
রেখা গুপ্তা ও নরেন্দ্র মোদী
শেষ আপডেট: 19 February 2025 23:45
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দিল্লিতে বিধানসভা ভোটের ফল প্রকাশ হয়েছে গত ৮ তারিখ। তার পর মুখ্যমন্ত্রীর নাম ঘোষণা করতে ১১ দিন সময় নিলেন জগৎপ্রকাশ নাড্ডারা। এই বিলম্বতেই বোধগম্য যে মুখ্যমন্ত্রী পদের জন্য কোনও একজনকে বেছে নেওয়া সহজ কাজ ছিল না। বরং বড়ই কঠিন ছিল তা।
প্রশ্ন হল, কে এই রেখা গুপ্তা (Who is Rekha Gupta)? কেনই বা তাঁকে মুখ্যমন্ত্রী পদের জন্য বেছে নেওয়া হল? আর এই বেছে নেওয়াটা সহজ ছিল না কেন?
আসলে দিল্লিতে বিজেপির ওজনদার নেতার অভাব বরাবরের। এটা ঠিক, বিজেপির সব ওজনদার নেতাদেরই বাস নয়াদিল্লিতে। কিন্তু তাঁরা কেউ দিল্লির স্থানীয় রাজনীতি করেননি। তাঁরা সকলেই জাতীয় রাজনীতির চরিত্র। তা সে একদা অটল বিহারী বাজপেয়ী-লালকৃষ্ণ আডবাণী হোক অমিত শাহ-রাজনাথ সিং। একদা এই কারণেই বাধ্য হয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা থেকে সুষমা স্বরাজকে ইস্তফা দিইয়ে দিল্লিতে মুখ্যমন্ত্রী করেছিলেন বাজপেয়ী-আডবাণী। কারণ, সেদিনও দিল্লির তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সাহেব সিং ভার্মা গোটা দিল্লিতে গ্রহণযোগ্য মুখ ছিলেন না। বস্তুত গোটা দিল্লিতে গ্রহণযোগ্য বা রাজ্য সংগঠনের মধ্যে একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে এমন নেতাও ছিলেন না। তাই সুষমা স্বরাজকে বেছে নিতে বাধ্য হয়েছিল বিজেপি। অথচ সুষমা দিল্লির নেত্রী ছিলেন না। তাঁর জন্ম হরিয়ানায়, রাজনীতিতেও হাতেখড়ি সেখানেই। হরিয়ানা বিধানসভার দুই মেয়াদের বিধায়কও ছিলেন তিনি।
দিল্লিতে নেতৃত্বের এই আকালের কারণেই এক সময়ে মনোজ তিওয়ারিকে দিল্লির সংগঠনের সভাপতি করা হয়েছিল। যাতে ভোজপুরী নায়ক মনোজ দিল্লিতে ক্রমশ পরিচিত হয়ে উঠতে পারেন। এবং দিল্লিতে বসবাসকারী বিপুল সংখ্যক বিহারী জনগোষ্ঠীর ভোট অন্তত নিশ্চিত করতে পারেন। কিন্তু মনোজও ডাহা ফেল করেন।
দিল্লিতে বিজেপির মুখের যে বড় আকাল, তা আরও স্পষ্ট করে বোঝা যাবে ২০১৫ সালের ছবিটার দিকে ফিরে তাকালে। সেই ভোটে সদ্য রাজনীতিতে আসা কিরণ বেদীকে মুখ্যমন্ত্রী পদে প্রোজেক্ট করে ভোটে লড়েছিলেন অমিত শাহ।
দিল্লির বিজেপি সেই সমস্যা থেকে এখনও মুক্ত নয়। সেটাই বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতাদের কাজটা কঠিন করে তুলেছিল। নয়াদিল্লি বিধানসভা আসনে অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে পরাস্ত করেছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সাহেব সিং ভার্মার ছেলে প্রবেশ ভার্মা। কিন্তু প্রবেশ গোটা দিল্লিতে গ্রহণযোগ্য নেতা নন। মাঝে সুষমা স্বরাজের মেয়ে বাঁসুরি স্বরাজের নামও আলোচনায় ছিল। কিন্তু নয়াদিল্লি লোকসভা আসন থেকে সাংসদ হলেও রাজনীতিতে বাঁসুরি নবীন। তিনি চৌখস বক্তা ঠিকই, কিন্তু রাজনীতির কঠিন মারপ্যাঁচ এখনও রপ্ত করতে পারেননি বলে অনেকের ধারণা।
ঠিক এমন একটা পরিস্থিতিতে তুলনায় অনেকটা উজ্জ্বল দেখায় শালিমার বাগের বিধায়ক রেখা গুপ্তকে। বাঁসুরি স্বরাজ বা প্রবেশ ভার্মার মতো রেখা উত্তরাধিকার সূত্রে রাজনীতিতে আসেননি। তিনি সেল্ফ মেড। ছাত্র জীবনে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের সদস্য ছিলেন। অর্থাৎ পাঠশালা থেকে উঠে এসেছেন। পরে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (DUSU) সভানেত্রী ও সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন। এ ছাড়া, তিনি বিজেপির মহিলা মোর্চার সাধারণ সম্পাদক এবং দলের জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
১৯৯২ সালে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের দৌলত রাম কলেজে পড়াকালীন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (ABVP)-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে রাজনৈতিক জীবনের সূচনা করেন রেখা। ১৯৯৬-৯৭ সালে তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (DUSU) সভানেত্রী নির্বাচিত হন। পরে ২০০৭ সালে উত্তর পিতমপুরা থেকে পুরসভার কাউন্সিলর নির্বাচিত হন রেখা। ২০১২ সালে ফের কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার পর দক্ষিণ দিল্লি পৌর নিগমের (SDMC) মেয়র হন তিনি।
অর্থাৎ রেখার শুধু সাংগঠনিক প্রশিক্ষণ নেই তাঁর প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাও রয়েছে। এটাই সবার থেকে বেশি নম্বর পাইয়ে দেয় রেখাকে। সঙ্ঘ পরিবারও সেই কারণে তাঁর নামই প্রস্তাব করে। তা ছাড়া দিল্লিতে ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের বিপুল জনভিত্তি রয়েছে। এই বানিয়া তথা বেনেরা বরাবরই সরকারের তাঁদের প্রতিনিধিত্ব আশা করে। রেখাকে মুখ্যমন্ত্রী পদে বাছাই করে সেই রাজনীতিতেও শান দিল বিজেপি।
অনেকে আবার দাবি করছেন, দিল্লিতে বিজেপি মহিলা মুখই খুঁজছিল, সেই কারণেই রেখাকে বেছে নেওয়া হয়েছে। তবে দীনদয়াল উপাধ্যায় মার্গের এক প্রবীণ নেতার কথায়, একজন মহিলাকে মুখ্যমন্ত্রী করে সামগ্রিক ভাবে মহিলাদের বার্তা দেওয়ার কাজটা বিজেপি করবে ঠিকই। কিন্তু রেখাকে বেছে নেওয়া এটাই একমাত্র কারণ নয়। আসল কারণ, দিল্লিতে আর কোনও মুখ পাওয়া যায়নি যাঁর গোটা দিল্লিতে গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। এমন কোনও নেতা থাকলে রেখাকে বেছে নেওয়া যেত না। তবে হ্যাঁ বর্তমানে যেহেতু বিজেপি শাসিত কোনও রাজ্যে মহিলা মুখ্যমন্ত্রী নেই। তাই দিল্লিতে রেখাকে বেছে নেওয়ায় সেই শূন্যস্থান পূরণ হল।