তৃণমূলের (TMC) বহু নেতার মনে হয়েছে, কল্যাণ (Kalyan Banerjee) যত না মহুয়াকে (Mahua Maitra) আক্রমণ করেছেন তার চেয়ে যেন বেশি করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে (Mamata Banerjee) বার্তা দিতে চেয়েছেন।

কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
শেষ আপডেট: 5 August 2025 12:21
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মঙ্গলবার তৃণমূলের সংসদীয় কমিটির বৈঠকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে (Abhisek Banerjee) লোকসভায় দলনেতা হিসাবে নির্বাচিত করার পরই মুখ্য সচেতক পদ থেকে ইস্তফা দেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় (Kalyan Banerjee)। শুধু ইস্তফা নয়, তার পর সংবাদমাধ্যমের সামনে মুখ খুলে মহুয়া মৈত্রর (Mahua Maitra) বিস্তর সমালোচনা করেন। সেই সঙ্গে বলেন, ‘মমতাদির মনে হয়েছে আমি ঠিকমতো মুখ্য সচেতকের দায়িত্ব পালন করতে পারছি না’।
কল্যাণের এ কথা শুনে তৃণমূলের বহু নেতার মনে হয়েছে, কল্যাণ যত না মহুয়াকে আক্রমণ করেছেন তার চেয়ে যেন বেশি করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বার্তা দিতে চেয়েছেন। দিদির উপরই প্রকারান্তরে তাঁর অভিমান ও অসন্তোষ ঝরে পড়েছে। তৃণমূলের এই নেতাদের মতে, কল্যাণ হয়তো আশা করেছিলেন, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পর তাঁকেই লোকসভার দলনেতা করা হবে। চার বারের সাংসদ কল্যাণ। দিল্লির রাজনীতিতে তাঁর পরিচিতিও তৈরি হয়েছে। চব্বিশের লোকসভা ভোটের পর দিল্লিতে টাইপ সেভেন বা টাইপ এইট গোত্রের একটি সরকারি বাংলোও পেয়েছেন তিনি। সাধারণত, চার বারের সাংসদরা এত বড় বাংলো পান না। দলের মধ্যেই গুঞ্জন, লোকসভার দলনেতার পদ না পাওয়াতেই চটেছেন কল্যাণ।

দিল্লিতে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারি বাসভবন।
তা ছাড়া আরও একটি কারণ রয়েছে বলে মত অনেকের। লোকসভায় দলের মুখ্য সচেতককে দলনেতার কথা শুনেই কাজ করতে হয়। অর্থাৎ কল্যাণ মুখ্য সচেতক পদে থাকলে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নেতা মেনেই কাজ করতে হবে। দলে গুঞ্জন, সেই কারণেই আগেভাগে ইস্তফা দিয়ে দেন শ্রীরামপুরের সাংসদ।
আপাতত অবশ্য অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কল্যাণকে ফোন করে নিরস্ত করেছেন। বুধবার সন্ধেয় দিল্লি যাওয়ার কথা অভিষেকের। তার পর বৃহস্পতিবার কল্যাণের সঙ্গে আলোচনা করবেন তিনি। ততদিন কল্যাণকে শান্ত থাকতে বলেছেন অভিষেক।
এখন কৌতূহলের বিষয় হল, অভিষেক অনুরোধ করলে কল্যাণ কি মুখ্য সচেতক পদে থেকে যাবেন?
এমনিতে তৃণমূলে পদ পেয়ে ছেড়ে দেওয়ার নজির বিরল। বরং এমনও ঘটনা ঘটেছে যে, যাঁর দুটো পদ রয়েছে তিনি তিনটে পেলে খুশি হয়েছেন। বা যাঁর চারটে পদ রয়েছে তাঁর একটি চলে গেলে তিনি বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন।

লোকসভায় কল্যাণ।
তৃণমূলের একাংশ নেতার মতে, অভিষেক যদি আপাতত কল্যাণকেই দায়িত্বপালন করে যেতে বলেন, তাহলে শ্রীরামপুরের সাংসদ না করবেন না। কল্যাণ হয়তো এও ভেবেছিলেন, অভিষেক দলনেতা হওয়ার পর তাঁকে মুখ্য সচেতক পদে রাখবেন না। কারণ, গত কয়েক বছরে অভিষেকের সঙ্গে কল্যাণের সম্পর্কটা ছিল রৌদ্রচ্ছায়ার মতো। লোকসভা ভোটের আগে অভিষেকের মহিমা প্রচারে বিশেষণে ভরিয়ে দিয়েছিলেন কল্যাণ। আবার গত বছর খানেক ধরে দেখা যাচ্ছে, আই-প্যাকের বিরুদ্ধে সবচেয়ে সরব শ্রীরামপুরের সাংসদ। ইনিয়ে বিনিয়ে তিনি যে সব অভিযোগ করেছেন, তার অনেকগুলোই ক্যামাক স্ট্রিটের দরজার সামনে এসে পড়েছে।
এখন অভিষেক নিজে থেকেই যদি তাঁকে দায়িত্ব পালন করতে বলেন, তাহলে কল্যাণ হয়তো 'না' করবেন না। তখন আবার হয়তো দেখা যাবে, অভিষেকের জন্য গলা ফাটাচ্ছেন শ্রীরামপুরের সাংসদ।
কালীঘাট ঘনিষ্ঠ তৃণমূলের এক নেতার কথায়, সমস্যা হল দলের বর্তমান সাংসদদের মধ্যে অনেকেই সংসদের নিয়মকানুন সম্পর্কে খুব ওয়াকিবহাল নন। কিছু সাংসদ রয়েছেন যাঁদের সংসদে যাওয়ার ব্যাপারে বিশেষ উৎসাহই নেই। যাঁরা বিষয়আশয় বোঝেন, সেই অন্যতম দুজন সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় ও সৌগত রায় অসুস্থ। দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিতে রয়েছেন মালা রায়। তবে তাঁর শরীরও ভাল যাচ্ছে না।
এর পর বিকল্প বলতে রয়েছে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, কাকলি ঘোষদস্তিদার ও মহুয়া মৈত্র। তবে কল্যাণ সংসদে যতটা সক্রিয় কাকলি দৃশ্যত ততটা নয়। আবার মহুয়া সক্রিয় হল তাঁর ব্যাপারে হয়তো আস্থার ঘাটতি রয়েছে।
সুতরাং অভিষেককেও তো লোকসভার দলনেতা হিসাবে প্রকারান্তরে তৃণমূল সংসদীয় দলের নেতা হিসাবে কাজটা চালিয়ে যেতে হবে। তাই বিকল্পহীনতার কারণেই কল্যাণকে দায়িত্ব চালিয়ে যেতে বলতে পারেন। তৃণমূলের অনেকের মতে, তাতে অখুশি হবেন না কল্যাণ।