যুক্তরাষ্ট্র ২৫% শুল্ক বসানোয় ভারতের রত্ন, ওষুধ, টেক্সটাইলসহ বহু রপ্তানি খাতে বড় প্রভাব। অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে চ্যালেঞ্জ বাড়ছে।

ছবি: AI
শেষ আপডেট: 5 August 2025 12:33
দ্য ওয়াল ব্যুরোঃ ভারতীয় রপ্তানি শিল্প এক কঠিন সময় পার করছে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের (Donald Trump) ঘোষণা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ আগস্ট থেকে ভারতীয় রপ্তানি পণ্যের উপর ২৫ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হতে চলেছে। এই সিদ্ধান্ত বিশ্ব অর্থনীতিতে (Global Economy) আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং ভারতের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। রত্ন ও গয়না, ওষুধ, ইলেকট্রনিক্স এবং বস্ত্র-সহ একাধিক খাত এই শুল্কে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ট্রাম্পের দাবি, ভারতের শুল্কনীতি (Trump tariff impact on Indian exports
) বিশ্বের মধ্যে অন্যতম কঠিন এবং রাশিয়া থেকে ভারতের তেল ও অস্ত্র কেনাকাটার কারণেই এই অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। ফলে ভারত-মার্কিন দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য সম্পর্কে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে ভারতের শেয়ারবাজারে।
শুল্ক আরোপের পটভূমি ও যুক্তি
ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ প্ল্যাটফর্মে ঘোষণা করেন, ভারত এমন এক দেশ যারা উচ্চ হারে শুল্ক আরোপ করে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোই এই শুল্কের মূল উদ্দেশ্য। ২০২৪ সালে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ছিল ১২৯.২ বিলিয়ন ডলার, কিন্তু এই ব্যবসায় যুক্তরাষ্ট্রের ঘাটতি ক্রমশ বেড়েছে।
একই সঙ্গে ট্রাম্প ভারত-রাশিয়া বাণিজ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন, বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ে রাশিয়া থেকে ভারতের তেল ও অস্ত্র আমদানিকে কেন্দ্র করে। এই ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাও শুল্ক বৃদ্ধির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
কোন কোন খাত সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে?
১. রত্ন ও গয়না শিল্প:
ভারত থেকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি রত্ন ও গয়না রপ্তানি হয়। এই খাতের প্রতিনিধিদের মতে, নতুন শুল্কের ফলে পুরো মূল্যশৃঙ্খলে চাপ পড়বে এবং লক্ষাধিক কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়বে।
২. ওষুধ শিল্প:
ভারত যুক্তরাষ্ট্রের জেনেরিক ওষুধ বাজারে প্রধান সরবরাহকারী। সান ফার্মা, সিপলা, ড. রেড্ডিজ-এর মতো সংস্থার আয়ের ৩০ শতাংশই মার্কিন বাজার থেকে আসে। এই খাতে বছরে ৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি রপ্তানি হয়। নতুন শুল্কের ফলে এই খাতেও বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।
৩. বস্ত্র ও পোশাক খাত:
গ্যাপ, ওয়ালমার্ট, কস্টকো-এর মতো খুচরো বিক্রেতাদের পোশাক, হোম ফ্যাব্রিক ও জুতা সরবরাহ করে ভারত। নতুন শুল্কের ফলে ভারতীয় নির্মাতারা প্রতিযোগিতার দিক থেকে পিছিয়ে পড়বে এবং অনেক প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যেই অর্ডার কম পাওয়ার কথা জানিয়েছে।
৪. ইলেকট্রনিক্স:
অ্যাপল ভারতে আইফোন তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করে, কিন্তু নতুন শুল্কের ফলে এই রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ফলে উৎপাদন কৌশল পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন হবে।
৫. গাড়ির যন্ত্রাংশ ও পরিশোধন খাত:
রিলায়েন্স, ইন্ডিয়ান অয়েল ও ভারত পেট্রোলিয়াম রাশিয়া থেকে সস্তায় তেল কিনে মুনাফা করছে। কিন্তু মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বাড়লে বা তেল আমদানি বাধাগ্রস্ত হলে এই সংস্থাগুলোর লাভ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
কিছু খাতে শুল্ক অব্যাহতি
হোয়াইট হাউসের ১ আগস্টের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ২ এপ্রিল ঘোষিত কিছু শুল্ক অব্যাহতি বহাল থাকবে। এর মধ্যে রয়েছে: ওষুধ, গাড়ির যন্ত্রাংশ, কপার ও ধাতব সামগ্রী। এই খাতগুলো ভারতের রপ্তানির একটি বড় অংশ হওয়ায় কিছুটা স্বস্তি মিলতে পারে।
অর্থনৈতিক প্রভাব ও বাজার প্রতিক্রিয়া
আইসিআরএ-র মতে, শুল্কের প্রভাবে ভারতের জিডিপি (DGP) প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশ থেকে কমে ৬.২ শতাংশে নেমে আসতে পারে। নোমুরা অনুমান করছে, শুল্কের প্রভাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ০.২ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। সেনসেক্সে ৬০০ পয়েন্টের পতন এবং নিফটিতে ০.৭ শতাংশ হ্রাস দেখা গেছে। রিলায়েন্স, এয়ারটেল, টিসিএস, ইনফোসিসের মতো সংস্থার শেয়ারে বড় পতনের কারণে একদিনেই প্রায় ৫ লক্ষ কোটি টাকার বাজারমূল্য হ্রাস পেয়েছে।
ভূরাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত
ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের উপর দাঁড়িয়ে আছে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে মিল থাকলেও ভূরাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে দ্বিমত রয়েছে। সম্প্রতি মোদির বক্তব্যে ট্রাম্পের দাবি খারিজ হওয়া এবং রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে। আনুষ্ঠানিকভাবে বাণিজ্য আলোচনা চালু থাকলেও বাস্তবে সম্পর্কের উপর চাপ স্পষ্ট।
ভারতের প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ কৌশল
ভারত সরকার জানিয়েছে, তারা এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীরভাবে পর্যালোচনা করছে। বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গয়াল বলেছেন, সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে সরকার জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় পদক্ষেপ নেবে। প্রধানমন্ত্রী মোদি দেশীয় পণ্যের ওপর জোর দিয়েছেন এবং দেশবাসীকে স্বদেশি পণ্য ব্যবহারে উৎসাহিত করেছেন।
প্রতিযোগী দেশগুলোর শুল্ক হার তুলনামূলক চিত্র:
| দেশ | শুল্ক হার |
|---|---|
| ভিয়েতনাম | ২০% |
| ইন্দোনেশিয়া | ১৯% |
| জাপান | ১৫% |
| বাংলাদেশ | ২০% |
| পাকিস্তান | ১৯% |
| মালয়েশিয়া | ১৯% |
| মায়ানমার | ৪০% |
ভারতের রপ্তানি শিল্প এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে। যুক্তরাষ্ট্রের এই শুল্কনীতি শুধু বাণিজ্যিক নয়, কূটনৈতিক সম্পর্কেও একটি বড় পরীক্ষা। পরিস্থিতি কতটা সংকটজনক হয়ে দাঁড়াবে তা নির্ভর করবে ভারত সরকারের ভবিষ্যৎ কৌশল, আন্তর্জাতিক আলোচনার অগ্রগতি এবং বিশ্বব্যাপী ভূরাজনৈতিক অবস্থার ওপর।