আরবান চ্যালেঞ্জ ফান্ডের সঙ্গে পূর্ববর্তী প্রকল্পগুলির গুরুত্বপূর্ণ কিছু পার্থক্য রয়েছে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রকল্পের ২৫ শতাংশ কেন্দ্রীয় সহায়তা থেকে পাওয়া যাবে। শহরগুলিকে বাজার থেকে কমপক্ষে ৫০ শতাংশ অর্থ সংগ্রহ করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে পুর বন্ড, ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ অথবা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব। বাকি অর্থ আসবে রাজ্য, পুরসভা অথবা আর্থিক সংস্থা থেকে।

শেষ আপডেট: 28 February 2026 00:16
ভারতের নগরায়ন বা শহর অঞ্চলের উন্নয়নের উদ্যোগ এক নির্ণায়ক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। এ দেশের শহরগুলি থেকে মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের সিংহভাগ পাওয়া যায়। প্রাণবন্ত অর্থনৈতিক ক্লাস্টারের মধ্যে বেশিরভাগ শহরের অবস্থান। নগরায়ন দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নকে নির্ধারণ করে। কিন্তু, এই শহরগুলি পরিকাঠামো ক্ষেত্রের বিভিন্ন ঘাটতির যেমন সম্মুখীন, পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উদ্ভূত সমস্যার প্রভাব থেকেও মুক্ত নয়। শহরগুলির আর্থিক সঙ্কট এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন সমস্যাও রয়েছে। ভারত কিভাবে নগরায়নের পথে এগোবে সেটি বড় সমস্যা নয়। সমস্যা হল এই নগরায়ন কি যথাযথভাবে হচ্ছে? সুস্থায়ী উৎপাদনশীল এবং সর্বাঙ্গীণ এক উদ্যোগের মাধ্যমেই এটি সম্ভব হবে।
সম্প্রতি আরবান চ্যালেঞ্জ ফান্ডের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। এক্ষেত্রে ভারত বিভিন্ন সমস্যার কীভাবে সমাধান করবে সেই বিষয়টিকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ২০২৫-২৬ থেকে ২০৩০-৩১ অর্থবর্ষ পর্যন্ত এই তহবিলে ১ লক্ষ কোটি টাকার কেন্দ্রীয় সহায়তার সংস্থান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি, এই প্রকল্পে মোট বিনিয়োগ প্রায় ৪ লক্ষ কোটি টাকা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অনুদান-ভিত্তিক চিরায়ত অর্থায়নের পরিবর্তে বাজারের সঙ্গে যুক্ত সংস্কারমুখী ও ফলাফল-নির্ভর নগর পরিকাঠামো গড়ে তোলার দিকে এগিয়ে যাওয়া হবে।
আরবান চ্যালেঞ্জ ফান্ডের সঙ্গে পূর্ববর্তী প্রকল্পগুলির গুরুত্বপূর্ণ কিছু পার্থক্য রয়েছে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রকল্পের ২৫ শতাংশ কেন্দ্রীয় সহায়তা থেকে পাওয়া যাবে। শহরগুলিকে বাজার থেকে কমপক্ষে ৫০ শতাংশ অর্থ সংগ্রহ করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে পুর বন্ড, ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ অথবা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব। বাকি অর্থ আসবে রাজ্য, পুরসভা অথবা আর্থিক সংস্থা থেকে।
এর ফলে, বিভিন্ন প্রকল্পে আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় থাকবে। এর থেকে একটি বার্তা স্পষ্ট, তা হল শহরাঞ্চলের পরিকাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র সরকারি বাজেটের ওপরই আর নির্ভর করে থাকা হবে না। বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে, উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকাঠামো নির্মাণে অর্থব্যয় যথাযথভাবে করতে হবে।
ভারতের শহরাঞ্চলে কোন কোন বিষয়ের ওপর অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, সেই ভাবনারও পরিবর্তন করা হচ্ছে। প্রথমত শহরগুলিকে উন্নয়নের কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হবে। অর্থাৎ, শহরাঞ্চল আর্থিক চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে। এক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা, অর্থনৈতিক করিডর সহ বিভিন্ন পরিকাঠামো নির্মাণ এবং শিল্প, পর্যটন এবং পণ্য পরিবহণের ক্লাস্টার গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর মূল লক্ষ্য হল, নিছক সম্পদ গড়ে তোলাই নয়, বরং প্রতিযোগিতামূলক উৎপাদনশীল এক ব্যবস্থাপনার প্রসার ঘটানো।
দ্বিতীয় বিষয়টি হল শহরগুলির সৃজনশীল পুনরুন্নয়ন। ভারতের শহরগুলির দীর্ঘদিনের সমস্যা রয়েছে। ঘিঞ্জি অঞ্চল এবং কেন্দ্রীয় বাণিজ্যিক এলাকাগুলিতে স্থানের অপ্রতুলতা আছে। এক্ষেত্রে এই সমস্যার সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের পুনরুন্নয়ন, সরকারি জমির পুনর্ব্যবহার এবং শহরাঞ্চলে বিভিন্ন অব্যবহৃত সম্পদের ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শহরগুলি অব্যবহৃত সম্পদকে ব্যবহার করার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যগত উপাদানগুলি সংরক্ষণের ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।
