মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে (Muslim Personal Law) মহিলাদের উত্তরাধিকার অধিকারের প্রশ্নে মঙ্গলবার গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ জানাল সুপ্রিম কোর্ট। মুসলিম পার্সোনাল ল-এর কিছু বিধান মহিলাদের প্রতি বৈষম্যমূলক—এই অভিযোগে দায়ের হওয়া একটি রিট পিটিশনের শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ জানিয়ে দিল, এই জটিল সমস্যার স্থায়ী সমাধান আদালতের একক হস্তক্ষেপে নয়, বরং আইন প্রণয়নের মাধ্যমেই সম্ভব।

শেষ আপডেট: 10 March 2026 14:22
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে (Muslim Personal Law) মহিলাদের উত্তরাধিকার অধিকারের প্রশ্নে মঙ্গলবার গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ জানাল সুপ্রিম কোর্ট। মুসলিম পার্সোনাল ল-এর কিছু বিধান মহিলাদের প্রতি বৈষম্যমূলক—এই অভিযোগে দায়ের হওয়া একটি রিট পিটিশনের শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ জানিয়ে দিল, এই জটিল সমস্যার স্থায়ী সমাধান আদালতের একক হস্তক্ষেপে নয়, বরং আইন প্রণয়নের মাধ্যমেই সম্ভব। সেই সূত্রেই আদালতের সাফ বক্তব্য—“The answer is Uniform Civil Code.” অর্থাৎ, “সমাধান ইউনিফর্ম সিভিল কোডই (Supreme Court on Uniform Civil Code)।”
মঙ্গলবার এই মামলার শুনানি হয় প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি আর. মহাদেবনের বেঞ্চে। আবেদনকারীদের হয়ে সওয়াল করেন আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ।
কী নিয়ে মামলা
এই মামলায় মুসলিম পার্সোনাল ল-এর উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিধানকে চ্যালেঞ্জ করা হয়। আবেদনকারীদের বক্তব্য, মুসলিম মহিলারা সম্পত্তির ক্ষেত্রে পুরুষদের সমান অধিকার পান না। অনেক ক্ষেত্রে পুরুষেরা যে অংশ পান, মহিলারা তার অর্ধেক পান। ফলে এটি সংবিধানের সমতার নীতির বিরোধী।
প্রশান্ত ভূষণ আদালতে যুক্তি দেন, উত্তরাধিকার একটি নাগরিক অধিকার, এটি কোনও “essential religious practice” বা ধর্মীয় মৌলিক অনুশীলনের মধ্যে পড়ে না। তাই এই বিষয়ে ধর্মীয় স্বাধীনতার নামে বৈষম্য টিকিয়ে রাখা যায় না। তাঁর কথায়, শায়রা বানো মামলায় যখন ট্রিপল তালাককে অসাংবিধানিক বলা হয়েছে, তখন মুসলিম মহিলারা কেন উত্তরাধিকারেও পুরুষদের সমান অধিকার পাবেন না?
আদালতের প্রথম প্রশ্ন—আইন বাতিল হলে কী হবে?
তবে সুপ্রিম কোর্ট শুনানির শুরু থেকেই আর একটি বড় প্রশ্ন তুলেছে। আদালত জানতে চায়, যদি ১৯৩৭ সালের মুসলিম পার্সোনাল ল (শরিয়ত) অ্যাপ্লিকেশন অ্যাক্ট বাতিল করে দেওয়া হয়, তা হলে তার জায়গায় কোন আইন কার্যকর হবে?
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, “আপনারা ১৯৩৭ সালের আইনকে চ্যালেঞ্জ করছেন, কিন্তু সেটি যদি সরে যায়, তা হলে কী প্রযোজ্য হবে? আইনি শূন্যতা তৈরি হবে না?”
এই প্রশ্নের জবাবে প্রশান্ত ভূষণ বলেন, ওই ক্ষেত্রে ইন্ডিয়ান সাকসেশন অ্যাক্ট তথা ভারতীয় উত্তরাধিকার আইন (Indian Succession Act) প্রযোজ্য হতে পারে। তাঁর প্রস্তাব, আদালত চাইলে ঘোষণা করতে পারে যে মুসলিম মহিলারাও উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে মুসলিম পুরুষদের সমান অধিকারী।
‘অতিরিক্ত সংস্কারের তাড়ায় উল্টো ক্ষতি হতে পারে’
কিন্তু এখানেই আদালত সতর্ক অবস্থান নেয়। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, শুধুমাত্র সংস্কারের তাগিদে যদি আদালত তড়িঘড়ি হস্তক্ষেপ করে, তা হলে উল্টো ফলও হতে পারে। তিনি বলেন, “সংস্কারের অতিরিক্ত তাড়াহুড়োতে আমরা এমন পরিস্থিতি না তৈরি করে ফেলি যে, মুসলিম মহিলারাই বর্তমানে যা পাচ্ছেন, তার থেকেও হাতে কম পাবেন। ১৯৩৭ সালের আইন যদি সরে যায়, তার পরে কী হবে—সেটাই প্রশ্ন।”
অর্থাৎ আদালতের আশঙ্কা, আইন বাতিল করলেই যে সঙ্গে সঙ্গে সমতা প্রতিষ্ঠা হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং স্পষ্ট বিকল্প কাঠামো না থাকলে মহিলাদের অধিকার আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।
বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর পর্যবেক্ষণ—বিষয়টি আইনসভার
শুনানির সময়ে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী আরও তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, এই ধরনের বিষয়ে আদালতের চেয়ে আইনসভাই বেশি উপযুক্ত ক্ষেত্র, কারণ সংসদের হাতে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা Uniform Civil Code আনার সাংবিধানিক সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন,“ব্যক্তিগত আইনকে বাতিল করে আইনি শূন্যতা তৈরি করার বদলে আইনসভার বিবেচনার উপর বিষয়টি ছেড়ে দেওয়াই শ্রেয়, যাতে তারা ইউনিফর্ম সিভিল কোড আনতে পারে।”
তারপরই প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, “The answer, as correctly said, is the Uniform Civil Code.” অর্থাৎ ঠিকই বলেছেন, অভিন্ন দেওয়ানি আইনই এর উত্তর। এই মন্তব্য নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ আদালত সরাসরি জানিয়ে দিল যে ব্যক্তিগত আইনজনিত জটিলতা, বৈষম্য এবং অসাম্য দূর করতে একক, অভিন্ন দেওয়ানি আইনের প্রয়োজনীয়তা তারা দেখছে।
বহুবিবাহ, একতরফা তালাক—আদালতের যুক্তি
বিচারপতি বাগচী শুনানিতে আরও একটি প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি বলেন, ব্যক্তিগত আইনের জেরে বহু সম্প্রদায়ে এখনও বিবাহ, তালাক বা পারিবারিক অধিকারের ক্ষেত্রে আলাদা নিয়ম রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, মুসলিম পুরুষ একতরফাভাবে তালাক দিতে পারে—এমন প্রথা দীর্ঘদিন ছিল। কিন্তু আদালত কি এক ঝটকায় ব্যক্তিগত আইনের ভিত্তিতে তৈরি হওয়া সব সম্পর্ককে অসাংবিধানিক ঘোষণা করতে পারে?
