সরকারের দাবি, ‘বিকশিত ভারত ২০৪৭’-এর লক্ষ্যে পৌঁছতে গ্রামীণ কর্মসংস্থানের কাঠামো বদলানো জরুরি। কিন্তু বিরোধীদের অভিযোগ, এই বিল আসলে গরিব মানুষের কাজের অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা।

শেষ আপডেট: 18 December 2025 16:03
দ্য ওয়াল ব্যুরো: গ্রামের মানুষের কাছে গত কুড়ি বছর ধরে একশ দিনের কাজ প্রকল্প (MGNREGA) শুধু রোজগারের নিশ্চয়তা ছিল না, তা ছিল কাজের আইনি অধিকার। সরকারের কাছে কাজ চাইলে, বছরে ১০০ দিন কাজ দিতেই হবে। মজুরির টাকাও দিতে হবে সময়ের মধ্যে। এবার সেই আইন বাতিল করে নতুন ব্যবস্থা আনতে চলেছে নরেন্দ্র মোদী সরকার। এ জন্য সংসদে বিল পেশ হয়েছে। সেই বিলের নাম নাম—বিকশিত ভারত গ্যারান্টি ফর রোজগার অ্যান্ড আজীবিকা মিশন (গ্রামীণ) বিল, সংক্ষেপে ভিবি জি রাম জি বিল ( VB G RAM G bill)। সরকারের দাবি, ‘বিকশিত ভারত ২০৪৭’-এর লক্ষ্যে পৌঁছতে গ্রামীণ কর্মসংস্থানের কাঠামো বদলানো জরুরি। কিন্তু বিরোধীদের অভিযোগ, এই বিল আসলে গরিব মানুষের কাজের অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা।
MGNREGA কী এবং কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ
২০০৫ সালে চালু হওয়া MGNREGA আইন অনুযায়ী, গ্রামীণ এলাকার যে কোনও প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের বছরে অন্তত ১০০ দিন কাজ পাওয়ার অধিকার রয়েছে। এ জন্য দক্ষ শ্রমিকের দরকার নেই, অদক্ষ শ্রমিক হলেই হবে। সরকার কাজ দিতে ব্যর্থ হলে বেকার ভাতা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
গত কুড়ি বছর ধরে খরা, বন্যা, ফসল নষ্ট বা কৃষিকাজের মন্দা মরশুমে এই প্রকল্প লক্ষ লক্ষ পরিবারের আয়ের একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছে। করোনা অতিমারির সময়ে গ্রামীণ অর্থনীতিকে ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করেছিল এই প্রকল্পই। তবে এও ঠিক, ২০০৫ সালে এই প্রকল্প শুরু হওয়ার পর থেকেই রাজনীতিক ও অর্থনীতিকদের অনেকে একে খয়রাতি প্রকল্প বলেও দাগিয়ে দিয়েছিলেন। এমনকি সেই সময়ে সরকারে থেকেও শরদ পাওয়ার পর্যন্ত বলেছিলেন, এই প্রকল্প কৃষির ক্ষতি করে দেবে। গ্রামে ক্ষেত মজুর পাওয়া যাবে না। সেই সঙ্গে এই প্রশ্নও উঠেছিল, এত টাকা খরচ করে কোনও স্থায়ী সম্পদ তৈরি হচ্ছে না। অদক্ষ শ্রমিকরা মাটি কেটে রাস্তা বানাচ্ছেন। সেই রাস্তা বৃষ্টির জলে ধুয়ে যাচ্ছে। পরের বছর ফের মাটি কাটছেন।
কেন নতুন বিল আনছে সরকার (Why G RAM G)
কেন্দ্রের বক্তব্য, গ্রামীণ ভারতের বাস্তবতা বদলেছে। ডিজিটাল পরিকাঠামো, ব্যাঙ্কিং পরিষেবা, রাস্তা ও সংযোগ ব্যবস্থা উন্নত হয়েছে। তাই শুধু মজুরিভিত্তিক কাজ নয়, গ্রামীণ কর্মসংস্থানকে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন, পরিকাঠামো এবং জীবিকার সঙ্গে যুক্ত করাই নতুন আইনের উদ্দেশ্য।
VB-G RAM G বিলে কী কী পরিবর্তন আসছে ( MGNREGA VS G RAM G)
নতুন বিলে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বদলের প্রস্তাব রয়েছে—
কাজের দিন বাড়ছে: ১০০ দিনের বদলে বছরে ১২৫ দিনের কাজের নিশ্চয়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
চাষের মরশুমে কাজ বন্ধ: বীজ বোনা ও ফসল কাটার সময় বছরে সর্বাধিক ৬০ দিন গ্রামীণ কর্মসংস্থানের কাজ বন্ধ রাখা যাবে।
