মুম্বই হামলা কিংবা পহলগামে জঙ্গি হানার মতো অনপড়-গাঁওয়ার, না খেতে পাওয়া জঙ্গি নয়, শিক্ষিত-ভদ্রসমাজের সঙ্গে মিশে থাকা মৌলবাদীরাই চোরা হামলায় নেমেছে।

চেনাজানা জঙ্গির থেকেও শনাক্ত করার কাজে আরও কঠিন হয়ে গিয়েছে।
শেষ আপডেট: 11 November 2025 15:53
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দিল্লির লালকেল্লার সামনে বিস্ফোরণে ভারতে জঙ্গিপনার নতুন মুখোশ খসে পড়েছে, আর তা হল- মেধাজীবী-মৌলবাদ। মুম্বই হামলা কিংবা পহলগামে জঙ্গি হানার মতো অনপড়-গাঁওয়ার, না খেতে পাওয়া জঙ্গি নয়, শিক্ষিত-ভদ্রসমাজের সঙ্গে মিশে থাকা মৌলবাদীরাই চোরা হামলায় নেমেছে। যা চেনাজানা জঙ্গির থেকেও শনাক্ত করার কাজে আরও কঠিন হয়ে গিয়েছে। তার প্রথম ও প্রধান কারণ হল- এরা সীমান্ত পেরিয়ে আসা সরাসরি পাকিস্তানি নয়। এদেশেরই নাগরিক এবং এদেশেই নিজস্ব তালিমপ্রাপ্ত, সর্বোপরি কট্টর ধর্মীয় মৌলবাদী।
দিল্লির বিস্ফোরণের পর দেশের সবকটি তদন্ত ও গোয়েন্দা সংস্থা একযোগে এই ঘটনার শিকড় খোঁজার কাজে নেমে পড়েও এই কারণে অথই জলে পড়ে গিয়েছে। এখনও পর্যন্ত কোনও জঙ্গি গোষ্ঠী এই বিস্ফোরণের দায় স্বীকার করেনি। যা সাধারণত তারা করে থাকে। তাহলে প্রশ্ন উঠেছে, এই কাজ কারা করল? একারণেই ভারত সরকারও এখনও সোজাসুজি পাকিস্তানের দিকে আঙুল তোলেনি। তদন্তে যা উঠে এসেছে, তাতে জঙ্গিপনার একটিই ছবি ফুটে উঠেছে, তা হল শিক্ষিত মেধাজীবী-মৌলবাদ দেশে সন্ত্রাসবাদের মানচিত্র ও প্রকৃতিই বদলে দিতে চলেছে।
এ পর্যন্ত যাঁরা ধরা পড়েছেন তাঁদের তিনজনই কাশ্মীরি ডাক্তার। সন্দেহ, তাঁরা এই চক্রান্তের সঙ্গে যুক্ত। একজন আবার মহিলা। ফলে দেশের সন্ত্রাসবাদের যে চক্র রয়েছে তা আমূল বদলে গিয়েছে। তদন্ত আধিকারিকরা বলছেন, এই ঘটনায় চিরাচরিত জঙ্গিপনা থেকে পুরোপুরি সরে এসে সন্ত্রাসবাদের আরও ভয়ঙ্কর কপট মুখ বেরিয়ে পড়েছে। যেখানে শিক্ষিত পেশাদার লোকজন পাকিস্তানের মদতপুষ্ট নেটওয়ার্কের মধ্যে চলে এসে অত্যন্ত গোপনে দেশের বিভিন্ন শহরে সক্রিয় হয়ে উঠতে চলেছে।
জম্মু-কাশ্মীর থেকে সন্ত্রাসবাদী কাজকর্ম একেবারে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর আইএসআই ১৯৯০-২০০০ সালের ধাঁচে ভারতের বিভিন্ন শহরে ধারাবাহিক বিস্ফোরণের ছক কষছে কিনা এই সন্দেহও তীব্র হচ্ছে। শ্রীনগরে পাকিস্তানি জঙ্গি সংগঠন জয়েশ-ই-মহম্মদের একটি পোস্টারকে ঘিরে শুরু হওয়া তদন্ত এসে ঠেকে উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা এবং দিল্লিতে। যাঁদের গ্রেফতার করা হয়েছে, তাঁরা সকলেই সাদা চোখে ডাক্তার। কিন্তু, তাঁদের হেফাজত থেকে উদ্ধার হয়েছে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক এবং অস্ত্রশস্ত্র।
জম্মু-কাশ্মীরে গোঁত্তা খেয়ে পাকিস্তানি চর সংস্থা এখন দেশের ভিতরে শিক্ষিত মৌলবাদীদের মগজ ধোলাই দিচ্ছে এবং নিয়োগ করছে। পদস্থ এক সন্ত্রাসদমন আধিকারিক বলেন, এটা নতুন ধরনের বিপদ। শিক্ষিত, পেশাদারদের কট্টর মৌলবাদী মন্ত্র কানে গুঁজে দিয়ে এই কাজ চলছে। এতে এদের শিক্ষা, মেধার ফলে বিস্ফোরক তৈরি কলাকৌশল দ্রুত অভ্যাস করানো যাচ্ছে। আজমল কাসবদের মতো এদের সাবেকি ধাঁচের জঙ্গিও বলা যায় না। এরা জঙ্গির পোশাকে নয়, ল্যাবে কাজ করার জামা পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে ও আমাদের সকলের চোখে ধুলো ছেটাচ্ছে। এদের বাইরে থেকে চেনার কোনও উপায় নেই।
তিনি আরও বলেন, পাহাড়ি-জঙ্গল, উপত্যকা ছেড়ে জঙ্গিপনা এখন মনে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এটা অত্যন্ত সন্তর্পণে, হিসাব কষে এগোচ্ছে, যা আগের রীতির থেকেও ভয়ঙ্কর। পুলিশও জানিয়েছে, জয়েশ এবং আনসার ঘাজওয়াতুল-হিন্দ শিক্ষিত-চাকুরিজীবী সমাজের মধ্যে কট্টরপন্থার বিষ ঢোকাচ্ছে। গোপন চ্যানেল তৈরি করে কিংবা দাতব্য সংস্থার নামে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগসূত্রে অর্থ পাঠানো হচ্ছে।
ধৃত ডাক্তারদের একজন মুজাম্মেল শাকিল, বয়স ৩৫ বছর। জম্মু-কাশ্মীরের পুলওয়ামার ছেলে শাকিল হরিয়ানার ফরিদাবাদের ধৌজে ফালাহ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। পোস্টার কাণ্ডে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। তারপরই একে একে বিপুল পরিমাণের বিস্ফোরক ও অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে, হরিয়ানার এই বেসরকারি আল ফালাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারেই কী আরডিএক্স তৈরির কারখানা গড়ে ফেলা হচ্ছিল? পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই থাকা এক মসজিদের এক মৌলবীকেও এ ব্যাপারে গ্রেফতার করেছে। ফলে তদন্ত ও গোয়েন্দা এজেন্সিগুলি একমত যে, পাকিস্তান এখন চিরাচরিত জঙ্গিপনা ছেড়ে আরও আধুনিক রূপে এবং খোলসের আড়ালে হামলার চক্রান্ত কষেছে। আর সেই লক্ষ্যপূরণেই এই মেধাজীবী-মৌলবাদের আশ্রয় নিচ্ছে জঙ্গি সংগঠনগুলি।