এই যুক্তি টেনেই তিনি বলেন, আদালতের ক্ষমতারও একটি সীমা আছে। মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বৈষম্য দূর করার দায়িত্ব থাকলেও, ব্যক্তিগত আইন সম্পূর্ণ বদলে দেওয়ার কাজ শেষ পর্যন্ত আইনসভারই।
ব্যক্তিগত আইন কি সংবিধানের পরীক্ষায় পড়তে পারে?
শুনানির সময়ে বেঞ্চ একটি পুরনো আইনি প্রশ্নও তোলে—ব্যক্তিগত আইন আদৌ সংবিধানের আলোকে বিচারযোগ্য কি না। বিচারপতি বাগচী এই প্রসঙ্গে Bombay High Court-এর Narasu Appa Mali রায়ের উল্লেখ করেন, যেখানে বলা হয়েছিল, ব্যক্তিগত আইনকে সংবিধানের মৌলিক অধিকারের পরীক্ষায় সরাসরি ফেলা যায় না।
তবে আবেদনকারীদের পক্ষ বলেছে, এখানে শুধু অলিখিত ব্যক্তিগত আইন নয়, Muslim Personal Law (Shariat) Application Act, 1937 নামে একটি আইনি কাঠামোও রয়েছে। ফলে সংবিধানসম্মততার প্রশ্ন তোলা একেবারেই অমূলক নয়।
মুসলিম মহিলাদের নিজেদের আবেদন হলে?
শুনানির সময়ে আদালত এও পর্যবেক্ষণে জানায় যে, যদি মুসলিম মহিলারা নিজেরাই সরাসরি এই আইন থেকে বেরিয়ে আসার দাবি নিয়ে সামনে আসেন, সে ক্ষেত্রে আদালতের হস্তক্ষেপ আরও গ্রহণযোগ্য হতে পারে। প্রশান্ত ভূষণ তখন জানান, আবেদনকারীদের মধ্যে মুসলিম মহিলারাও আছেন।
শেষ পর্যন্ত আদালত সরাসরি কোনও চূড়ান্ত নির্দেশ দেয়নি। বরং আবেদনকারীদের তাদের পিটিশন সংশোধন করার পরামর্শ দিয়েছে। আদালতের বক্তব্য, শুধু আইনকে চ্যালেঞ্জ করলেই হবে না, সেটি খারিজ হলে বিকল্প প্রতিকার কী হবে, তারও স্পষ্ট প্রস্তাব দিতে হবে।
প্রধান বিচারপতি বলেন, “আপনারা আবেদনটি সংশোধন করুন, কিছু বিকল্প প্রস্তাব দিন, যাতে বিষয়টি আরও বিশ্বাসযোগ্যভাবে দেখা যায়। শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য একটাই—যদি দেশের কোনও অংশের মহিলা তাঁদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হন, সেই অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া।”
এই মামলাটি শুধুমাত্র মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের সীমার মধ্যে আবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জুড়ে রয়েছে আরও বড় সাংবিধানিক বিতর্ক—ব্যক্তিগত আইন বনাম সমতার অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা বনাম নাগরিক অধিকার, এবং আদালত বনাম আইনসভার ভূমিকা।
সংবিধানের নির্দেশমূলক নীতিতে অনুচ্ছেদ ৪৪-এ অভিন্ন দেওয়ানি বিধির কথা বলা আছে। কিন্তু স্বাধীনতার এত দশক পরেও তা সারা দেশে কার্যকর হয়নি। মঙ্গলবারের শুনানিতে সুপ্রিম কোর্টের মন্তব্য সেই রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিতর্ককে আবার কেন্দ্রবিন্দুতে এনে দিল।
সব মিলিয়ে, আদালত এখনই শরিয়ত উত্তরাধিকার আইন বাতিলের পথে হাঁটল না। কিন্তু তারা স্পষ্ট বুঝিয়ে দিল—মহিলাদের অধিকার রক্ষার প্রশ্নে দীর্ঘমেয়াদি উত্তর খুঁজতে হলে, ইউনিফর্ম সিভিল কোডের মতো আইনগত কাঠামো নিয়েই ভাবতে হবে।