কেন্দ্র ও রাজ্যের খরচ ভাগাভাগি: MGNREGA-তে অদক্ষ শ্রমের মজুরি পুরোপুরি দিত কেন্দ্র। নতুন বিলে অধিকাংশ রাজ্যের ক্ষেত্রে খরচের প্রায় ৪০ শতাংশ বহন করতে হবে রাজ্য সরকারকে। পাহাড়ি ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলির ক্ষেত্রে এই হার কম।
মজুরি দ্রুত পাওয়ার প্রতিশ্রুতি: কাজ শেষ হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে, সর্বাধিক দুই সপ্তাহের মধ্যে মজুরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পৌঁছনোর কথা বলা হয়েছে G RAM G -তে। দুর্বল শ্রেণির জন্য বিশেষ ব্যবস্থা: মহিলা, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ও গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য উপযুক্ত কাজ ও আলাদা মজুরি হারের প্রস্তাব রাখা হয়েছে নয়া বিলে।
কোন ধরনের কাজে জোর
নতুন আইনে চারটি ক্ষেত্রে কাজকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে—
জল সংরক্ষণ ও জল সুরক্ষা। গ্রামীণ পরিকাঠামো যেমন রাস্তা ও গুদাম নির্মাণ। জীবিকা-সংক্রান্ত পরিকাঠামো গড়ে তোলা। এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দীর্ঘস্থায়ী প্রকল্প নির্মাণ। সরকারের দাবি, এতে গ্রামে স্থায়ী সম্পদ তৈরি হবে এবং ভবিষ্যতে আয় বাড়বে।
তবে বর্তমান আইনের মতোই নতুন বিলে বলা হয়েছে, কাজ না দিলে বেকার ভাতা দেওয়ার বিধান থাকবে এবং কাজের আবেদন করলে সরকারকে কাজ দিতেই হবে।
রাহুল গান্ধীর তীব্র আপত্তি
নতুন বিল নিয়ে সবচেয়ে কড়া সমালোচনা করেছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। তাঁর অভিযোগ, এই বিল মহাত্মা গান্ধীর আদর্শের উপর সরাসরি আঘাত। রাহুল গান্ধীর বক্তব্য, MGNREGA ছিল মহাত্মা গান্ধীর গ্রাম স্বরাজ ভাবনার বাস্তব রূপ। এটি ছিল গরিব মানুষের কাজের অধিকার এবং আত্মসম্মানের প্রতীক। তাঁর দাবি, কেন্দ্রীয় সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে গান্ধীর নাম মুছে ফেলতে চাইছে এবং একই সঙ্গে গরিব মানুষের অধিকার দুর্বল করছে।
রাহুল গান্ধী আরও বলেন, নতুন বিলে ক্ষমতা পুরোপুরি কেন্দ্রের হাতে কেন্দ্রীভূত করা হচ্ছে। বাজেট, কাজের পরিমাণ ও নিয়ম সব কিছুই কেন্দ্র ঠিক করবে। রাজ্যগুলিকে খরচের বড় অংশ বহন করতে বাধ্য করা হবে। বাজেট শেষ হয়ে গেলে বা চাষের মরশুমে দু’মাস কাজ বন্ধ থাকলে গ্রামীণ মানুষ কাজ পাবেন না। তিনি অভিযোগ করেন, গত ১০ বছর ধরে কেন্দ্র MGNREGA দুর্বল করার চেষ্টা করেছে, আর এখন সম্পূর্ণভাবে সেই আইন মুছে ফেলতে চাইছে সরকার। কংগ্রেস এই বিলের বিরুদ্ধে সংসদে এবং রাস্তায় লড়াই চালাবে বলেও তিনি স্পষ্ট করেন।
G RAM নিয়ে বিতর্ক আর কোথায় (G RAM G Controversy)
শ্রমিক সংগঠন ও বিরোধীদের মতে, MGNREGA ছিল চাহিদানির্ভর ও অধিকারভিত্তিক আইন। নতুন বিলে নির্দিষ্ট বরাদ্দের সীমা বেঁধে দেওয়ায় প্রকল্পটি বাজেটনির্ভর হয়ে যাবে। বরাদ্দ শেষ হলে কাজ পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকবে না—এই আশঙ্কাই সবচেয়ে বড়। একই সঙ্গে রাজ্যগুলির উপর বাড়তি আর্থিক চাপ পড়বে বলেও প্রশ্ন উঠছে। ইতিমধ্যেই তামিলনাড়ু ও কেরল-সহ কয়েকটি রাজ্য বিলটির বিরোধিতা করেছে।
VB-G RAM G বিল সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে পেশ হয়েছে। লোকসভায় বিলটি পাশ হয়েছে। রাজ্যসভাতেও পাশ হলে, আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল হবে MGNREGA। এই পরিবর্তন গ্রামীণ ভারতের ভবিষ্যৎকে সত্যিই আরও ‘বিকশিত’ করবে, না কি গরিব মানুষের কাজের নিরাপত্তা কমাবে—সেই প্রশ্নই এখন জাতীয় রাজনীতির বড় বিতর্ক।