তৃতীয় বিষয়টি হল জল ও পয়ঃনিকাশি ব্যবস্থাপনা। এক্ষেত্রে পরিষেবা যাতে সকলের কাছে পৌঁছয় সেটি নিশ্চিত করার পাশাপাশি বর্জ্য জলের পুনর্ব্যবহার, বন্যার ঝুঁকি হ্রাস করা এবং শহরাঞ্চলের জঞ্জাল জমা রাখার জায়গাগুলির পুনর্ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে পরিবেশগত সমস্যা শহরগুলিকে নতুন নতুন যে ঝুঁকির সম্মুখীন করছে তার সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
আরবান চ্যালেঞ্জ ফান্ডের একটি উদ্ভাবনমূলক উদ্যোগ হল ৫ হাজার কোটি টাকার ক্রেডিট রিপেমেন্ট গ্যারান্টি স্কিম। এই প্রথমবার ১ লক্ষেরও কম বসবাসকারী ছোট ছোট শহরগুলি এবং পার্বত্য ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের শহরগুলি বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করার সুযোগ পাবে। এই উদ্যোগে কেন্দ্রীয় সরকারের গ্যারান্টি সংশ্লিষ্ট শহরগুলির জন্য থাকবে। প্রাথমিকভাবে ঋণ বাবদ অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রে ঋণদাতার আস্থা অর্জনের জন্য প্রকল্পের বিভিন্ন বিধি-নিষেধ শিথিল করা হবে। এর ফলে, পুরসভাগুলি বাজার থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করতে পারবে, তাদের সরকারি অর্থের ওপর নির্ভর করতে হবে না।
আরবান চ্যালেঞ্জ ফান্ডের আওতায় প্রশাসনিক, আর্থিক ও পরিকল্পনা সংক্রান্ত সংস্কারের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সহায়তা অব্যাহত থাকবে। শহরগুলির সম্পদ সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করা হবে। পাশাপাশি, বিভিন্ন পরিষেবা প্রদানের ক্ষেত্রে ডিজিটাল পদ্ধতির সহায়তা নেওয়া হবে। এক্ষেত্রে অর্থায়নের সঙ্গে প্রকল্পের প্রভাবের বিষয়টিও যুক্ত থাকবে। এর মধ্য দিয়ে পরিকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারিত্ব শক্তিশালী হবে। ফলস্বরূপ, দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণ অথবা যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাবের মতো সমস্যাগুলি দূর হবে।
এই তহবিল শহরের উন্নয়নে বেসরকারি অংশীদারিত্বের ভূমিকাটিকে নিশ্চিত করেছে। বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করার মধ্য দিয়ে বিভিন্ন প্রকল্পের পরিকল্পনা, অর্থায়ন এবং পরিচালনার ক্ষেত্রে বেসরকারি অংশীদারিত্বের সম্ভাবনা আরও বৃদ্ধি পাবে। বিভিন্ন প্রকল্পের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের সময় ডিজিটাল পদ্ধতিতে নজরদারি চালানোর ফলে প্রকল্পের গ্রহণযোগ্যতা আরও শক্তিশালী হবে।
আবাসন ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রক একটি বৃহৎ ব্যবস্থাপনার মধ্যে এই তহবিলের ব্যবস্থা করছে। সংশ্লিষ্ট তহবিলে রাজ্য, পুরসভা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলিও প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে যুক্ত হবে। জাতীয়, রাজ্য এবং স্থানীয় স্তরে দক্ষতা বিকাশের সংস্থান থাকায় প্রযুক্তিগত এবং পরিচালনগত উদ্যোগের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থায়ন হবে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে নজরদারির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলির স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে।
আগামী দশকে ভারতের শহরাঞ্চলের জনসংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাবে। ফলস্বরূপ, বিভিন্ন পরিকাঠামোর চাহিদাও বাড়বে। আরবান চ্যালেঞ্জ ফান্ড এক দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের অঙ্গ, যেখানে আর্থিক উন্নয়ন, সুস্থায়ীভাবে অর্থের ব্যবহার ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উদ্ভূত সমস্যার সমাধানকে অভিন্ন এক কাঠামোয় রাখা হবে।
ভারতের শহরাঞ্চলের বিকাশ বিভিন্ন প্রকল্পের বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করে। আরবান চ্যালেঞ্জ ফান্ড নগরায়নের ক্ষেত্রে কোনো আর্থিক বোঝা হিসেবে থাকবে না, বরং সংশ্লিষ্ট উদ্যোগে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করে দেবে। বাজারের শৃঙ্খলা, সংস্কারমুখী বিভিন্ন উদ্যোগ এবং যথাযথ ফল প্রাপ্তির বিষয়টি বিবেচনা করে দেশের নগরায়নের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংস্কার নিশ্চিত করা হবে যাতে শহরগুলি আরও প্রাণবন্ত ও প্রতিযোগিতামূলক এক ব্যবস্থার শরিক হয়, যেখানে ভবিষ্যতের চাহিদা পূরণ করে উন্নয়নযাত্রা অব্যাহত থাকে।
লেখক : আবাসন ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রকের সচিব। মতামত ব্যক্তিগত।