চন্দ্রভাগা রেলসেতু। ডাকনাম চেনাব রেলব্রিজ (Chenab Bridge)।

জি মাধবী লতা।
শেষ আপডেট: 7 June 2025 13:10
দ্য ওয়াল ব্যুরো: চন্দ্রভাগা রেলসেতু। ডাকনাম চেনাব রেলব্রিজ (Chenab Bridge)। শুক্রবার পৃথিবীর সর্বোচ্চ, আইফেল টাওয়ারের থেকেও উঁচুতে পাহাড়ি গিরিখাদের উপর এই সেতুর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। যার একদিকে জম্মু, অন্যদিকে কাশ্মীর। এই সেতু দেশের দক্ষিণ প্রান্ত কন্যাকুমারীর সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে ভূস্বর্গ কাশ্মীরকে। এটা এমন এক দেশীয় আশ্চর্য যা ৮ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্প সহ্য করতে পারে এবং ৪০ টন টিএনটি পর্যন্ত বিস্ফোরকে তীব্রতা হজম করে ফেলবে।
অর্ধবৃত্তাকারাকৃতির এই সেতু পৃথিবীর সর্বোচ্চ। যার পিছনে রয়েছে কয়েক হাজার মানুষের অক্লান্ত পরিশ্রম। কিন্তু তার মধ্যেই একজন যাঁর শিল্পনৈপুণ্য, কারিগরি জ্ঞান ও অদম্য-কঠিন উৎসাহ এই সেতুর প্রতিটি ইস্পাতের গায়ে লেগে রয়েছে, তাঁর নাম অধ্যাপক জি মাধবী লতা (Professor G Madhavi Latha)। বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সের (IISc, Bengaluru) শিক্ষক মাধবী লতাকে পাহাড়ি এলাকায় কারিগরি কৌশলের বিশ্বকর্মা বলাই যায়। আর এই সেতুকে চলাচলের উপযুক্ত করার কাজে জীবনের ১৭টি বছরের সম্পদ বিনিয়োগ করেছেন মাধবী।
পার্বত্য স্থাপত্য কারিগরিবিদ্যার বিশারদ আইআইএসসির এই অধ্যাপককে উত্তর রেল এবং প্রকল্পের ঠিকাদারি সংস্থা অ্যাফকনস তুলে নিয়ে আসে পরামর্শ ও নির্মাণকাজের দায়িত্ব সঁপে দিয়ে। কারণ সেতু নির্মাণের যে জায়গা বাছাই করা হয়েছিল, তা অত্যন্ত বিপদসঙ্কুল, পাহাড়ি খাদ, প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে। আর সে কারণেই এই সেতুকে তাপাঙ্কের ১০ ডিগ্রি নীচে থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়েছে।
দক্ষিণী সংবাদমাধ্য ডেকান হেরাল্ডকে আলাদা করে মাধবী লতা বলেন, আইআইএসসিকে ঢালু পার্বত্য এলাকায় সেতু খাড়া করা ও ভিত তৈরি করার কাজ দেওয়া হয়েছিল। আর বিদেশি সংস্থা ইস্পাতের অর্ধ বৃত্তাকার কাঠামো তৈরি করেছে। সেতুর পরিকল্পনা শুরু হয় ২০০৫ সালে এবং কাজ সম্পূর্ণ হয় ২০২২ সালে। সেই সময়েই ট্রেনের ফুল স্পিড ট্রায়াল রান হয়েছিল। কাজের সময় যে যে অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল, তা হল প্রচণ্ড খাঁড়াই পাহাড়। পাথুরে জমি। তাই ২২০ কিমি বেগে হাওয়ার মোকাবিলা করার মতো বিশাল ভিত তৈরি করা হয়। সে কারণে মাধবী লতা জানান, ঠিক যেখানটায় নকশা করা হয়েছিল, কাজের সুবিধা ও মজবুতির জন্য আমরা সেখান থেকে খানিকটা সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। প্রাথমিক পর্বে লতার সঙ্গে আরেকজন আইএসএসসির অধ্যাপককে নিয়োগ করা হয়েছিল। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তিনি কাজ ছেড়ে দেওয়ায় ২০২২ সাল পর্যন্ত একাই এই কাজ টেনে নিয়ে এসেছেন মাধবী লতা।
মাধবী লতা বর্তমানে আইএসএসসি-র এইচএজি (HAG Professor)। তিনি জওহরলাল নেহরু টেকনোলজিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণিতে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বি টেক পাশ করেন ১৯৯২ সালে। ওয়ারাঙ্গলের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির থেকে স্বর্ণপদক পেয়ে এম টেক করেন। তাঁর বিশেষ বিষয় ছিল জিওটেকনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং। ২০০০ সালে এই বিষয়েই তিনি আইআইটি-মাদ্রাজ থেকে ডক্টরেট করেন লতা। তারপরেও অসংখ্য কৃতিত্বের জন্য বহু পুরস্কার ও সম্মান পেয়েছেন।
২০২১ সালে ভারতের জিওটেকনিক্যাল সোসাইটি তাঁকে শ্রেষ্ঠ মহিলা গবেষকের সম্মান দেয়। ২০২২ সালে স্টেম তালিকায় শীর্ষ ৭৫ জনের মধ্যে তাঁর নাম ছিল। আইআইএসসি, বেঙ্গালুরুতে পড়ানোর আগে তিনি আইআইটি, গুয়াহাটিতে শিক্ষকতা করেছেন। লতা যখন আইআইএসসিতে যোগ দেন তখন তিনি এখানকার সবেধন নীলমণি মহিলা অধ্যাপক।
শুরুতে তাঁর লড়াইটা পঠনপাঠন নিয়ে ছিল তা নয়। লতার কথায়, সেই সময় আমার বিভাগে শুধুমাত্র মহিলাদের ব্যবহারের জন্য কোনও টয়লেট ছিল না। আমাকে পুরুষদের টয়লেটেই যেতে হতো। তাই জিওটেকনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে আমার লড়াই শুরু করি মহিলা টয়লেটের দাবিতে। তাই আজ সেন্টার ফর সাসটেইনেবল টেকনোলজিসের প্রধান ডঃ লতা খুব খুশি এই ভেবে যে, এখন তাঁর বিভাগে ছেলে ও মেয়ের সংখ্যা প্রায় সমান সমান।
টয়লেটের পর লতার লড়াই শুরু হয় কেবলমাত্র ছাত্রীদের জন্য একটি গবেষণার জায়গা তৈরি নিয়ে। তাঁর ঘরের দরজা সবসময় ছাত্রীদের জন্য খোলা থাকত। তিনি জানিয়েছেন, একজন মেয়ে হিসেবে আমি বুঝতাম ওদের ঠিক কোনটা প্রয়োজন। আর ১২০ বছরের আয়ুসম্পন্ন চেনাব ব্রিজ উদ্বোধনের পর এখন লতার একটাই স্বপ্ন তাঁর পুরো পরিবারকে এই সেতুর উপর দিয়ে কাশ্মীর বেড়াতে যাওয়া। তিনি সেইদিনের জন্যই অপেক্ষায় রয়েছেন।