‘আমরা ভারতীয়’, এই কথাটুকুই ছিল শেষ। বর্ণবিদ্বেষের শিকার হয়ে দেরাদুনে মৃত্যু ত্রিপুরার যুবকের।

অ্যাঞ্জেল চাকমা
শেষ আপডেট: 28 December 2025 15:01
দ্য ওয়াল ব্যুরো: উত্তরাখণ্ডের দেরাদুনে (Dehradun) বর্ণবিদ্বেষমূলক হামলায় ছুরিকাহত হয়ে মৃত্যু হল ত্রিপুরার (Tripura) ২৪ বছরের এমবিএ পড়ুয়া অ্যাঞ্জেল চাকমার (Anjel Chakma)। টানা ১৪ দিনের বেশি মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই চালিয়ে শুক্রবার হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
ঘটনাটি ঘটে গত ৯ ডিসেম্বর। দেরাদুনের সেলাকুই (Selaqui) এলাকায় স্থানীয় বাজারে গিয়েছিলেন অ্যাঞ্জেল ও তাঁর ছোট ভাই মাইকেল চাকমা (Michael Chakma)। অভিযোগ, সেখানেই একদল যুবক তাঁদের পথ আটকে বর্ণবিদ্বেষমূলক কটূক্তি ছোড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, অভিযুক্তরা দুই ভাইকে ‘চাইনিজ’ বলে গালিগালাজ করতে থাকে।
এই দুই যুবকের বন্ধুরা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন অ্যাঞ্জেল। অত্যন্ত শান্তভাবে তিনি বলেছিলেন, “আমরা চাইনিজ নই, আমরা ভারতীয়। সেটা প্রমাণ করতে কী সার্টিফিকেট দেখাতে হবে?” কিন্তু সেই কথার পরই পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নেয়। অভিযোগ, গালিগালাজ চালিয়েই অভিযুক্তরা ছুরি বের করে দুই ভাইয়ের উপর হামলা চালায়।
হামলায় অ্যাঞ্জেলের ঘাড় ও মেরুদণ্ডে গুরুতর আঘাত লাগে। মাইকেলও গুরুতর জখম হন এবং এখনও তাঁর অবস্থা আশঙ্কাজনক। হাসপাতালে টানা দু’সপ্তাহের বেশি চিকিৎসা চললেও শেষরক্ষা হয়নি। মৃত্যু হয় অ্যাঞ্জেলের। তাঁর এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু জানান, “ও খুব শান্ত, বন্ধুবৎসল ছেলে ছিল। এমন হিংসা কেউ বিশ্বাসই করতে পারছে না।”
শনিবার অ্যাঞ্জেলের দেহ আনা হয় আগরতলায় (Agartala)। তাঁর মৃত্যু ঘিরে ত্রিপুরা এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে শোক ও ক্ষোভ ছড়িয়েছে। তিপ্রা মথা পার্টির (Tipra Motha Party) চেয়ারম্যান প্রদ্যোত বিক্রম মানিক্য দেববর্মা (Pradyot Bikram Manikya Debbarma) পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে চিকিৎসা ও শেষকৃত্যে সাহায্য করেন। বলেন, 'উত্তর-পূর্ব ভারতের মানুষদের লক্ষ্য করে এই ধরনের বর্ণবিদ্বেষমূলক হামলা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। এই হামলা আমাদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করছে। আমরা বিচার চাই,' স্পষ্ট বার্তা দেন তিনি।
এই ঘটনায় কড়া প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামি (Pushkar Singh Dhami)। তিনি জানান, রাজ্যে এই ধরনের ঘটনা কোনওভাবেই বরদাস্ত করা হবে না এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এখনও পর্যন্ত পাঁচজন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাঁদের মধ্যে দু’জন নাবালক, যাদের পাঠানো হয়েছে জুভেনাইল রিফর্ম হোমে (Juvenile Reform Home)।
পুলিশ সূত্রে খবর, মোট ছ’জন অভিযুক্তের মধ্যে একজন এখনও পলাতক। মূল অভিযুক্ত যজ্ঞ আওয়াস্থি (Yagya Awasthi) নেপালে (Nepal) পালিয়ে গিয়েছে বলে অনুমান। তার খোঁজে নেপালে পুলিশ দল পাঠানো হয়েছে এবং তার মাথার দাম ঘোষণা করা হয়েছে ২৫ হাজার টাকা। মাইকেল চাকমার অভিযোগের ভিত্তিতে ১২ ডিসেম্বর মামলা রুজু হয় এবং ১৪ ডিসেম্বর পাঁচ অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়। অ্যাঞ্জেলের মৃত্যুর পর মামলায় খুনের ধারা যোগ করা হয়েছে।
এই ঘটনার পর উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন দেশজুড়ে বর্ণবিদ্বেষমূলক অপরাধের বিরুদ্ধে আলাদা আইন আনার দাবিতে আন্দোলনে নেমেছে। দেরাদুনের ছাত্র সংগঠনগুলিও পথে নেমে দেশের সব প্রান্তের ছাত্রদের নিরাপত্তা ও মর্যাদার দাবি তুলেছে। অ্যাঞ্জেলের মৃত্যু যেন ফের একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, বর্ণবিদ্বেষ এখনও কতটা গভীরে গেঁথে আছে সমাজে।