছেন। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে সংঘর্ষ বিরতি মানেই লেবাননে হিজবুল্লার বিরুদ্ধে অভিযান বন্ধ হওয়া নয়। ইজরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (IDF) জানিয়েছে, তারা লেবাননের মাটিতে জঙ্গি গোষ্ঠী হিজবুল্লার বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাবে। অন্যদিকে, আমেরিকা এই আলোচনার সুযোগ নিয়ে ইরানের পরমাণু ভাণ্ডার এবং মিসাইল শক্তি খর্ব করার দাবি তুলবে বলেই ইঙ্গিত মিলেছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও তেলের বাজার
বিশ্বের একাধিক দেশ এই বিরতিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। চিনের বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, তারা পাকিস্তান ও অন্যান্য মধ্যস্থতাকারীদের প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানায়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিদেশ নীতি বিষয়ক প্রধান কাজা কালাস এবং জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিক মেজও একে ধ্বংসের মুখ থেকে ফিরে আসা বলে বর্ণনা করেছেন। একই সুর ওমান, মালয়েশিয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়ার গলাতেও।
এই কূটনৈতিক সাফল্যের প্রভাব পড়েছে সরাসরি বিশ্ববাজারে। যুদ্ধবিরতির খবর চাউর হতেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম এক ধাক্কায় অনেকটাই কমেছে। মার্কিন ক্রুড অয়েল ১৩.৩ শতাংশ কমে ৯৬ ডলার এবং ব্রেন্ট ক্রুড ৯৫ ডলারের নিচে নেমে এসেছে।
তবে স্বস্তির মাঝেই আশঙ্কার চোরাস্রোত বয়ে গিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে। সেখানে হাবশান গ্যাস কমপ্লেক্সে হামলার ধ্বংসাবশেষ পড়ে আগুন লেগে যায়। এই ঘটনায় জখম হয়েছেন দুই আমিরশাহি নাগরিক এবং একজন ভারতীয়। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে— যেখানে কয়েক দিনের শান্তি কি স্থায়ী বন্ধুত্বের সূচনা করবে, নাকি এটা ঝড়ের আগের স্তব্ধতা, সেটাই এখন দেখার।